চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে ১৩ বছরের এক মাদ্রাসাছাত্রীকে অপহরণ করে ১৩ দিন আটকে রেখে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে এক মাদ্রাসাশিক্ষকের বিরুদ্ধে। তবে পুলিশের প্রতিবেদনে বিষয়টি ধর্ষণচেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করায় কিশোরীর পরিবার এর বিরুদ্ধে নারাজী আবেদন করেছেন। আগামী মাসে এ বিষয়ে শুনানির দিন ধার্য করেছেন আদালত।

এদিকে কিশোরীকে উদ্ধার করা হলেও পরিবারটি নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

কিশোরীর পরিবার জানায়, চলতি বছরের ২ জুন মাদ্রাসায় যাওয়ার পথে শিক্ষক সালাউদ্দিন তাকে অপহরণ করেন। পরে বিভিন্ন স্থানে নিয়ে ১৩ দিন আটকে রেখে তাকে একাধিকবার ধর্ষণ করা হয়। পুলিশ খবর পেয়ে কিশোরীকে উদ্ধার করে। পরে স্থানীয় জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে তাকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

পরিবারের দাবি, উদ্ধারের পর মেয়েটির শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন ছিল। চিকিৎসা ও মেডিকেল পরীক্ষার জন্য তাকে হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রে পুলিশের কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। ধর্ষণের আলামত নষ্ট করার উদ্দেশ্যে পুলিশ ইচ্ছাকৃতভাবে মামলা নিতে গড়িমসি করেছে। আসামিপক্ষের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযুক্তদের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগও তুলেছে ভুক্তভোগী পরিবার।

ভুক্তভোগীর মা বলেন, মেয়েকে উদ্ধারের পর আদালতের আশ্রয় নিলে সালাউদ্দিনের পক্ষ থেকে তাঁদের হুমকি দেওয়া হয় ও হামলা চালানো হয়। নিরাপত্তার কারণে একপর্যায়ে বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নেন তাঁরা। পরিবারের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা চাওয়া হলেও পুলিশ কার্যকর সহযোগিতা করেনি বলেও অভিযোগ তাঁর।

পরিবারের দাবি, হলফনামার মাধ্যমে কিশোরীর প্রকৃত বয়স গোপন করে বিয়ের পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করা হয়। তবে হলফনামা করা হলেও বিয়েটি নিবন্ধিত হয়নি।

কিশোরীর পরিবারের আইনজীবী মিতা বালা পাল বলেন, ‘আইন অনুযায়ী ১৮ বছরের আগে কোনো মেয়ের বিয়ে নিবন্ধনের সুযোগ নেই। এ ক্ষেত্রে যে হলফনামার কথা বলা হচ্ছে, সেটি কোনো বৈধ বিবাহের বিকল্প নয়। আসামি ধর্ষণের অভিযোগ থেকে বাঁচতে মেয়েটির বয়স বাড়িয়ে বিয়ের নাটক সাজিয়েছে।’

আদালতের নির্দেশে তদন্ত শেষে পুলিশ যে প্রতিবেদন দিয়েছে, তাতে ধর্ষণের অভিযোগের পরিবর্তে ঘটনাটিকে ধর্ষণচেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন কিশোরীর পরিবারের আইনজীবী।

মিতা বালা পাল বলেন, ‘মেয়েটিকে ধর্ষণের অভিযোগ করা হলেও তদন্ত প্রতিবেদনে ঘটনাটি ধর্ষণচেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে প্রকৃত ঘটনা আড়াল করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। আমরা প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি দিয়েছি। আদালতের কাছে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের আবেদন জানানো হয়েছে।’

এদিকে অভিযোগের পর সালাউদ্দিনকে মাদ্রাসা থেকে স্থায়ীভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তাহফিজুল কুরআন নূরানী ইসলামি কিন্ডারগার্টেন হিফজ মাদ্রাসার সুপার মো. আলী আকবর।

মো. আলী আকবর বলেন, ‘অভিযোগের বিষয়টি জানার পর প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সালাউদ্দিনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং তাঁকে স্থায়ীভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে।’

সালাউদ্দিনের বক্তব্য জানতে তাঁর বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে এবং মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তাঁকে পাওয়া যায়নি। তাঁর ব্যবহৃত মুঠোফোনটিও বন্ধ পাওয়া গেছে।

শিবগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মতিউর রহমান বলেন, ‘আইন ও বিধি মেনেই তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। আদালত চাইলে নতুন করে তদন্ত করতেও পুলিশ প্রস্তুত রয়েছে।’

থানায় মামলা বা সাধারণ ডায়েরি করতে গিয়ে কিশোরীর মাকে তাড়িয়ে দেওয়া এবং মেয়েকে সালাউদ্দিনের কাছে ফিরিয়ে দিতে চাপ দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।

মতিউর রহমান বলেন, ‘এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটে থাকলে নির্দিষ্টভাবে জানালে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। পরিবার নিরাপত্তা চাইলে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’