অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, চলতি বছর একটি ‘সুপার’ এল নিনো আবহাওয়া চক্র বিশ্বব্যাপী খাদ্যমূল্যে মারাত্মক ধাক্কা দিতে পারে, যা ২০২৮ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। রবিবার দ্য গার্ডিয়ান এ তথ্য জানিয়েছে।

ইরান যুদ্ধ বিশ্বের খাদ্যমূল্যকে গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে ঠেলে দেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে অর্থনীতিবিদরা জানিয়েছেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সাথে সম্পর্কিত চরম আবহাওয়ার কারণে সরবরাহ শৃঙ্খলগুলো ‘একই সাথে দুটি ধাক্কার’ সম্মুখীন হচ্ছে।

বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, বায়ুপ্রবাহের পরিবর্তনের ফলে মধ্য ও পূর্ব নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরজুড়ে উষ্ণ জল ছড়িয়ে পড়ার মাধ্যমে তৈরি হওয়া এল নিনো ২০২৬-২৭ সালে ‘অত্যন্ত শক্তিশালী’ ঘটনায় পরিণত হওয়ার ঐতিহাসিকভাবে অভূতপূর্ব সম্ভাবনা রয়েছে। এবারের এল নিনো তাপপ্রবাহ, বন্যা এবং আরো ঝড়ো আবহাওয়ার সৃষ্টি করতে পারে।

অনানুষ্ঠানিকভাবে ‘সুপার’ বা ‘গডজিলা’ এল নিনো হিসাবে পরিচিত এই পরিস্থিতি সম্পর্কে মার্কিন ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন গত মাসে নিশ্চিত করে। তারা জানিয়েছে, প্রশান্ত মহাসাগরে উষ্ণায়নের পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে এবং চলতি বছরের শেষের দিকে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হওয়ার ৬৩ শতাংশ সম্ভাবনা রয়েছে।

এমন এক সময়ে যখন বিশ্বজুড়ে পরিবারগুলো আকাশছোঁয়া জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপে জর্জরিত, তখন একটি চরম এল নিনো এই চাপকে আরো বাড়িয়ে দিতে পারে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। নতুন করে মুদ্রাস্ফীতির ধাক্কার আশঙ্কাও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে, যা সুদের হার উচ্চ পর্যায়ে বজায় রাখা হতে পারে এমন উদ্বেগ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

ইতালীয় ব্যাংক ইউনিক্রেডিটের বিশ্লেষকরা একটি গবেষণা নোটে লিখেছেন, “এল নিনো ‘জলবায়ু মুদ্রাস্ফীতি’কে পুনরায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। ইউরোপের সাম্প্রতিক তাপপ্রবাহ এই কথা মনে করিয়ে দেয় যে, জলবায়ুর ভিত্তিস্তর ইতিমধ্যেই পরিবর্তিত হচ্ছে। এল নিনো চলতি বছরের শেষের দিকে চাপের একটি নতুন স্তর যোগ করতে পারে, কারণ এটি বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাবকে আরো বাড়িয়ে তুলবে।”

প্রাকৃতিকভাবে ঘটে চলা এই ঘটনাটির ফসল উৎপাদন এবং খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করার একটি ইতিহাস রয়েছে। এক শতাব্দিরও বেশি আগে, সম্ভবত ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ একটি এল নিনো চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, ব্রাজিল, মিশর এবং ভারতজুড়ে বিপর্যয়কর খরার সৃষ্টি করেছিল। ওই সময় ঔপনিবেশিক শাসনের কারণে পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়েছিল এবং এর ফলে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। দুর্ভিক্ষে মারা যায় লাখ লাখ মানুষ নিহত হয়, যার মধ্যে ১৮৭৬-৭৮ সালে ভারতে ৬০ লাখেরও বেশি মানুষ অন্তর্ভুক্ত ছিল।

১৯৮১-৮২, ১৯৯৬-৯৭, ২০১৫-১৬ এবং ২০২৩-২৪ সালের এল নিনো ঘটনাগুলো ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালীগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল। তবে, এনওএএ-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০২৬-২৭ সালের চক্রটি আরো মারাত্মক হতে পারে – যা বিশ্বজুড়ে ফসল ও খাদ্য সরবরাহের ওপর খরা এবং বন্যার প্রভাব ফেলার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেবে।