টেবিলের নিচে এক পাশে রাখা একটি রোভার। ওপরে সাজানো জলযান ও ড্রোনের মডেল। তিনটি প্রযুক্তিই কাজ করবে কৃষি ও মৎস্য খাতে। ফার্মিং রোভার বিশ্লেষণ করবে জমি ও ফসলের অবস্থা, জলযান নজর রাখবে মাছের চাষ আর মাছ ধরার কাজে। আর ড্রোন ব্যবহার হবে বিভিন্ন সহায়ক কাজে।

এটি কোনো প্রতিষ্ঠিত প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানের উদ্ভাবন নয়। ধারণাটি এসেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র উচ্চবিদ্যালয়ের তিন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে। তাদের সঙ্গে রয়েছেন দুই শিক্ষক।

জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতা থেকে সেরা ১০টি দল নির্বাচিত হবে। বিজয়ী শিক্ষার্থীরা পাবেন ২০ হাজার টাকা ও সনদপত্র। বিজয়ী শিক্ষকেরা পাবেন ৩০ হাজার টাকা ও সনদপত্র। কাল বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত সমাপনী অনুষ্ঠানে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের।

আজ রোববার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত ‘স্টার্টআপ, সায়েন্স প্রজেক্ট অ্যান্ড ইনোভেশন আইডিয়া শোকেসিং প্রোগ্রাম’-এ তারা নিজেদের উদ্ভাবনী ধারণা তুলে ধরেছে।

দলের সদস্য মো. আমজাদ হোসেন সাদিক অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী। তার সঙ্গে রয়েছে দশম শ্রেণির আরও দুই শিক্ষার্থী। নিজেদের প্রকল্প সম্পর্কে আমজাদ জানায়, দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষি ও মৎস্য খাতের সঙ্গে যুক্ত। সেই বাস্তবতা থেকেই তিনটি ইউনিট নিয়ে তাদের পরিকল্পনা।

এর মধ্যে ফার্মিং রোভার জমির অবস্থা বিশ্লেষণ করে কী ধরনের পরিচর্যা প্রয়োজন, তা ওয়েবসাইটে জানাবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) ক্যামেরার মাধ্যমে গাছের আক্রান্ত অংশ শনাক্ত করবে, প্রয়োজনীয় প্রতিকারও দেবে। কোনো অংশ রক্ষা করা সম্ভব না হলে নির্দিষ্ট অংশ লেজারের সাহায্যে কেটে ফেলবে, যাতে পুরো গাছ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। এই প্রক্রিয়ায় উদ্ভিদেরও কোনো ক্ষতি হবে না। স্বয়ংক্রিয় জলযান অক্সিজেনসহ বিভিন্ন উপাদান পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। আর ড্রোন কৃষি ও মৎস্য খাতের বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা যাবে।

এ সময় দলের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক মঈন উদ্দিন বলেন, বর্তমানে বাজারে যেসব রোভার রয়েছে, সেগুলো মূলত রোগ দেখা দেওয়ার পর ব্যবস্থা নেয়। তাঁদের উদ্ভাবনের লক্ষ্য হলো রোগ ছড়িয়ে পড়ার আগেই তা শনাক্ত করে প্রতিকার নিশ্চিত করা। এতে কৃষকের উৎপাদনশীলতা বাড়বে এবং কৃষকদের কল্যাণ হবে বলে তাঁদের বিশ্বাস।

সোমবার হবে চূড়ান্ত প্রদর্শনী ও পুরস্কার বিতরণ। তার আগে রোববার চলছে প্রদর্শনী ও বিচার কার্যক্রম। জেলা ও মহানগর পর্যায়ে নির্বাচিত ১০১টি দল তাদের উদ্ভাবনী ধারণা, বিজ্ঞান প্রকল্প ও স্টার্টআপ উপস্থাপন করছে বিচারকদের সামনে।

শুধু এই একটি উদ্ভাবন নয়, বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে এখন চলছে এমন শ খানেক উদ্ভাবনী ধারণা, বিজ্ঞান প্রকল্প ও স্টার্টআপ আইডিয়ার প্রদর্শনী। ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে আয়োজিত এই প্রদর্শনী যেন তরুণ মেধা, বিজ্ঞানচর্চা ও উদ্যোক্তা চিন্তার এক প্রাণবন্ত উৎসবে পরিণত হয়েছে।

আগামীকাল সোমবার হবে চূড়ান্ত প্রদর্শনী ও পুরস্কার বিতরণ। তার আগে আজ রোববার চলছে প্রদর্শনী ও বিচার কার্যক্রম। জেলা ও মহানগর পর্যায়ে নির্বাচিত ১০১টি দল তাদের উদ্ভাবনী ধারণা, বিজ্ঞান প্রকল্প ও স্টার্টআপ উপস্থাপন করছে বিচারকদের সামনে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) এডুকেশনাল এক্সিলেন্স সাপোর্ট স্কিমের আওতায় প্রথমবারের মতো এ আয়োজন করা হয়েছে। ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের অংশগ্রহণে প্রতিযোগিতাটি উপজেলা বা থানা, জেলা এবং জাতীয়—এই তিন ধাপে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

এডুকেশনাল এক্সিলেন্স সাপোর্ট স্কিমের প্রোগ্রাম অফিসার তানভীর আহমেদ সিদ্দিকী প্রথম আলোকে জানান, প্রথম ধাপে ১২ জুন দেশের ৫২১টি উপজেলা ও মহানগরীর শিক্ষা থানায় প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। এতে ৮ হাজার ২৯টি দলে ২৭ হাজার ২০৪ জন শিক্ষার্থী এবং ১৬ হাজার ৫৮ জন শিক্ষক অংশ নেন। পরে উপজেলা থেকে নির্বাচিত ৫৪৬টি দল ১৪ জুন জেলা পর্যায়ে অংশ নেয়। সেখান থেকে বাছাই হয়ে এখন জাতীয় পর্যায়ের চূড়ান্ত পর্বে এসেছে ১০১টি দল।

আরও যত উদ্ভাবন

বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জের সরকারি পাতারহাট মুসলিম মডেল উচ্চবিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী প্রদর্শন করছে এআইনিয়ন্ত্রিত বোমা নিষ্ক্রিয়করণ রোবট।

ঢাকার সরকারি বিজ্ঞান কলেজের তিন শিক্ষার্থী এনেছে একটি রকেট প্রকল্প। দলের সদস্য রিফাত আহমেদ বলেন, রকেট নতুন কোনো প্রযুক্তি নয়। তাঁদের উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীদের মধ্যে মহাকাশবিজ্ঞান নিয়ে আগ্রহ তৈরি করা এবং ভবিষ্যতে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরাও যেন মহাকাশচারী হওয়ার স্বপ্ন দেখতে পারে।

কুড়িগ্রামের চিলমারী সিনিয়র মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা উপস্থাপন করছে স্মার্ট সিটির ধারণা। কুষ্টিয়া জিলা স্কুলের শিক্ষার্থীরা দেখাচ্ছে বাক্প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অভিব্যক্তি প্রকাশে সহায়ক একটি উদ্ভাবনী ব্যবস্থা। আর নেত্রকোনার বারহাট্টার বাউসী অর্দ্ধচন্দ্র উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ওয়েবসাইটভিত্তিক একটি প্ল্যাটফর্মের ধারণা তুলে ধরেছে।

জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতা থেকে সেরা ১০টি দল নির্বাচিত হবে। বিজয়ী শিক্ষার্থীরা পাবেন ২০ হাজার টাকা ও সনদপত্র। বিজয়ী শিক্ষকেরা পাবেন ৩০ হাজার টাকা ও সনদপত্র। কাল বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত সমাপনী অনুষ্ঠানে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের।

এ প্রতিযোগিতার বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল কিছুদিন আগে প্রথম আলোকে বলেছিলেন, এই আয়োজনের মাধ্যমে স্থানীয় সমস্যার স্থানীয় সমাধান খুঁজে বের করারও সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী চিন্তা ও বিজ্ঞানভিত্তিক উদ্যোগকে উৎসাহিত করার মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে নতুন উদ্যোক্তা তৈরির পথও উন্মুক্ত হবে।