আধুনিক সমাজে ডিভোর্স বা বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে। প্রশ্ন হলো, কেন ভেঙে যায় একটি সম্পর্ক? এটি কি কেবল পরকীয়া, নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও গভীর কারণ?

সম্পর্কবিষয়ক গবেষকেরা বলছেন, ‘‘কোনো একটি কারণ সাধারণত ডিভোর্সের জন্য দায়ী নয়। বরং দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা নানা অসন্তোষ, ভুল বোঝাবুঝি, মানসিক দূরত্ব ও আস্থার সংকট মিলেই সম্পর্ককে ভাঙনের দিকে ঠেলে দেয়।’’

যোগাযোগের ঘাটতি: নীরবতাই বড় শত্রু বহু গবেষণায় দেখা গেছে, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কার্যকর যোগাযোগের অভাব ডিভোর্সের অন্যতম প্রধান কারণ। যখন দাম্পত্য জীবনে খোলামেলা কথা বলা কমে যায়, তখন ছোট সমস্যাও বড় সংকটে রূপ নেয়।

যুক্তরাষ্ট্রের গবেষক স্টিভেন বি. স্কট ও তার সহকর্মীদের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিবাহবিচ্ছেদ হওয়া দম্পতিদের বড় অংশই "নিয়মিত ঝগড়া" এবং "যোগাযোগের অভাব"কে বিচ্ছেদের প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। 

সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ জন গটম্যান দীর্ঘ চার দশকের গবেষণায় দেখিয়েছেন, সমালোচনা, অবজ্ঞা, আত্মরক্ষামূলক আচরণ এবং একে অপরকে এড়িয়ে চলা—এই চার ধরনের আচরণ সম্পর্ক ভাঙনের শক্তিশালী পূর্বাভাস। বিশেষ করে অবজ্ঞা বা সঙ্গীকে তুচ্ছ করার প্রবণতা সম্পর্কের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।  মানসিক দূরত্ব ও সম্পর্কের উষ্ণতা হারিয়ে ফেলা

সব ডিভোর্স নাটকীয় কোনো ঘটনার কারণে হয় না। অনেক সময় দম্পতিরা ধীরে ধীরে একে অপরের কাছ থেকে দূরে সরে যান। একসময় দেখা যায়, একই ছাদের নিচে থাকলেও তারা মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন।

লিন গিগি এবং জোয়ান বি. কেলি পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, ‘মানসিক চাহিদা পূরণ না হওয়া’ ,‘ধীরে ধীরে দূরে সরে যাওয়া’ এবং ‘সম্পর্কে একঘেয়েমি’ ছিল ডিভোর্সের সবচেয়ে বেশি উল্লেখিত কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম। 

পরকীয়া ও বিশ্বাসভঙ্গ বিশ্বাস একটি সম্পর্কের ভিত্তি। সেই বিশ্বাসে ফাটল ধরলে সম্পর্ক টিকে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

পল আর. অ্যামাটো এবং ডেনিস প্রেভিতির গবেষণায় দেখা গেছে, পরকীয়া বা বিশ্বাসঘাতকতা ডিভোর্সের অন্যতম প্রধান কারণ। একই ফল পাওয়া গেছে অন্যান্য বড় আকারের গবেষণাতেও। 

তবে গবেষকেরা বলছেন, পরকীয়া অনেক সময় সম্পর্কের গভীর সমস্যার বহিঃপ্রকাশও হতে পারে। অর্থাৎ, সম্পর্কের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা অসন্তোষ, দূরত্ব বা অপূর্ণ চাহিদা থেকেও এমন ঘটনা ঘটতে পারে। 

অর্থনৈতিক চাপ ও অর্থ নিয়ে দ্বন্দ্ব সংসার পরিচালনায় অর্থ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আয়-ব্যয়ের পরিকল্পনা, ঋণ, খরচের ধরন কিংবা আর্থিক গোপনীয়তা নিয়ে মতবিরোধ সম্পর্কের ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

গবেষণায় দেখা গেছে, অর্থনৈতিক চাপ এবং অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে দ্বন্দ্ব অনেক দম্পতির বিচ্ছেদের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে একজন সঙ্গী যদি অন্যজনের কাছ থেকে ঋণ, ব্যয় বা আর্থিক তথ্য গোপন করেন, তাহলে সম্পর্কের আস্থা নষ্ট হয়। 

প্রতিশ্রুতির অভাব বিয়ে কেবল আইনি বন্ধন নয়; এটি পারস্পরিক দায়বদ্ধতার সম্পর্ক। গবেষণায় দেখা গেছে, সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার মানসিক প্রস্তুতি ও প্রতিশ্রুতির অভাব থাকলে ডিভোর্সের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

বিবাহবিচ্ছেদ হওয়া ব্যক্তিদের ওপর পরিচালিত এক বড় গবেষণায় "প্রতিশ্রুতির অভাব"কে ডিভোর্সের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। 

আসক্তি ও সহিংসতা মাদকাসক্তি, অতিরিক্ত মদ্যপান এবং পারিবারিক সহিংসতা অনেক সম্পর্ককে ভেঙে দেয়। বিশেষ করে শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন দীর্ঘমেয়াদে সম্পর্ককে অসহনীয় করে তোলে।

গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক দম্পতি ডিভোর্সের ‘শেষ কারণ’ হিসেবে পারিবারিক সহিংসতা এবং মাদকাসক্তির কথা উল্লেখ করেছেন। 

গবেষণা বলছে, ডিভোর্স সাধারণত হঠাৎ ঘটে না। এটি দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অসন্তোষ, যোগাযোগের ব্যর্থতা, আস্থার সংকট, মানসিক দূরত্ব এবং পারস্পরিক সম্মানবোধের অবক্ষয়ের ফল। তাই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন নিয়মিত সংলাপ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, স্বচ্ছতা এবং একসঙ্গে সমস্যার সমাধান করার মানসিকতা। অনেক ক্ষেত্রেই সময়মতো কাউন্সেলিং বা পেশাদার সহায়তা একটি সম্পর্ককে নতুন করে গড়ে তুলতে সহায়তা করতে পারে।