খুলনা মহানগরীর অন্যতম প্রধান ও অতি জনগুরুত্বপূর্ণ শিপইয়ার্ড সড়কটি দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারহীন থাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে। বড় বড় গর্ত আর কাদার কারণে এই সড়ক দিয়ে প্রতিনিয়ত যাতায়াতকারী হাজার হাজার সাধারণ ও যানবাহন চালকদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত প্রায় ১৪ বছরে কেডিএ সড়কের কাজ বাস্তবায়ন করতে পারেনি খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে টানা বৃষ্টিতে কেডিএ সড়কের অবস্থা আরও খারাপ হয়ে গেছে। এই কাদার রাস্তায় প্রতিদিন রিকশা উল্টে যায়, সাধারণ মানুষ পিছলে পড়ে। বড় ট্রাকও উল্টে যায়।
গত রোববার (১২ জুলাই) খুলনা মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও বিসিবির পরিচালক শফিকুল আলম তুহিন মহানগর বিএনপির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির উদ্যোগে দলীয় বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী নিয়ে কাদা-পানিতে নেমে ইট বিছিয়ে সড়কটির গর্ত থাকা অংশ মেরামত করেন।
আরও পড়ুন
অবৈধ ফুটপাত আর অটোর দৌরাত্ম্যে অচল গৌরীপুর বাজার
খুলনা মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল আলম তুহিন বলেন, শিপইয়ার্ড সড়কটি দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ চলাচল করেন। অথচ দীর্ঘদিন ধরে এই রাস্তাটি মরণফাঁদে পরিণত হয়ে আছে। এমন কাদার সৃষ্টি হয়েছে যে, গর্ভবতী নারী, অসুস্থ রোগী কিংবা স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের যাতায়াত একেবারে অসম্ভব হয়ে পড়েছে। আমরা জনগণের দল করি। জনগণের এই চরম দুর্ভোগের দিনে বসে থাকতে পারি না।
কেডিএ সূত্রে জানা যায়, ২০১০ সালে খুলনা নগরীর রূপসা ট্রাফিক মোড় থেকে শিপইয়ার্ডের সামনে দিয়ে খানজাহান আলী সেতু (রূপসা সেতু) পর্যন্ত সড়কটি প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেয় খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কেডিএ)। শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন প্রকল্প একনেকে অনুমোদন পায় ২০১৩ সালের ৭ মে। মেয়াদকাল ধরা হয় ২০১৫ সালের জুন পর্যন্ত। পরে তা বাড়িয়ে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। এরপর প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। পরে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়। প্রকল্পের শুরুতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৯৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা। এরমধ্যে ২০২০ সালের ২১ জুলাই ‘খুলনা শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন (প্রথম সংশোধিত)’ প্রকল্প আবার একনেকে অনুমোদন হয়। তখন প্রকল্প ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ২৫৯ কোটি ২১ লাখ টাকা।
আরও পড়ুন
৬৫ লাখ টাকার সড়ক টিকলো এক সপ্তাহ
অনুমোদনের পর ২০২২ সালের ১২ জানুয়ারি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘আতাউর রহমান লিমিটেড এবং মাহাবুব ব্রাদার্স প্রাইভেট লিমিটেড’কে (জয়েন্ট ভেঞ্চার) কার্যাদেশ দেয় কেডিএ। একই বছরের ২০ জানুয়ারি কাজ শুরু করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। প্রকল্পের আওতায় রয়েছে, ৩ দশমিক ৭৭৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের সড়কটি চার লেনে নির্মাণ, দুই পাশে নতুন ড্রেন ও ড্রেনের ওপর পথচারীদের হাঁটার জন্য প্রশস্ত ফুটপাত, সড়কের মাঝখানে শূন্য দশমিক ৯২ মিটার ডিভাইডার নির্মাণ, মূল রাস্তা, ডিভাইডার, ড্রেন ও ফুটপাত মিলিয়ে সড়কটি ৬০ ফুট চওড়া হবে। নির্মাণ করা হবে ৪৮ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি সেতু, একটি স্লুইসগেট ও একটি কালভার্ট। এছাড়া রাস্তাটি আগের চেয়ে প্রায় তিন ফুট উঁচু হবে। দুটি মনুমেন্ট স্থাপন এবং ৪২০টি বৃক্ষ রোপণ করা হবে।
খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের একাধিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কাজ অসমাপ্ত রেখে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাহাবুব ব্রাদার্স বিল তুলে নেয়। পরে প্রকল্প কর্মকর্তারা কাজ সম্পন্ন করতে পারেনি। পরবর্তীতে এই প্রকল্পের বাকি অংশের কাজ সমাপ্তের জন্য একনেকে অনুমোদনের কাগজ পাঠানো হয় মন্ত্রণালয়ে। পরে চলতি বছরের গত ৯ জুন অনুষ্ঠিত একনেক সভায় ‘খুলনা শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ (তৃতীয় সংশোধন)’ প্রকল্পটি অনুমোদন পায়নি। প্রধানমন্ত্রী প্রকল্পটিতে দীর্ঘসূত্রতা এবং ব্যয় অযৌক্তিকভাবে বাড়ানোর অভিযোগ ওঠায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং এটি অনুমোদন না দিয়ে ফেরত পাঠান। এছাড়া তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেন।
আরও পড়ুন
৩ বছরেও সংযোগ সড়ক পায়নি ১৫ কোটি টাকার মডেল মসজিদ
এদিকে এ বিষয়ে খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী প্রকৌশলী (পূর্ত) ও শিপইয়ার্ড সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক মো. আরমান হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি এবং তার মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।
আরিফুর রহমান/এফএ/এএসএম








