কারও কোলে শিশু, কারও সঙ্গে গবাদিপশু। বন্যার পানি মাড়িয়ে সবাই ছুটছেন নিরাপদ আশ্রয়ের আশায়। গতকাল শুক্রবার বিকেলে এমন চিত্র দেখা যায় চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার আসহাব উদ্দিন সড়ক হয়ে মোশাররফ আলী পর্যন্ত প্রায় আট কিলোমিটার এলাকাজুড়ে।

ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে কয়েক দিন ধরে পানিবন্দী বাঁশখালী উপজেলার অনেক এলাকা। গতকাল বিকেলে সরেজমিন বাহারছড়া ইউনিয়ন ঘুরে দেখা যায়, এলাকায় কোথাও কোমর, কোথাও হাঁটুপানি। পরিবার–পরিজন ও গবাদিপশু নিয়ে এখনো মানুষ নিরাপদ আশ্রয় খুঁজছেন।

বাহারছড়া ইউনিয়নের একটি সড়কে কথা হয় গৃহবধূ ইসমত আরার সঙ্গে। আট বছর বয়সী ছেলে মোহাম্মদ তামিমকে নিয়ে সাত কিলোমিটার দূরের গুনাগুরি এলাকায় এক স্বজনের বাড়িতে যাচ্ছিলেন। ইসমত আরা জানান, তাঁর ঘরে কোমরসমান পানি। তাই সন্তানকে নিয়ে গুনাগরিতে এক স্বজনের বাসায় চলে যাচ্ছেন।

ইসমত আরা আরও বলেন, ‘আমার শাশুড়ি বৃদ্ধ। তাই আমার স্বামী আগেই তাঁকে গুনাগরিতে নিয়ে গেছেন। এখন ঘরে পানি বাড়ার কারণে রান্না ও পানীয় নিয়ে সমস্যা দেখা দেওয়ায় আমিও ছেলেকে নিয়ে সেখানে যাচ্ছি।’

স্থানীয় লোকজন জানান, বাঁশখালীর কিছু ইউনিয়নে পাহাড়ি ঢলের পানি কমেছে। তবে উপকূলের কাছে থাকা ইউনিয়নগুলোয় বন্যার পানি নামছে না। তাই বাসিন্দাদের বেশির ভাগই এরই মধ্যে পরিবার-পরিজন নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্র কিংবা স্বজনদের বাসাবাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। তবে ঘরের মালামাল নিয়ে উৎকণ্ঠা থেকে পুরুষ সদস্যদের অনেকেই বাড়িতে অবস্থান করছেন। বাসিন্দাদের দাবি, আশ্রয়কেন্দ্র থেকে পর্যাপ্ত ত্রাণ মিলছে না। অনেকেই শুকনা খাবার ও সুপেয় পানির সংকটে রয়েছেন।

গত শুক্রবার বাহারছড়া ইউনিয়নে বন্যার পানিতে ডুবে দুই শিশুসহ তিনজনের মৃত্যু হয়। সমুদ্র উপকূলবর্তী এই ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা হেলাল উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের বাড়ির এক শিশু গতকাল পানিতে ডুবে মারা গেছে। তাকে কবর দেওয়ার জন্য শুকনা জায়গা খুঁজে পেতেও অনেক সমস্যা হয়েছে। পরে কিছুটা উঁচু এলাকায় অবস্থিত একটি পুকুরের পাড়ে তাকে দাফনের ব্যবস্থা করা হয়।

বন্যার পানিতে ডুবে রয়েছে সড়ক। গতকাল বিকেলে চট্টগ্রামের বাঁশখালীর বাহারছড়া উপজেলায়

স্থানীয় বাসিন্দা মো. রবিউল হোসেন বলেন, তিনি স্ত্রী ও একমাত্র সন্তানকে নিরাপদ আশ্রয়ে রেখে এসেছেন। কিন্তু তাঁর ৮০ বছর বয়সী বাবাকে ঘর থেকে বের করা সম্ভব হচ্ছে না। বাবাকে নিয়ে ঘরেই রয়েছেন তিনি। প্রতিটি মুহূর্ত উৎকণ্ঠায় কাটছে।

গতকাল বিকেলে পূর্ব ইলশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে রয়েছে ৯টি পরিবার। এর একটি মছুদা খাতুনেরও (৭০)। তিনি জানান, গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন তাঁরা। তবে কেউ তাঁদের খবর নেয়নি। সুপেয় পানির সংকটে রয়েছেন তাঁরা। পানি কিনতে গেলে অন্তত পাঁচ কিলোমিটার দূরে যেতে হবে। আশ্রয়কেন্দ্র থাকা এলাকার বাসিন্দা নুরল আলম বলেন, ‘খাওয়ার পানি শেষ। আবার বৃষ্টি হলে বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করতে হবে। আর কোনো উপায় নেই।’

স্থানীয় মসজিদের ইমাম মোহাম্মদ দিদারের পরিবার আশ্রয় নিয়েছে চাপাছড়ি মজিদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে। মোহাম্মদ দিদার বলেন, ‘এলাকায় এত বেশি পানি যে মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করাও সম্ভব হয়নি। আশ্রয়কেন্দ্রের নিচেও দুই থেকে তিন ফুট পানি। একটি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের সদস্যরা এসে আমাদের শুকনা খাবার দিয়ে গেছেন। তা খেয়েই আছি।’

বাহারছড়া ইউনিয়নের লাবুর দোকান এলাকায় কথা হয় জয় জলদাশের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমাদের বাড়ির ১৪টি পরিবার আশপাশের বিভিন্ন জায়গায় আশ্রয় নিয়েছে। শুকনা খাবার কিনলেও সুপেয় পানির অভাবে কষ্ট পাচ্ছি।’ একই এলাকার সোনা দাশ বলেন, ঘর ডুবে যাওয়ায় একটি দোকানে আশ্রয় নিয়েছেন তিনি।

জানতে চাইলে বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রুহুল আমিন বলেন, ‘আমরা সব জায়গায় মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ের পাশাপাশি ত্রাণের আওতায় আনার চেষ্টা করছি। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৪৪ টন চাল ও আড়াই হাজার পরিবারে শুকনা খাবার বিতরণ করেছি। এখন থেকে সেনাবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে ত্রাণ ও উদ্ধার তৎপরতা চালানো হবে।’