বগুড়ার মোকামতলায় সোহেল রানা ও শফিকুল ইসলাম দিনমজুরি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। পরিবারে অভাব অনটন লেগেই থাকত। এ সুযোগে এক দালাল তাদের উচ্চ বেতনে মালয়েশিয়া পাঠানোর প্রলোভন দেন। ধারদেনা করে জনপ্রতি সাড়ে ৬ লাখ টাকা দিয়ে তারা দুজন ২০২৩ সালে মালয়েশিয়া গিয়েছিলেন। সেখানে গিয়ে জানতে পারেন, তাদের মানব পাচারকারী চক্রের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। আটকে রেখে টাকা আদায়ের জন্য দুজনকে অর্ধাহার ও অনাহারে রাখা হয়। শেষে বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তায় দেশে ফেরেন। একজনের স্ত্রী তার অসুস্থ আত্মীয়ের কাছে কিডনি বিক্রি করে কিছু ঋণ পরিশোধ করেছেন। অপরজনের স্ত্রীও বিক্রির চেষ্টা করছেন।

এতেও দুর্ভোগের শেষ হয়নি মোকামতলা উপজেলা সদরের মেঘা গ্রামের সোহেল রানা (৪০) ও শফিকুল ইসলামের (৪২)। ঋণের টাকার জন্য পাওনাদারের তাগাদায় অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন তারা। যে দালালের মাধ্যমে মালয়েশিয়া গিয়েছিলেন, তিনিও টালবাহানা শুরু করেছেন। বাধ্য হয়ে শফিকুলের স্ত্রী এক অসুস্থ আত্মীয়ের কাছে ৩ লাখ টাকায় নিজের কিডনি বিক্রি করেছেন। সেই টাকায় কিছু ঋণ শোধ হয়েছে। ভুক্তভোগীরা দালালের কাছ থেকে তাদের টাকা উদ্ধারের দাবি জানিয়েছেন।

ভুক্তভোগী সোহেল রানা জানান, তারা দুজন দিনমজুরি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। সংসারে অভাব থাকলেও ঋণ ছিল না। তারা নবগঠিত মোকামতলা উপজেলার ময়দানহাট্টা ইউনিয়নের কোরশা গ্রামের দালাল সেকেন্দার আলীর প্রলোভনে পড়েন। তারা দুজন মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য ২০২১ সালে পাসপোর্ট জমা দেন। সেকেন্দার আলী তাদের আশ্বাস দেন, পামবাগানে চাকরি হবে এবং মাসে ৫০ হাজার টাকা বেতন পাবেন। তিন মাসের মধ্যে মালয়েশিয়া নিয়ে যাবেন। এজন্য জনপ্রতি ২ লাখ ৬০ হাজার টাকা করে খরচ হবে। এত কম খরচে উচ্চ বেতনের চাকরির আশায় দুজনই ধারদেনা করে টাকা দেন।

সোহেল রানা আরও জানান, তিন মাস পরে সেকেন্দার তাদের কাছে আরও ১ লাখ টাকা করে বেশি দাবি করেন। এভাবে দুবছর ঘোরানোর পর চারদফা মেডিকেল করে। এরপর জনপ্রতি সাড়ে ৬ লাখ টাকা করে নিয়ে ২০২৩ সালের ২৯ আগস্ট মালয়েশিয়া পাঠানো হয় তাদের। সেখানে যাওয়ার পরই কয়েক ব্যক্তি তাদের নির্জন জায়গায় নিয়ে আটকে রাখে। নামমাত্র খাবার দেওয়া হতো। ছয় মাস পর এক ব্যক্তির সহায়তায় বাংলাদেশ দূতাবাসে যোগাযোগ করেন। দূতাবাসের কর্মকর্তারা দুজনকে উদ্ধার করেন। কিন্তু কাজের অনুমতি না পাওয়ায় তাদের দেশে পাঠিয়ে দেন।

এদিকে পাওনাদারদের চাপে শফিকুলের স্ত্রী জাহিনা খাতুন ৩ লাখ টাকায় একটি কিডনি বিক্রি করে কিছু দেনা শোধ করেন। তিনি এখন শরীরের নানা সমস্যায় ভুগছেন। স্বামীর ঋণ শোধের জন্য একটি কিডনি বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সোহেল রানার স্ত্রী পারুল খাতুনও।

এ প্রসঙ্গে অভিযুক্ত সেকেন্দার আলী মোবাইল ফোনে ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, টাকা ফেরত দিতে চেয়েছেন। এখন কাছে টাকা নেই। টাকা হলে ফেরত দেওয়া হবে। ময়দানহাট্টা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মাহাবুব আলম মানিক বলেন, তার কাছেও ভুক্তভোগী দুজনের পরিবার অভিযোগ করেছেন। তিনি চেষ্টা করছেন তাদের টাকা তুলে দেওয়ার।