ইরানের রাজধানী তেহরানে প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শোক র্যালিতে লাখ লাখ মানুষ অংশ নিয়েছে। সপ্তাহব্যাপী আনুষ্ঠানিকতার তৃতীয় দিন সোমবার ভোরে এই শোকযাত্রা শুরু হয়। তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা ধর্মীয় কমপ্লেক্স থেকে খামেনির কফিনসহ র্যালি শুরু হয়ে মেহরাবাদ বিমানবন্দরের কাছে শহীদ লাশগাড়ি মহাসড়কে শেষ হয়। ১০ কিলোমিটার দূরত্বের এই র্যালিকে কেন্দ্র করে পুরো রাজধানী পরিণত হয় জনসমুদ্রে। ইরানি কর্তৃপক্ষ একে শতাব্দীর সবচেয়ে বড় জনসমাগম বলছে।
শোকর্যালি ঘিরে শোকাহত ইরানিরা লাল পতাকা উড়ান। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলবিরোধী স্লোগানে উত্তাল করে তোলেন পুরো এলাকা। বিবিসি লিখেছে, এই মিছিল থেকে ইরানিরা প্রতিরোধ ও জাতীয় ঐক্যের বার্তা দিয়েছেন। শোকাহতরা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ছবিসম্বলিত পোস্টারে পাথর ছুড়েছেন, প্রতিশোধের হুমকি দিয়েছেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানায়, স্থানীয় সময় সোমবার সকাল ৬টায় গ্র্যান্ড মোসাল্লা থেকে খামেনির কফিনসহ শোকর্যালি শুরু হয়। এর আগে দুদিন এখানে তার মরদেহ সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হয়েছিল।
আয়োজকদের ভাষ্য, সেখান থেকে শোকর্যালিটি দামাভান্দ স্ট্রিট, ইমান হোসেইন স্কয়ার, এনকেলাব আজাদি স্ট্রিট, আজাদি স্কয়ার ও শেষে শহীদ লাশগাড়ি মহাসড়ক পৌঁছাতে ১২টার মতো সময় লাগে। এ সময় লাখ লাখ মানুষ প্রিয় নেতার কফিনে ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে শ্রদ্ধা জানান। এই মিছিলে নেতৃত্ব দেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও বিচার বিভাগের প্রধান গোলাম হোসেইন মোহসেনি এজেই।
এ উপলক্ষ্যে ইরানের প্রেসিডেন্ট এক বার্তায় বলেন, শহীদ নেতা আমাদের শিখিয়েছেন যে, ইরানের জনগণ ও জাতীয় ঐক্যই আমাদের শ্রেষ্ঠ সম্পদ।
এর আগে এই মিছিল উপলক্ষ্যে তেহরানের আকাশসীমা পুরোপুরি বন্ধ ঘোষণা করা হয়। তবে মঙ্গলবার থেকে বিমান চলাচল স্বাভাবিক থাকবে জানানো হয়েছে।
এর আগে রোববার তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় সকালে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও তার পরিবারের সদস্যের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে ইমামতি করেন আয়াতুল্লাহ জাফর সোবহানি। এতে কালো পোশাক পরে লাখো নারী-পুরুষ সেখানে জড়ো হন। তাদের অনেকেরই হাতে প্রয়াত নেতার ছবি ছিল। ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতার এই শোক আনুষ্ঠানিকতায় শতাধিক নেতারা অংশ নিচ্ছেন।
রোববার জানাজা নামাজের সামনের সারিতে উপস্থিত ছিলেন আলী খামেনির তিন ছেলে- মাসুদ খামেনি, মাইসাম খামেনি ও মুস্তফা খামেনি। চার মাসের বেশি সময় পর তারা জনসমক্ষে এলেন। তবে ‘অসুস্থতা ও নিরাপত্তাজনিত কারণে’ তাদের আরেক ভাই ও ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি বাবার জানাজায় অংশ নিতে পারেননি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় পরিবারের কয়েক সদস্যসহ নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। নিরাপত্তার কারণে চার মাসেরও বেশি সময় পর তার দাফন সম্পন্ন হতে যাচ্ছে। ওই হামলায় ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিও আহত হন।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলা শুরুর পর পালটা আক্রমণ করে ইরান। তেহরান ইসরাইলের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে হানা দেয়। এতে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এর মধ্যে বিশ্ব জ্বালানির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌরুট হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যায়। চাপে পড়ে মার্কিন অর্থনীতি ও মিত্ররা। এক পর্যায়ে কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতিতে যায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। ওই সমঝোতায় ইরানের নেতৃত্ব দেওয়া স্পিকার বাঘের গালিবাফ রোববার বলেছেন, ওই সমঝোতা বাস্তবায়ন কঠিন, তবে সম্ভব।
ইরান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আজ মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকতার অংশ হিসাবে আলী খামেনির লাশ ইরানের ধর্মীয় শিক্ষার শহর কোম-এ নিয়ে যাওয়া হবে। সেখান থেকে লাশটি বিমানে ইরাকে নেওয়া হবে। বুধবার ইরাকের নাজাফ ও কারবালায় বিশেষ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হবে। পরদিন বৃহস্পতিবার আলী খামেনির লাশ আবার ইরানে আনা হবে। সেখান থেকে তার জন্মশহর মাশহাদে তাকে সমাহিত করা হবে।
প্রেস টিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, খামেনির শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী মাশহাদে ইমাম রেজা (আ.)-এর পবিত্র মাজার প্রাঙ্গণে তাকে দাফন করা হবে।








