ছবির উৎস, AFP via Getty Images

ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জন্য শোক ও শ্রদ্ধা প্রকাশে হাজারো মানুষ তেহরানের মোসাল্লা এলাকায় জড়ো হয়েছেন।

খামেনির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার ছয় দিনব্যাপী রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা আর শনিবার থেকে শুরু হচ্ছে বলে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে।

তেহরানে অবস্থানরত এএফপির একজন সংবাদদাতা জানিয়েছেন, খামেনির মরদেহবাহী কফিন মোসাল্লায় পৌঁছানোর আগেই অগণিত মানুষ জড়ো হন। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে অনেককে লাল পতাকা ও প্ল্যাকার্ড বহন করতে দেখা গেছে। এই রংটি প্রতিশোধের আহ্বানের সঙ্গে সম্পর্কিত হিসেবে বিবেচিত হয়।

সেখানে উপস্থিত ব্যক্তিরা "আমেরিকার ধ্বংস হোক" এবং "প্রতিশোধ, প্রতিশোধ" স্লোগান দিচ্ছিলেন বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

বিশাল ওই ধর্মীয় কমপ্লেক্সে কফিন স্থাপনের পর ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, সরকারি কর্মকর্তা, বিদেশি গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং অন্যান্য শোকাহত মানুষ ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানান।

শ্রদ্ধা নিবেদনকারীদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি আলোচনা মধ্যস্থতায় ভূমিকা রাখা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ ও আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকিও উপস্থিত ছিলেন।

এ ছাড়া ইরাক, আর্মেনিয়া, তুরস্ক ও উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশের প্রতিনিধিরাও শোকযাত্রায় অংশ নিতে সেখানে পৌঁছেছেন। এসব দেশের মধ্যে সৌদি আরব, কাতার ও ওমানও রয়েছে।

এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ওয়াশিংটন তেহরানকে ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনিকে দাফন করার জন্য এক সপ্তাহ সময় দিয়েছে, "কারণ আমরা ভালো"।

End of সর্বাধিক পঠিত

উল্লেখ্য, প্রায় ৩৭ বছর ক্ষমতায় থাকা ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর প্রথম দিকেই নিহত হন। চার মাসের বেশি সময় পর তাকে দাফনের আনুষ্ঠানিকতা চলছে।

খামেনির সঙ্গে তার পরিবারের চারজন সদস্যও নিহত হন।

বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল ফলো করতে এখানে ক্লিক/ট্যাপ করুন

ছবির উৎস, Getty Images

এই আয়োজনকে ইরানের ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং বিপ্লবী আদর্শের প্রতি জনসমর্থন প্রদর্শনের একটি উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

খামেনির মরদেহ ইরান ও ইরাকের প্রধান শিয়া ধর্মীয় কেন্দ্র কুম, নাজাফ এবং কারবালায় নেওয়ার কথা রয়েছে।

এরপর বৃহস্পতিবার তাকে দেশটির সবচেয়ে পবিত্র তীর্থস্থান ও তার নিজ শহর মাশহাদে দাফন করা হবে।

ছবির উৎস, EPA

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, বৃহস্পতিবার গভীর রাতে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির কফিন জনসাধারণের সামনে আনা হয়। সে সময় কান্নারত সমর্থকদের একটি বড় দল সেখানে উপস্থিত ছিল।

শোকগাঁথা গাওয়ার তালে তালে তারা দুলছিলেন এবং মাথায় আঘাত করছিলেন। এ সময় কফিনের ওপর থেকে ফুল ছুড়ে দেওয়া হয় জনতার দিকে।

শুক্রবার তার কফিন এবং তার সঙ্গে নিহত পরিবারের সদস্যদের কফিন শায়িত রাখা হয় সেই বৃহৎ নামাজের হলে, যা তার পূর্বসূরি আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির সম্মানে নির্মিত হয়েছিল।

ইরানের জন্য খামেনির এই শেষ বিদায় অনুষ্ঠান এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের সমর্থনপুষ্ট ধর্মীয় শাসকগোষ্ঠী নিজেদের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে একটি যুদ্ধ থেকে টিকে যাওয়ার পর আত্মবিশ্বাসী অবস্থানে রয়েছে।

আগামী কয়েক দিনের বড় শোকযাত্রাগুলোয় লাখো মানুষকে অংশগ্রহণে উৎসাহিত করতে কর্তৃপক্ষ পরিবহন, খাবার ও থাকার ব্যবস্থার পরিকল্পনা করেছে।

সব মিলিয়ে খামেনির প্রতি শোক জানাতে এক কোটি ২০ লাখ থেকে দুই কোটি মানুষের সমাগম হতে পারে বলে ইরানি কর্মকর্তারা ধারণা করছেন।

End of বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, Getty Images

খামেনির জানাজার আগে সরকারের দিক থেকে জাতীয় ঐক্যের ঘোষণা এলেন দেশটির ভেতরে এখনকার মতো বিভাজন এর আগে খুব কম সময়েই এত গভীর ছিল বলে মনে করা হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, ধর্মীয় নেতৃত্বের প্রতি জনসমর্থন অত্যন্ত দুর্বল। আর নতুন সর্বোচ্চ নেতা, খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনিকে তার বাবার নিহত হওয়ার পর থেকে কোনো নতুন ছবিতে দেখা যায়নি। তিনি ওই হামলায় আহত হয়েছিলেন।

মোজতবা খামেনি তার বাবাসহ পরিবারের সদস্যদের শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতায় উপস্থিত থাকবেন কি না সেব্যাপারে এখনো কিছু জানানো হয়নি তার কার্যালয় বা সরকারের পক্ষ থেকে।

ইরানের ওপর বহু বছরের কঠোর নিষেধাজ্ঞা দেশটির অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিয়েছে। একই সঙ্গে দেশব্যাপী গণবিক্ষোভের ধারাবাহিকতা ও তীব্রতা বাড়ার পর নিরাপত্তা বাহিনী কঠোর শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে দমন করেছে। এর পরিণতিতে জানুয়ারিতে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী নিহত হন।

এই সপ্তাহে সেই গভীর সমস্যাগুলোকে আড়ালে সরিয়ে রেখে কর্তৃপক্ষ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও ব্যাপক জনসমর্থনের একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে।

ছবির উৎস, Tasnim

রয়টার্স জানায়, তেহরানের সড়কগুলোয় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। প্রধান সড়কজুড়ে মোতায়েন রয়েছে সামরিক ও পুলিশ যানবাহন, আর পুলিশ সদস্য ও কালো পোশাক পরিহিত স্বেচ্ছাসেবী বাসিজ আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যরা মোটরসাইকেলে টহল দিচ্ছিলেন।

জানাজা চলাকালে কোনো হামলা চালানোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে সতর্কও করেছে ইরান।

শুক্রবার কফিনগুলো পৌঁছানোর পর, অপেক্ষমাণ জনতার উঁচু করে তোলা হাতের ওপর দিয়ে সেগুলো বহন করে আনা হয়। এরপর জাতীয় পতাকা ও কালো শোকপতাকায় ঘেরা, উঁচু ও সূক্ষ্ম টাইলসের কারুকাজখচিত খিলানাকৃতির একটি অংশের সামনে সাদা ধাপযুক্ত মঞ্চে সেগুলো রাখা হয়।

খামেনির কফিনের ওপর একটি কালো পাগড়ি রাখা ছিল। পাগড়িটি রাখা ছিল ভাঁজ করা একটি চেক নকশার স্কার্ফের ওপর, যা ইরানে বিপ্লবী আদর্শ ও ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।

শোক ও শ্রদ্ধা জানাতে তেহরানে আসা বিদেশি নেতা ও কর্মকর্তাদের মধ্যে ছিলেন রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ, চীনের ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের উপপ্রধান হে উই, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং ইরাকের প্রেসিডেন্ট নিজার আমেদি।

ইসরায়েলি হামলায় নিহত ইরানের ঘনিষ্ঠ লেবানণি মিত্র হেজবুল্লাহ নেতা হাসান নাসরাল্লাহ এবং জ্যেষ্ঠ কমান্ডার ইমাদ মুঘনিয়েহর পরিবারের সদস্যরাও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্বও—যার মধ্যে ছিলেন প্রেসিডেন্ট, পার্লামেন্টের স্পিকার, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং অন্যান্য কর্মকর্তারা শুক্রবার সকালে সেখানে এসে কান্না ও প্রার্থনায় অংশ নেন। একদল জেনারেল কফিনের সামনে দাঁড়িয়ে সামরিক অভিবাদন জানান।

তাদের মধ্যে ছিলেন রেভল্যুশনারি গার্ডের নতুন প্রধান আহমাদ বাহিদি। হত্যাচেষ্টার আশঙ্কায় নিয়োগ পাওয়ার পর থেকে তাকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি।

এদিকে, ইরাকের সংবাদ সূত্রগুলো জানিয়েছে যে, আলী খামেনির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া উপলক্ষে দেশটির রাজধানী বাগদাদে অফিস-আদালত বুধবার বন্ধ থাকবে।

ছবির উৎস, Getty Images

এদিকে, শুক্রবার রাতে মাউন্ট রাশমোরে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ২৫০তম বার্ষিকী উদযাপনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে "একটি চুক্তি করতে" চায়।

বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, "আমরা এক দিনে ভেনেজুয়েলাকে পরাজিত করেছি এবং ইরানকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছি।"

"তারা একটি চুক্তি করতে অত্যন্ত আগ্রহী। এই বিষয়টির সমাধান করতে তারা খুবই মরিয়া।"

তিনি আরও বলেন, "আমরা তাদের দাফনের জন্য এক সপ্তাহ সময় দিয়েছি, কারণ আমরা ভালো।"

ছবির কপিরাইট

© 2026 বিবিসি। বাইরের কোন সাইটের তথ্যের জন্য বিবিসি দায়বদ্ধ নয়। বাইরের লিংক সম্পর্কে বিবিসির দৃষ্টিভঙ্গি সম্বন্ধে পড়ুন।