মিজানুর রহমান, জার্মানি
পুরো বিশ্বে জার্মানদের পরিচয় শুধু তাদের তৈরি করা হাই-টেক গাড়ি বা শক্তিশালী ইন্ডাস্ট্রির জন্য নয়, বরং তাদের নিখুঁত ও জাদুকরী সঞ্চয়ের অভ্যাসের জন্যও। গড়ে প্রতি ১০ জন জার্মানের মধ্যে সাতজনই প্রতি মাসে তাদের বেতনের একটি বড় অংশ ভবিষ্যতের জন্য জমিয়ে রাখেন।
অনেকে ভাবতে পারেন তারা হয়তো কিপটেমি করে, কিন্তু আসলে তা নয়। তারা অত্যন্ত স্মার্ট, বাস্তববাদী এবং সুশৃঙ্খল উপায়ে টাকা সেভ করে। বিশেষ করে আমরা যারা প্রবাসী, আমাদের জন্য তাদের এই জীবনধারা থেকে অনেক কিছু শেখার আছে। চলুন দেখে নেওয়া যাক জার্মানদের জীবন থেকে সেরা ৫টি সঞ্চয় কৌশল, যা আমাদের প্রবাস জীবনকেও আরও সুরক্ষিত করতে পারে।
১. দেখনদারি বর্জন ও ডিসকাউন্ট সুপারমার্কেটের স্মার্ট ব্যবহার
জার্মানরা তাদের সামাজিক মর্যাদা বা স্ট্যাটাস দেখানোর জন্য কখনো নামি-দামি প্রিমিয়াম শপ থেকে চড়া দামে কেনাকাটা করে না। জার্মানি হলো পুরো বিশ্বের ডিসকাউন্ট সুপারমার্কেটের জন্মদাতা। তারা তাদের নিত্যদিনের বাজারের জন্য চোখ বন্ধ করে লিডল, আলডি, পেনি অথবা নেটোর মতো সাশ্রয়ী দোকানে যায়।
একই মানের পণ্য এই শপগুলোতে অন্য জায়গার চেয়ে শতকরা ৩০ থেকে ৪০ ভাগ কমে পাওয়া যায়। সবচেয়ে বড় কথা, তারা সবসময় কেনাকাটার আগে একটি নির্দিষ্ট বাজারের তালিকা তৈরি করে এবং তার বাইরে একটি চকলেটও বাড়তি কেনে না। আমাদের প্রবাস জীবনেও এই হিসাব মেনে চললে মাসের একটা বড় অংশ বাঁচানো সম্ভব।
২. ফালতু সাবস্ক্রিপশন বাতিল করার কঠোর মানসিকতা
আমাদের অনেকেরই একটা অভ্যাস আছে- প্রয়োজন না থাকলেও বিভিন্ন অ্যাপ, বিনোদন প্ল্যাটফর্ম বা জিমের মেম্বারশিপ মাসের পর মাস ঝুলিয়ে রাখি। কিন্তু জার্মানদের ডিকশনারিতে এমন অভ্যাসের কোনো জায়গা নেই। জার্মানিতে একটি শক্তিশালী আইন ও সংস্কৃতি আছে, যার নাম ‘কুন্ডীগুং’ বা বাতিলকরণ। তারা প্রতি তিন বা ছয় মাস পর পর তাদের সমস্ত ব্যাংক স্টেটমেন্ট পরীক্ষা করে এবং যে সেবাটি তাদের কোনো কাজে লাগছে না, তা সাথে সাথে অফিশিয়ালি নোটিশ দিয়ে বাতিল করে দেয়। অপ্রয়োজনীয় খরচের ছোট ছোট ছিদ্রগুলো বন্ধ করার এই মানসিকতা আমাদেরও তৈরি করা উচিত।
৩. বিলাসবহুল গাড়ি নয়, গণপরিবহনেই ভরসা
জার্মানিতে বিশ্বখ্যাত সব গাড়ি যেমন—বিএমডব্লিউ বা মার্সিডিজ তৈরি হলেও, সাধারণ জার্মানরা প্রতিদিনের যাতায়াতে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করাকে এক ধরনের অপচয় মনে করে। জার্মানির গণপরিবহন ব্যবস্থা অত্যন্ত শক্তিশালী। তারা সামান্য খরচে পুরো মাস বাস ও ট্রেনে যাতায়াত করে। এতে তাদের প্রতি মাসে গাড়ির জ্বালানি, পার্কিং ফি এবং চড়া ইন্স্যুরেন্সের পেছনে শত শত ইউরো বেঁচে যায়। আর ছুটির দিনে বা জরুরি প্রয়োজনে তারা গাড়ি না কিনে কার-শেয়ারিং অ্যাপ থেকে সামান্য খরচে গাড়ি ভাড়া করে কাজ চালিয়ে নেয়।
৪. বেতনের একটি অংশ শুরুতেই উধাও করার নিয়ম
জার্মানরা মাস শেষে খরচ করার পর যা অবশিষ্ট থাকে তা জমায় না; বরং তারা বেতন পাওয়ার প্রথম দিনই সঞ্চয়ের টাকা আলাদা করে ফেলে। জার্মান ব্যাংকগুলোতে একটি চমৎকার পদ্ধতি আছে, যাকে বলা হয় ‘ডাওয়ারআউফট্রাগ’ বা স্থায়ী নির্দেশ। প্রতি মাসের শুরুতে বেতন অ্যাকাউন্টে ঢোকার সাথে সাথে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেতনের ১০ থেকে ২০ শতাংশ টাকা কেটে একটি আলাদা সঞ্চয়ী অ্যাকাউন্ট বা ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডে চলে যায়। বাকি টাকা দিয়ে তারা সারা মাসের বাজেট তৈরি করে। ফলে হাতখরচ বেশি হয়ে সঞ্চয় কমে যাওয়ার কোনো সুযোগই থাকে না। এটি প্রবাসীদের জন্য অত্যন্ত কার্যকরী একটি মডেল হতে পারে।
৫. বোতল রিসাইক্লিং এবং সেকেন্ড-হ্যান্ড শপিংয়ের সংস্কৃতি
পরিবেশ বাঁচানোর পাশাপাশি টাকা জমানোর এক দারুণ সমন্বয় হলো জার্মানির রিসাইক্লিং ব্যবস্থা। জার্মানিতে যে কোনো প্লাস্টিক বা কাঁচের বোতল কিনলে কিছু টাকা বাড়তি দিতে হয়। জার্মানরা ভুলেও এই বোতল ডাস্টবিনে ফেলে না। তারা ঘরের কোণায় বোতল জমিয়ে রেখে মাস শেষে সুপারমার্কেটের মেশিনে ফেরত দিয়ে রিফান্ড ভাউচার নেয়, যা দিয়ে পরের মাসের বাজারের খরচ অনেকটাই কমে যায়। এছাড়া নতুন আসবাবপত্র বা ইলেকট্রনিক্স না কিনে তারা বিভিন্ন অ্যাপ থেকে অর্ধেক দামে একদম ফ্রেশ সেকেন্ড-হ্যান্ড জিনিস কিনতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।
জার্মানদের কাছ থেকে শেখার মতো সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো- ‘আর্থিক শৃঙ্খলা’। তারা মনে করে, আয়ের চেয়ে কম খরচ করে বেঁচে থাকা কোনো লজ্জার বিষয় নয়, বরং এটি একটি অত্যন্ত বুদ্ধিমান এবং স্বাধীন মানুষের লক্ষণ। এই সঞ্চয় সংস্কৃতিই জার্মানির প্রতিটি নাগরিককে যে কোনো অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যেও মানসিকভাবে সুরক্ষিত ও দুশ্চিন্তামুক্ত রাখে। প্রবাস জীবনে আয়ের পাশাপাশি এই ধরনের শৃঙ্খলা ধরে রাখতে পারলে যে কোনো সংকটে বুক ফুলিয়ে বাঁচা সম্ভব।
এমআরএম








