বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে দীর্ঘদিনের বাস্তবতা হলো, দেশের জন্য পদক জয় করা অনেক ক্রীড়াবিদ ক্যারিয়ারের শেষভাগে আর্থিক অনিশ্চয়তা, চিকিৎসা সংকট এবং সামাজিক নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। সেই বাস্তবতায় যুগান্তকারী উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় জাতীয় ক্রীড়া উন্নয়ন তহবিল নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। যার লক্ষ্য ক্রীড়াকে একটি মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই পেশা হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা। সেই সঙ্গে জাতীয় ক্রীড়াবিদদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণ নিশ্চিত করাও এর লক্ষ্য। নীতিমালায় প্রথমবারের মতো ‘জাতীয় ক্রীড়া উন্নয়ন তহবিল’ গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এই তহবিল থেকে ক্রীড়াবিদদের উন্নয়ন, প্রণোদনা, জরুরি আর্থিক সহায়তা এবং কল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালিত হবে। তহবিলের অর্থ আসবে সরকারি অনুদান, বাংলাদেশ ব্যাংকের সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের বাজেটের একটি নির্ধারিত অংশ, জাতীয় দলের স্পন্সরশিপ ও সম্প্রচার স্বত্বের আয়, দেশি-বিদেশি অনুদান এবং বিভিন্ন বিনিয়োগের মুনাফা থেকে।

নীতিমালায় ক্রীড়াবিদ নির্বাচনেও আনা হয়েছে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক কাঠামো। সংশ্লিষ্ট জাতীয় ক্রীড়া সংস্থার সুপারিশের ভিত্তিতে প্রাথমিক তালিকা তৈরি হবে। ক্রীড়াবিদ যাচাই কমিটি ও ক্রীড়াবিদ যাচাই জাতীয় কমিটির পর্যায়ক্রমিক যাচাই শেষে সরকার চূড়ান্ত অনুমোদন দেবে। অনুমোদিত ক্রীড়াবিদদের নাম সরকারি গেজেটে প্রকাশ করা হবে। জাতীয় ক্রীড়াবিদদের পারফরম্যান্স, ফিটনেস ও শৃঙ্খলা প্রতি তিন মাস পরপর মূল্যায়ন করা হবে। এই মূল্যায়নের ভিত্তিতে কোনো ক্রীড়াবিদের অবস্থান উন্নীত, বহাল কিংবা প্রয়োজনে তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার সুপারিশ করা যাবে। ফলে জাতীয় দলের জায়গা ধরে রাখতে পারফরম্যান্সই হবে প্রধান মানদণ্ড।

নীতিমালায় তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে। এগুলো হলো, ক্রীড়াবিদ যাচাই জাতীয় কমিটি, ক্রীড়াবিদ যাচাই কমিটি এবং কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন কমিটি। এসব কমিটিতে থাকবেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ, সংশ্লিষ্ট ফেডারেশন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সাবেক ক্রীড়াবিদ, কোচ এবং ক্রীড়া চিকিৎসকরা। এর মাধ্যমে ক্রীড়াবিদ বাছাই ও মূল্যায়নে বহুমাত্রিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।

নীতিমালায় শুধু বর্তমান ক্রীড়াবিদদের নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতিও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ১২ থেকে ২৪ বছর বয়সি প্রতিভাবান ক্রীড়াবিদ গড়ে তুলতে স্কুল পর্যায়ে ‘নতুন কুঁড়ি’ কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিকমানের প্রশিক্ষণ, আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণ, ক্রীড়া বিজ্ঞানভিত্তিক মূল্যায়ন এবং প্রতিভা বিকাশের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া নারী, প্রতিবন্ধী এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রতিভাবান ক্রীড়াবিদদের জন্য বিশেষ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত, আহত, অসুস্থ কিংবা অসহায় ক্রীড়াবিদদের চিকিৎসা, বিমা এবং সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টিও নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক বলেন, ‘নীতিমালাটি যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশে ক্রীড়াবিদদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি ক্রীড়াকে একটি আকর্ষণীয় পেশা হিসাবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে পারফরম্যান্সভিত্তিক মূল্যায়ন এবং স্থায়ী কল্যাণ তহবিল দেশের ক্রীড়াঙ্গনে নতুন সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।’