ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে এবং করপোরেট কর কমিয়ে সোমবার জাতীয় সংসদে অর্থবিল পাশ হয়েছে। এছাড়াও আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস আইনে কিছু পরিবর্তন আনা হয়। যেমন: কোম্পানি ও ব্যক্তি করদাতার লভ্যাংশ কর আগের মতোই বহাল; জিরো কুপন বন্ডের আয়কে করমুক্ত এবং মিউচ্যুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের ওপর কর রেয়াতপ্রাপ্তির সীমা প্রত্যাহার করা হয়েছে। গবেষণাকে উৎসাহিত করতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের করপোরেট করও ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে।

মূল্যস্ফীতির কশাঘাত থেকে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের স্বস্তি দিতে নতুন অর্থবছরে করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ, করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হয়েছে ৫০ হাজার টাকা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অভিপ্রায় অনুযায়ী এই করহার বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি ব্যক্তিশ্রেণির করদাতার আয়কর ফাইলে থাকা স্বর্ণ বিক্রির গেইন ট্যাক্স ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। ব্যাংক হিসাব খোলা এবং বণ্টননামা দলিল নিবন্ধন ও সম্পত্তি নামজারির ক্ষেত্রে টিআইএন সনদের বাধ্যবাধকতা প্রত্যাহার এবং বহুল আলোচিত ‘স্বতঃপ্রণোদিত বিনিয়োগ প্রদর্শন’ ধারাটিও বিলুপ্ত করা হয়েছে।

সোমবার অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদে বিলটি উত্থাপন করলে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের (বীরবিক্রম) সভাপতিত্বে কণ্ঠভোটে তা পাশ হয়।

বর্তমানে আইপিও, রাইট ইস্যু বা আরপিওর মাধ্যমে পরিশোধিত মূলধনের অন্যূন ১০ শতাংশ শেয়ার পুঁজিবাজারে হস্তান্তর করলে ওইসব কোম্পানির করপোরেট কর সাড়ে ২২ শতাংশ বহাল আছে। এ ধরনের কোম্পানির সব লেনদেন ব্যাংক ট্রান্সফারের মাধ্যমে করলে করহার ২০ শতাংশ। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে যেসব কোম্পানি ১০ শতাংশের কম পুঁজিবাজারে হস্তান্তর করবে, তাদের করহার ২৭ দশমিক ৫০ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশ করা হয়েছে। এ ধরনের কোম্পানি সব লেনদেন ব্যাংক ট্রান্সফারের মাধ্যমে করলে করহার দাঁড়াবে ২২ দশমিক ৫০ শতাংশ। এছাড়া গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে, ভাষা শিক্ষা ও ল্যাঙ্গুয়েজ ল্যাব স্থাপন এবং দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বিনা বেতনে পড়াশোনার সুযোগ দিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের করপোরেট কর ১০ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত বাজেটে লভ্যাংশ উৎসে কর বাতিল করা হয়। এ নিয়ে শেয়ারবাজারে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের মাঝে তীব্র সমালোচনা হয়। শেয়ারবাজারের স্বার্থে আগের মতোই কোম্পানি ও ব্যক্তি করদাতার লভ্যাংশ কর আগের মতোই যথাক্রমে ২০ ও ১০ শতাংশ বহাল রাখা হয়েছে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের চূড়ান্ত বাজেটে সরকার ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা করেছে। ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরের জন্য এ শ্রেণির করদাতাদের করমুক্ত আয়ের সীমা সাড়ে ৩ লাখ থেকে বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করা হয়। একই সঙ্গে ২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ অর্থবছরের জন্য সাড়ে ৪ লাখ এবং ২০৩০-৩১ অর্থবছরের জন্য করমুক্ত আয়সীমা ৫ লাখ টাকা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। সর্বনিম্ন করহার ৫ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। তবে রেয়াতের সীমা কমানো এবং সঞ্চয়পত্র, সরকারি সিকিউরিটিজ, এফডিআর-এর সুদ থেকে কেটে নেওয়া উৎসে করকে চূড়ান্ত কর দায়ের বদলে অগ্রিম কর হিসাবে গণ্য করায় করদাতাদের ওপর করের বোঝা অপরিবর্তিত থাকতে পারে। এছাড়া স্বর্ণ বিক্রিতে গেইন ট্যাক্স ১৫ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। অর্থাৎ রিটার্নে উল্লিখিত স্বর্ণ বা স্বর্ণালংকার বিক্রি থেকে আয় দেখালে তা মূলধনি আয় হিসাবে গণ্য করা হবে।

এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, অঘোষিত সম্পদ বৈধ করতে অনেকে কর ফাইলে বাড়তি স্বর্ণের মজুত দেখান। এ প্রবণতা ঠেকাতেই মূলত এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। করদাতা যেদিন রিটার্নে স্বর্ণ দেখিয়েছেন, সে সময় স্বর্ণের দাম যা ছিল, বর্তমানে বিক্রির সময় যে দাম পাবেন, তার ওপর ৫ শতাংশ কর দিতে হবে।

অবশ্য বহুল আলোচিত ‘স্বতঃপ্রণোদিত বিনিয়োগ প্রদর্শন’ ধারাটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে জমি বা ফ্ল্যাটের প্রকৃত মূল্য দেখানোর সুযোগ রেখে আয়কর আইনে ধারাটি যুক্ত করা হয়েছিল। অবশ্য আবাসন খাতের ব্যবসায়ীদের তীব্র আপত্তি উপেক্ষা করে ডেভেলপারদের সঙ্গে চুক্তির বিপরীতে জমির মালিকের প্রাপ্ত ফ্ল্যাটের ওপর মূলধনি কর বহাল রাখা হয়েছে। এক্ষেত্রে মূলধনি মুনাফা আয়ের ওপর প্রযোজ্য আয়কর, আয়সংশ্লিষ্ট বছর ও পরবর্তী ২ বছরে সমান কিস্তিতে বণ্টন করে পরিশোধ করা যাবে। অর্থাৎ ডেভেলপারকে জমি দেওয়ার বিপরীতে প্রাপ্ত ফ্ল্যাট জমির মালিক বিক্রি করলে ১৫ শতাংশ গেইন ট্যাক্স দিতে হবে। এই কর ৩ বছরে পরিশোধ করা যাবে।

অন্যদিকে চূড়ান্ত বাজেটে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের স্বস্তি দিতে প্যাকেজ ভ্যাট আরোপ থেকে সরে এসেছে সরকার। তবে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে চলতি হিসাব খোলা, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন বা বিকাশ-নগদের মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট খোলার ক্ষেত্রে ব্যবসা শনাক্তকরণ নম্বরের (বিআইএন) বাধ্যবাধকতা বহাল থাকছে। ভ্যাট আইনে এ সংক্রান্ত পরিবর্তন আনা হয়েছে।

বর্তমানে বার্ষিক ৩০ লাখ টাকার নিচে টার্নওভার থাকলে কোনো ব্যবসায়ীকে ভ্যাট দিতে হয় না। টার্নওভার ৩০ থেকে ৫০ লাখ টাকা হলে ৪ শতাংশ হারে টার্নওভার ট্যাক্স দিতে হয়। টার্নওভার ট্যাক্সের সুবিধা হচ্ছে-এতে ইনপুট-আউটপুট ভ্যাটের জটিল হিসাব রাখতে হয় না। আর অসুবিধা হচ্ছে-লাভ-লোকসান নির্বিশেষে মোট বিক্রির ওপর নির্দিষ্ট হারে এই কর দিতে হয়। কোনো উপকরণ ক্রয়ের সময় পরিশোধিত ভ্যাটের কোনো রেয়াত বা সমন্বয় পাওয়া যায় না। বার্ষিক টার্নওভার ৫০ লাখ টাকার বেশি হলে সাধারণত ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট নিবন্ধন নিতে হয়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরেও এই নিয়ম বহাল থাকবে।

এছাড়া স্বর্ণালংকারের পাশাপাশি রুপা, প্লাটিনাম ও ডায়মন্ডের অলংকারে ভ্যাট বসানো হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে ৫ শতাংশের পরিবর্তে শুধু স্বর্ণালংকারে ভরিপ্রতি আড়াই হাজার টাকা সুনির্দিষ্ট কর (ভ্যাট) আরোপ করা হয়। পহেলা জুলাই থেকে রূপার অলংকারে ভরিপ্রতি ১০০, প্লাটিনামে আড়াই হাজার এবং ডায়মন্ডের অলংকারে গ্রামপ্রতি আড়াই হাজার টাকা ভ্যাট বসানো হয়েছে। তবে নিকোটিন পাউচের ওপর সম্পূরক শুল্ক ৪০ থেকে কমিয়ে ৩৫ শতাংশ করা হয়েছে। অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে হিটেড টোব্যাকোর সম্পূরক শুল্ক।

এছাড়া স্থানীয় শিল্পের বিকাশে বিভিন্ন কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক কমানো হয়েছে। পিইটি রেজিন, পিভিসি, কোল্ড-রোলড শিট, রোল প্রোডাক্টের অক্সাইড, বাইসাইকেলসহ বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামালের ওপর প্রস্তাবিত শুল্ক কমানো হয়েছে।