বুকফাটা আর্তনাদ আর চোখে পানি নিয়ে কথা বলছিলেন বিধ্বংসী ভূমিকম্পে বেঁচে যাওয়া এক হতভাগ্য মা। নাম তার আন্দ্রেইনা বালেরিও। ভাঙা পাথরের স্তূপ আর কংক্রিটের নিচে তার সঙ্গী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনের সঙ্গে আটকে আছে নিজের নাড়িছেঁড়া ধন। সময় বয়ে যাচ্ছে, আর ধুলোবালির নিচে ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছে প্রাণের স্পন্দন। কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও হাল ছাড়েননি এই মা। বারবার তার মনে হচ্ছিল-কংক্রিটের নিচ থেকে তার ছেলে তাকে ডাকছে। রোববার ভূমিকম্পের এই হৃদয়বিদারক ঘটনা উঠে আসে বিবিসির প্রতিবেদনে।

ভেনিজুয়েলায় ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর হৃদয়বিদারক দৃশ্যই এখন দেশটির নানা প্রান্তে। দেশটিতে গত বুধবার রিখটার স্কেলে ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। ভূমিকম্পের পরপরই কর্মস্থল থেকে ছুটে বাড়ি ফেরেন আন্দ্রেইনা বালেরিও। উদ্দেশ্য ছিল প্রায় দুই বছরের ছেলে সান্তিয়াগোকে নিয়ে আসা। সান্তিয়াগো তখন তার বাবা রামসেস মেনদোজার সঙ্গে লা গুয়াইরায় দাদা-দাদির বাসায় ছিল। সেখানে পৌঁছে আন্দ্রেইনা দেখেন, পুরো ভবনটি ধসে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। তার ভাসুর স্যামুয়েল মেনদোজা তখন ভেঙে পড়া ভবনের ধ্বংসাবশেষের মধ্যে স্বজনদের খুঁজছিলেন।

শনিবার ধসে পড়া ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে আন্দ্রেয়িনা বালেরিও জানান, তার ছেলে, জীবনসঙ্গী, শ্বশুর-শাশুড়ি, দাদি শাশুড়ি-দাদা শ্বশুর এবং ননদ সবাই এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে আছেন। তবুও তিনি আশা ছাড়েননি। আন্দ্রেইনা ও স্যামুয়েল জানান, ভবনটিতে আরও দুটি শিশু আটকা পড়ে আছে। তাদের একজন নয় বছরের লুকাস এবং অন্যজন তিন বছরের আরানজা। শনিবার এল সালভাদর ও স্পেন থেকে আসা উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও ভবনের ভেতরে প্রবেশ করতে পারেনি। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সেখান থেকে কাউকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। ভূমিকম্পের পরের সকালে স্যামুয়েল জানান, তিনি ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে এক নারীর কণ্ঠ শুনেছিলেন। ‘প্রথমে ঠিক বুঝতে পারিনি কী বলছিলেন। শুধু একটি শব্দ শুনতে পেয়েছিলাম ‘বাঁচান’। পরদিন আন্দ্রেইনা আবার সেখানে ফিরে এসে একটি শিশুর কান্নার শব্দ শুনতে পান। চোখে অশ্রু নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি এখনো বিশ্বাস করি আমার ছেলে বেঁচে আছে। আমি বিশ্বাস করি আমি যে কান্নার শব্দ শুনেছি, সেটি আমার ছেলেরই। আমি জানি, আমার ছেলে এবং তার পরিবারের সবাই এই বিপর্যয় থেকে ফিরে আসবে।’

আন্দ্রেইনা ও স্যামুয়েলের মতো হাজারো মানুষ এখন ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা স্বজনদের খুঁজে ফিরছেন। বিশাল দুটি ভূমিকম্পে দেশজুড়ে শত শত ভবন মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলীয় অঞ্চল লা গুয়াইরায় অনেক পরিবার খালি হাতেই ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে প্রিয়জনদের উদ্ধারের চেষ্টা করছে।