বিশ্ব অর্থনীতির পারদ ওঠানামার সঙ্গে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টিতে মানুষের নজর থাকে, তা হলো সোনার দাম। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আন্তর্জাতিক বাজারে এই মূল্যবান ধাতুর দামে এক অভূতপূর্ব অস্থিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বছরের শুরুতে দামের সব রেকর্ড ভেঙে দেওয়ার পর, হঠাৎ করেই আবার তা হু হু করে কমতে শুরু করেছে।

মূলত বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি, ডলারের মান এবং অর্থনীতির নানা মারপ্যাঁচের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে সোনার দামের এই ওঠানামার রহস্য।

সংকট ও ডলারে আস্থাহীনতা

মানুষ যখনই ডলারের ওপর আস্থা হারায়, তখনই সোনার দিকে ঝুঁকে পড়ে। কাছাকাছি সময়ে যতগুলো যুদ্ধ হয়েছে—ইরান, ইরাক, লিবিয়া সংকট, এমনকি চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের যে অর্থনৈতিক যুদ্ধ হয়েছে, তখনো আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম বেড়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতেও পুরো ইউরোপ সোনার দিকে ঝুঁকছে।

আরও পড়ুন

ধারণার চেয়েও কমে যেতে পারে সোনার দাম, বলছে পূর্বাভাস

মোদ্দা কথা হলো, আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের দাম কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়ে সোনার বাজারে। এছাড়া বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন সংকটের সময় সোনা বেশি কেনে, তখন স্বাভাবিকভাবেই এর দাম অনেক বেড়ে যায়।

ক্রুড অয়েল এবং সোনা

ক্রুড অয়েল বা অপরিশোধিত তেল এবং সোনা একে অপরের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। নানা দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ডলার যেমন রিজার্ভ হিসেবে থাকে, তেমনি সোনাও গচ্ছিত থাকে।

সোনা একটি পণ্য হলেও মূল্য পরিশোধের মাধ্যম হিসেবে এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। তেলের দাম বাড়লে সাধারণত সোনার দামও বাড়ে, আবার উল্টোটাও ঘটে। মুদ্রাবাজারে অস্থিরতা থাকলে প্রায়শই অপরিশোধিত তেলের মূল্য সোনায় পরিশোধ করা হয়। ক্রুড অয়েল উৎপাদনকারী দেশগুলো এই পদ্ধতি বেছে নেয় যখন তারা ডলারের মূল্য পড়ে যাওয়ার শঙ্কা বোধ করে।

আরও পড়ুন

সোনা কেন কিনে রাখবেন?

তেলের দাম বাড়লে বাজারে দ্রব্যমূল্য বাড়ে। যার ফলে মানুষ শঙ্কিত হয়ে সোনা মজুত রাখার প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়, আর তখনই দাম বাড়ে।

সোনা জমিয়ে রাখলে কি দাম বাড়ে?

বাংলাদেশের কোনো সাধারণ পরিবার কিংবা একটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক—সবার মাঝেই বিভিন্ন পর্যায়ে সোনা জমিয়ে রাখার প্রবণতা রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক সায়মা হক বলেন, এটি এমন এক বিনিয়োগ, যা কিনলে ও জমিয়ে রাখলে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা থাকে না।

‘একটি উদাহরণ দেই। করোনাভাইরাস মহামারির সময়ে যখন অনেক ব্যবসায় ধস নামছিল তখন বিনিয়োগে এক ধরনের অনিশ্চয়তা ছিল। যে কোনো ধরনের বিপর্যয় বা অনিশ্চয়তা যখন তৈরি হয়, যখন একটি অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন মানুষ অন্য কোনো খাতে বিনিয়োগের তুলনায় যে বিনিয়োগটা নিরাপদ মনে করে, সেখানে অর্থ রাখতে চায়। এক্ষেত্রে সোনাকে বেছে নেওয়ার প্রবণতা অনেক বেশি। কারণ সোনা অপেক্ষাকৃত নিরাপদ।’

আরও পড়ুন

ভরি-ক্যারেট-হলমার্ক / সোনা কেনার আগে যেসব বিষয় জানা জরুরি

কেননা যে কোনো সংকটে সাধারণত সবচেয়ে প্রথম প্রভাব পড়তে থাকে শেয়ারবাজার, বন্ড ও মুদ্রার দামে। শেয়ারবাজারে যেমন দামে হঠাৎ ধস নামতে পারে, সোনার বেলায় তেমনটা সাধারণত হয় না। তখন সোনাই হয়ে ওঠে বিপদের বন্ধু, বলেন সায়মা হক।

চাহিদা ও জোগানের মনস্তত্ত্ব

সোনা তেল ও গ্যাসের মতো শেষ হয়ে যায় না। নানা হাত ঘুরে তা শেষ পর্যন্ত পৃথিবীতেই থাকে। তাই সোনার স্থায়িত্ব অনন্য। অন্যদিকে পৃথিবীতে সোনার প্রাকৃতিক মজুত নির্দিষ্ট পরিমাণেই রয়েছে।

সাধারণত বাজারে যে কোনো পণ্যের দাম নির্ধারিত হয় সেই পণ্যের চাহিদা এবং জোগানের ভিত্তিতে। তবে সোনার দামের ক্ষেত্রে এর জোগানের চেয়ে ভোক্তার আচরণ ও মনস্তত্ত্ব অনেক বেশি প্রভাব ফেলে।

অর্থনীতির দুর্দিনে মানুষ সোনা কেনার দিকে ঝুঁকে পড়ে। কাগজের মুদ্রার মূল্য ধরে রাখা যায় না বিধায় মনে করা হয়—সোনা কিনে রাখা লাভজনক, কারণ এর দাম কমার চেয়ে বাড়ার প্রবণতাই বেশি।

আরও পড়ুন

সোনার দামে রেকর্ড পতন, এই সুযোগ থাকবে কতদিন?

অধ্যাপক সায়মা হকের মতে, বিপদের সময় সোনায় বিনিয়োগ ও সংরক্ষণ করার প্রবণতা বাড়ে বলেই এর দামও বাড়ে।

বাংলাদেশের বাজারে সোনার দাম

যখনই সংকট, ডলারের মূল্য, তেলের দাম, মূল্যস্ফীতি কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি সোনার দাম বাড়িয়ে দেয়, তখন স্বাভাবিক নিয়মেই বাংলাদেশেও এর দাম বাড়ে।

কিন্তু বাংলাদেশের বাজারে যে সোনা বিক্রি হয়, তার বেশিরভাগই চোরাচালান হয়ে আসে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব সোনা থেকে সরকার সরাসরি কোনো রাজস্ব পায় না।

আর এ কারণেই বাংলাদেশের বাজারে সোনার দাম আসলে কীভাবে এবং কাদের নিয়ন্ত্রণে নির্ধারিত হয়, তা নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তোলেন।

সূত্র: বিবিসি বাংলা
কেএএ/