ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও তার পরিবারেরসদস্যদের কফিনে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন দেশটির পবিত্র শহর কওমের বাসিন্দারা। শেষ শ্রদ্ধার আনুষ্ঠানিকতার চতুর্থ দিনে সূচি অনুযায়ী মঙ্গলবার তার লাশবাহী কফিনটি সেখানে পৌঁছলে লাখো মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। এ সময় অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। শোকাহত অধিকাংশ ইরানির গায়ে ছিল কালো পোশাক; হাতে বিপ্লবের লাল পতাকা।

আল জাজিরা জানায়, ইরানের সর্বোচ্চ নেতার কফিনটি শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য কওম শহরের দক্ষিণ প্রান্তের জামকারান মসজিদে নেওয়া হয়। আলী খামেনির কফিন ছাড়াও শোক মিছিলে তার পরিবারের আরও চার সদস্যের কফিন রয়েছে। সবচেয়ে ছোট কফিনটি খামেনি ১৪ মাস বয়সের নাতনি জাহরা মোহাম্মদি গোলপায়েগনির।

ইরানের মেহের নিউজ এজেন্সি জানায়, মঙ্গলবার সকালে জামকারান মসজিদে আলী খামেনি ও তার পরিবারের সদস্যদের জানাজায় লাখ লাখ শোকার্ত মানুষ অংশ নেন। গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ আবদুল্লাহ জাভাদি আমোলি এ জানাজার নামাজে ইমামতি করেন। এতে অনেক সরকারি কর্মকর্তা, সামরিক কমান্ডার ও বিশিষ্টজনও অংশ নিয়েছেন। নামাজ শেষে জামকারান মসজিদ থেকে হযরত ফাতেমা মাসুমেহ-এর মাজার পর্যন্ত একটি শোক মিছিলের আয়োজন করা হয়।

সূত্র জানায়, আগের দিন বিকাল থেকেই ইরানের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কোমে বিপুল সংখ্যক মানুষের আগমন শুরু হয়। ভোর হওয়ার আগেই জামকারান মসজিদের প্রাঙ্গণ ও নামাজ পড়ার কক্ষগুলো জনসমাগমে পূর্ণ হয়ে যায়। ইরানের জাতীয় পতাকার পাশাপাশি লাল ব্যানার বহন করে পায়ে হেঁটে ও যানবাহনে করে শোকাহতদের মিছিল সেই স্থানে এসে জড়ো হতে থাকেন। সিএনএনের প্রকাশিত ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, কালো পোশাক ও লাল পতাকা হাতে কওমের সড়কে মাইলের মাইল জুড়ে মানুষের সারি। এর আগে গত শুক্রবার তেহরানের ইমাম খোমেনি মোসাল্লায় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির লাশ রাখা হয়। শেষ শ্রদ্ধার মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয় শনিবার থেকে। ছয়দিনব্যাপী আনুষ্ঠানিকতায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রতিনিধি ও বিশিষ্টজন অংশ নেন। তেহরানে সাধারণ মানুষ শ্রদ্ধা জানান। সোমবার খামেনি কফিনবাহী গাড়িবহরটি ইরানের রাজধানীর মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় তেহরানের রাস্তাগুলোতে বিশাল জনসমাগম দেখা যায়। আজ বুধবার আনুষ্ঠানিকতার অংশ হিসাবে ইরানের ঐতিহাসিক কারবালা ও নাজাফ শহরে নেওয়া হবে খামেনি কফিনগুলোকে। সেখানে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বৃহস্পতিবার ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদে দাফন অনুষ্ঠিত হবে। সর্বোচ্চ নেতার অসিয়ত অনুযায়ী তাকে হযরত ইমাম রেজা (আ.)-এর মাজারে কবর দেওয়া হবে।

প্রেসটিভি জানায়, ইরাকে শ্রদ্ধা নিবেদনের আনুষ্ঠানিকতায় ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান উপস্থিত থাকবেন। ইরাকেও বিপুল সংখ্যক মানুষ খামেনির শ্রদ্ধা নিবেদনের অনুষ্ঠানে অংশ নেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলায় পরিবারের চার সদস্যসহ নিহত হন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। ওই ইরানের মিনাব শহরে একটি মাধ্যমিক স্কুলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত হয় ১৬৮ শিশু। এরপর পাল্টা হামলা শুরু করে ইরান। ৪০ দিনের তীব্র লড়াইয়ের পর পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি হয়। নতুন সর্বোচ্চ নেতা হন আলী খামেনির ছেলে মুজতবা খামেনি।

পুরো আয়োজনে নেই মোজতবা খামেনি : আলী খামেনিকে শ্রদ্ধা জানানোর পুরো আনুষ্ঠানিকতায় তার ছেলে মোজতবা খামেনি উপস্থিত ছিলেন না। তবে তার তিন ভাই এতে অংশ নিয়েছেন। অনেকে এটাকে ইরানের কৌশল ও যথাযত পদক্ষেপ বলে বর্ণনা করছেন। তবে কেউ কেউ এ পদক্ষেপের সমালোচনাও করেছেন। ইরানের ইরানি কর্মকর্তারা মোজতবা খামেনির অনুপস্থিতির কারণ হিসেবে তাকে হত্যার অব্যাহত হুমকির কথা উল্লেখ করেছেন। খামেনির জন্য আয়োজিত শোকসপ্তাহে তার তিন ছেলে-মোস্তফা, মেইসাম ও মাসউদসহ পরিবারের উপস্থিত হন। যে হামলায় আলী খামেনি নিহত হন, ওই হামলায়ই মোজতবা গুরুতর আহত হয়েছিলেন। প্রশ্ন উঠছে-তিনি কতটা গুরুতর আহত হয়েছিলেন। কেউ কেউ তার চলাফেরার সামর্থ্য নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন। তেহরানে শেষশ্রদ্ধার যোগ দেওয়া ২৬ বছর বয়সী মাসুমেহ বলেন, ‘আমার দেশ আর আগের সেই ইরান নেই, যেখানে নেতা জনসমক্ষে উপস্থিত থাকতেন। মোজতবার অনুপস্থিতি হয়তো খুব একটা বড় বিষয় নয়। কিন্তু তার উপস্থিতি দেশের নিরাপত্তার একটি প্রতীক। আর এখন আমার মনে হচ্ছে-দেশে আগের মতো নিরাপত্তা আর নেই। প্রয়াত নেতাই ছিলেন ইরানের শক্তির প্রতীক।’