ছুটির দিনে সরকারি-বেসরকারি অফিস, আদালত, শিল্পকারখানা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইত্যাদি বন্ধ থাকে। ফলে কমে যায় বিদ্যুতের চাহিদা। সাধারণত লোডশেডিংয়ের ভোগান্তিও কমে; কিন্তু এবার তা হচ্ছে না। এখন ছুটির দিনেও উচ্চ হারে লোডশেডিং হচ্ছে।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ (পিজিবি) পিএলসির হিসাবে, তিন সপ্তাহ ধরে সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্র ও শনিবার গড়ে দুই হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং হয়েছে। বৃষ্টি না হলে এ সপ্তাহে চাহিদা আরও বাড়বে। তখন বাড়তে পারে লোডশেডিংও।
দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের মূল সংস্থা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। তাদের নির্দেশনায় বিদ্যুৎ সঞ্চালন করে পিজিবি। আর ছয়টি বিতরণ সংস্থা গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ দেয়, যার মধ্যে সবচেয়ে বড় পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি)।
এ তিনটি সংস্থার তথ্য বলছে, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা এখন ২৮ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। যদিও জ্বালানিসংকটে উৎপাদন হচ্ছে ১৩ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট। অথচ চাহিদা সাড়ে ১৬ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ফলে দুই থেকে তিন হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ (পিজিবি) পিএলসির হিসাবে, তিন সপ্তাহ ধরে সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্র ও শনিবার গড়ে দুই হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং হয়েছে। বৃষ্টি না হলে এ সপ্তাহে চাহিদা আরও বাড়বে। তখন বাড়তে পারে লোডশেডিংও।
কয়েক বছর ধরেই গ্রীষ্ম মৌসুমে ছুটির দিনেও লোডশেডিং করতে দেখা যাচ্ছে। এবারও তা-ই হচ্ছে। বিদ্যুতের ঘাটতি পূরণে মূলত ঢাকার বাইরে লোডশেডিং করা হচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হচ্ছে আরইবির এলাকায়, অর্থাৎ গ্রামাঞ্চলে। কোনো কোনো গ্রাম এলাকায় দিনে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টার বেশি লোডশেডিং হচ্ছে।
পিজিবির তথ্য বলছে, প্রতিদিন রাত ১০টার পর থেকে বাড়তে থাকে লোডশেডিং। কিছুদিন ধরে রাত ১২টা থেকে ভোর ৪টা পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি লোডশেডিং করা হচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতের পরও প্রায় দুই হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে। এরপর শুক্রবার রাত ১২টায় লোডশেডিং হয় ২ হাজার ২৭৫ মেগাওয়াট। রাত ১টায় এটি বেড়ে হয় ২ হাজার ২৮৪ মেগাওয়াট। গতকাল শনিবার দিনের বেলায়ও প্রায় ১ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট লোডশেডিং করা হয়েছে। রাতে এটি আরও বাড়তে পারে।
সবচেয়ে বেশি হচ্ছে আরইবির এলাকায়, অর্থাৎ গ্রামাঞ্চলে। কোনো কোনো গ্রাম এলাকায় দিনে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টার বেশি লোডশেডিং হচ্ছে।
বিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কয়েক বছর ধরেই মধ্যরাতে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়তি থাকছে। যদিও এ সময় কমার কথা। সারা দেশে রিকশার ব্যাটারির চার্জের কারণে এটি হতে পারে। এর সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে ফুটবল বিশ্বকাপ। অধিকাংশ ম্যাচ হচ্ছে রাত ১১টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত। এ সময় রাত জেগে খেলা দেখার কারণে বিদ্যুতের ব্যবহার বেশি হচ্ছে। কিন্তু ওই সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমানো হয়। এতে ঘাটতি বেড়ে যাওয়ায় বাড়তি লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম প্রথম আলোক বলেন, আগে মধ্যরাতের পর চাহিদা কমে যেত তিন হাজার মেগাওয়াটের মতো। এখন কমছে এক হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি। তিনি বলেন, কয়লা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো হয়েছে। গতকাল থেকে সরবরাহ বেড়েছে। এরপরও কিছুটা ঘাটতি থাকায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে। অত্যন্ত ব্যয়বহুল বলে তেলচালিত কেন্দ্র থেকে বাড়তি উৎপাদন করা যাচ্ছে না।
অধিকাংশ ম্যাচ হচ্ছে রাত ১১টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত। এ সময় রাত জেগে খেলা দেখার কারণে বিদ্যুতের ব্যবহার বেশি হচ্ছে। কিন্তু ওই সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমানো হয়। এতে ঘাটতি বেড়ে যাওয়ায় বাড়তি লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
গ্রামে এখনো বাড়তি লোডশেডিং
আরইবির একটি সূত্র বলছে, শুক্রবার ভোররাত চারটায় শেরপুরে ৫৬ শতাংশ লোডশেডিং করতে হয়েছে। ৬২ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে তারা সরবরাহ পেয়েছে মাত্র ২৭ মেগাওয়াট। গতকাল বিকেল ৫টায় বাগেরহাটে পল্লী বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ৭০ মেগাওয়াট, সরবরাহ পেয়েছে ৪১ মেগাওয়াট।
বেলা ১টায় সিলেট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির (পবিস-১) চাহিদা ছিল ৭২ মেগাওয়াট। যদিও সমিতিটি পেয়েছে ৩৮ মেগাওয়াট। নোয়াখালী, জামালপুর, শেরপুর ও টাঙ্গাইলে খোঁজ নিয়ে উচ্চ হারে লোডশেডিংয়ের তথ্য পাওয়া যায়।
পিডিবির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, গরমের বাড়তি চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। তেলচালিত কেন্দ্র চালানো হচ্ছে না। এগুলো বেশি হারে চালালে খরচ বেড়ে যাবে। কয়লা থেকে উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে। চাইলেও গ্যাস থেকে বাড়ানো যাবে না। কারণ, গ্যাসের সরবরাহ কমছে নিয়মিত। তাই পরিকল্পনা করেই নিয়ন্ত্রিত লোডশেডিং করা হচ্ছে। গরমের সময়টা এভাবেই পার করতে হবে।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তারা বলছেন, গ্রামগুলোতে লোডশেডিং পরিস্থিতি ভয়াবহ। গ্রাহকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। নিয়মিত ফোন করে অসন্তুষ্টির কথা জানাচ্ছে। গ্রাহকদের বুঝিয়ে পরিস্থিতি মানানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে। চাপ বাড়ছে।
পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলামআগে মধ্যরাতের পর চাহিদা কমে যেত তিন হাজার মেগাওয়াটের মতো। এখন কমছে এক হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি।প্রকৃতির ওপর ভরসা
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য বলছে, গত ২০ মে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ১৭ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। ওই সময় কয়লা থেকে দেশে ৬ হাজার ৮১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়েছিল। এখন কয়লা দিয়ে উৎপাদন হচ্ছে গড়ে ৪ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট।
পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিল বকেয়া ৯ হাজার কোটি টাকার বেশি। ৫ হাজার কোটি টাকা বিল বকেয়া থাকায় কয়লা কিনতে পারছে না চট্টগ্রামের বাঁশখালী বিদ্যুৎকেন্দ্র। বকেয়ার চাপ আছে অন্য কেন্দ্রেও। তাই সরবরাহ ধরে রাখা নিয়ে শঙ্কা আছে। কয়েক বছর ধরেই বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিল নিয়মিত পরিশোধ করতে পারছে না পিডিবি। বর্তমানে পিডিবির মোট বকেয়া প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা।
পিডিবির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, ভর্তুকির চাপ কমাতে জুনে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। এতে পিডিবির আয় বাড়বে এবং নতুন করে আর বকেয়া বাড়বে না। তবে পুরোনো বকেয়া শোধ করতে আরও সময় লাগবে। আর তেলচালিত কেন্দ্র না চালালে ভর্তুকির ওপর চাপ কমে আসবে।
প্রচণ্ড গরম পড়ছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় মানুষের দুর্ভোগের শেষ নেই। বিপাকে পড়েছেন কারখানার মালিক, ব্যবসায়ী, কৃষক, ব্যাটারিচালিত যানবাহনের চালকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
জ্বালানি তেলচালিত কেন্দ্রের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৬ হাজার মেগাওয়াট। রাতের বেলা সর্বোচ্চ চাহিদার সময় আড়াই থেকে তিন হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন করা হচ্ছে। তবে অধিকাংশ সময় তেলচালিত কেন্দ্র কম চালানো হয়। তেলচালিত কেন্দ্রের পাওনা প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা। বকেয়া থাকায় কোনো কোনো কেন্দ্র বিদ্যুৎ উৎপাদনে অপারগতা প্রকাশ করছে বলেও জানা গেছে।
প্রচণ্ড গরম পড়ছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় মানুষের দুর্ভোগের শেষ নেই। বিপাকে পড়েছেন কারখানার মালিক, ব্যবসায়ী, কৃষক, ব্যাটারিচালিত যানবাহনের চালকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, আমদানির সামর্থ্য কমায় জ্বালানির সরবরাহ নিশ্চিত নয়। তাই লোডশেডিং এখন স্বাভাবিক হয়ে গেছে, এটা একটা নিত্য বিষয়। নতুন সরকার উদ্যোগী না হলে ভোগান্তি কমবে না, বেশি ভুগবে গ্রামের মানুষ।








