ভারত-শাসিত জম্মু ও কাশ্মীরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে থাকা বই, গবেষণাপত্র ও একাডেমিক প্রকাশনা পর্যালোচনার সরকারি নির্দেশকে ঘিরে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। সমালোচকদের অভিযোগ, এটি একাডেমিক স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ এবং কাশ্মীরের ইতিহাসকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা। তবে প্রশাসনের দাবি, উদ্দেশ্য মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত করা নয়; বরং আইনবিরোধী ও বিভ্রান্তিকর বিষয়বস্তু সরিয়ে ফেলা।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) বিবিসি জানিয়েছে, গত সপ্তাহে জারি করা ওই নির্দেশনায় স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও কোচিং সেন্টারগুলোকে তাদের লাইব্রেরি ও ক্যাম্পাসে থাকা সব ধরনের প্রকাশনা পর্যালোচনা করতে বলা হয়েছে। যেসব বই বা নথিতে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, আইন লঙ্ঘন, শিক্ষাগত মূল্যবোধের পরিপন্থী বিষয় বা জাতীয় নিরাপত্তাবিরোধী উপাদান রয়েছে বলে মনে হবে, সেগুলো কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে।
সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, সন্ত্রাসবাদ, সহিংস উগ্রবাদ, বিচ্ছিন্নতাবাদ বা চরমপন্থাকে উৎসাহিত, বৈধতা প্রদান বা মহিমান্বিত করে—এমন কোনো বিষয়বস্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাখা হবে না। তবে নির্দেশনায় ঠিক কী ধরনের বিষয়কে ‘আপত্তিকর’ বলা হবে, তার স্পষ্ট সংজ্ঞা দেওয়া হয়নি।
এই সিদ্ধান্তের পেছনে সম্প্রতি দুটি সরকারি স্কুল লাইব্রেরিতে থাকা বই নিয়ে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) আপত্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। দলটি অভিযোগ করে, ওই বইগুলো বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতাদের ইতিবাচকভাবে তুলে ধরেছে এবং ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ মনোভাব ছড়িয়েছে। পরে বই দুটি প্রত্যাহার করা হয়, প্রকাশনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিনজনকে গ্রেপ্তার এবং শিক্ষা বিভাগের আট কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক নূর আহমদ বাবা বলেন, এ ধরনের বিধিনিষেধ ভারতের সংবিধানে নিশ্চিত মতপ্রকাশের স্বাধীনতার চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কাশ্মীর স্টাডিজের এক শিক্ষক বলেন, ইতিহাস, শিক্ষা ও পরিচয় যেখানে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্কিত বিষয়, সেখানে বই যাচাইয়ের উদ্যোগ একাডেমিক স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই গুরুতর প্রশ্ন তোলে।
২০১৯ সালে নয়াদিল্লি কাশ্মীরের বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা বাতিল করে অঞ্চলটিকে কেন্দ্রীয় শাসনের আওতায় আনার পর থেকেই নাগরিক স্বাধীনতা সংকুচিত হয়েছে বলে সমালোচকদের অভিযোগ। গত বছর বুকারজয়ী লেখক অরুন্ধতী রায় ও গবেষক এ জি নূরানির বইসহ ২৫টি বই নিষিদ্ধ করা হয়, যার বৈধতা বর্তমানে আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে।
অন্যদিকে বিজেপির মুখপাত্র সুনীল শেঠির দাবি, একাডেমিক স্বাধীনতার নামে বিচ্ছিন্নতাবাদকে মহিমান্বিত করার সুযোগ দেওয়া যায় না। আঞ্চলিক ন্যাশনাল কনফারেন্সের মুখপাত্র ইমরান নবি দারও বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক এড়ানোই সরকারের উদ্দেশ্য, পাঠাভ্যাস সীমিত করা নয়। তবে বিরোধী দল ও শিক্ষাবিদদের আশঙ্কা, এই উদ্যোগ কাশ্মীরের ইতিহাস ও পরিচয় নিয়ে ভিন্নমত প্রকাশের পরিসর আরও সংকুচিত করতে পারে।








