সম্প্রতি একটি কৃষি খামারে গিয়েছিলাম। মাঠে সবুজ ফসল আছে, সেচও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কোন অংশে মাটির আর্দ্রতা বেশি, কোন অংশে কম; কোথাও আবার পানি দেওয়ার দরকার, তা নির্ধারণ করা হচ্ছে অভিজ্ঞতা ও অনুমানের ভিত্তিতে। খামারের পাশে এক কৃষক বললেন, ‘আবহাওয়া আগের মতো নেই। কখন বেশি বৃষ্টি হবে, কখন রোদে ফসল পুড়ে যাবে, বোঝা কঠিন হয়ে গেছে।’ তাঁর কথায় উদ্বেগ ছিল, কিন্তু সেই উদ্বেগের পেছনে ছিল বাস্তব অভিজ্ঞতা।

বাংলাদেশের অনেক কৃষকের বাস্তবতা প্রায় এমনই। তাঁরা পরিশ্রম করেন, জমি বোঝেন, মৌসুম বোঝেন, ফসলের অবস্থা চোখে দেখে সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, শ্রমিকসংকট, সেচের চাপ, পোকামাকড়ের আক্রমণ ও বাজারের অনিশ্চয়তা কৃষিকে আগের চেয়ে অনেক বেশি জটিল করে তুলেছে। এই বাস্তবতায় শুধু অভিজ্ঞতা নয়, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্তও জরুরি হয়ে উঠছে। এখানেই স্মার্ট কৃষির প্রয়োজনীয়তা।

স্মার্ট কৃষি বলতে এমন কৃষি ব্যবস্থাকে বোঝায়, যেখানে সেন্সর, মুঠোফোন অ্যাপ, আবহাওয়ার তথ্য, স্যাটেলাইট ডেটা, ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইন্টারনেট অব থিংস এবং ডেটা বা উপাত্দক বিশ্লেষণ ব্যবহার করে কৃষিকাজকে আরও কার্যকর করা হয়। সহজভাবে বললে, জমি ও ফসলের অবস্থা সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করে সেই তথ্যের ভিত্তিতে সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়াই স্মার্ট কৃষির মূল উদ্দেশ্য।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কৃষি এখন ধীরে ধীরে তথ্যনির্ভর হয়ে উঠছে। মাটির আর্দ্রতা মাপার সেন্সর জানিয়ে দিচ্ছে, কখন সেচ দেওয়া দরকার। আবহাওয়ার পূর্বাভাস কৃষককে আগেই সতর্ক করছে। ড্রোন ও স্যাটেলাইট ছবি ব্যবহার করে ফসলের স্বাস্থ্য, পুষ্টির ঘাটতি বা পোকামাকড়ের ঝুঁকি বোঝা যাচ্ছে। কোথাও আবার মুঠোফোন অ্যাপ কৃষককে জানাচ্ছে কোন জমিতে কতটুকু সার লাগবে, কখন পানি দিতে হবে, কিংবা কোন বাজারে ফসলের ভালো দাম পাওয়া যেতে পারে।

নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, জাপান ও চীনের মতো দেশে স্মার্ট কৃষির নানা ধরনের ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। উন্নত দেশগুলোয় বড় খামার ও কৃষিজমিতে সেন্সর, স্বয়ংক্রিয় সেচ, জিপিএসনির্ভর যন্ত্র, ড্রোন এবং ডেটা অ্যানালিটিকস ব্যবহার করে উৎপাদন ব্যয় কমানো ও ফলন বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। ভারতে সাম্প্রতিক সময়ে সেন্সরভিত্তিক সেচ, আবহাওয়া তথ্য, মাটির স্বাস্থ্য তথ্য এবং কৃষক সহায়ক মুঠোফোন অ্যাপের ব্যবহার বাড়ছে। এসব উদাহরণ দেখায়, স্মার্ট কৃষি শুধু প্রযুক্তিবিদদের বিষয় নয়, এটি কৃষকের দৈনন্দিন সিদ্ধান্তকে সহজ করার একটি বাস্তব উপায়।

তবে প্রযুক্তির ব্যবহার মানেই কৃষককে জটিল যন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল করে তোলা নয়; বরং প্রযুক্তির কাজ হওয়া উচিত কৃষকের অভিজ্ঞতাকে শক্তিশালী করা। একজন কৃষক জমির রং, পাতার অবস্থা বা বাতাসের পরিবর্তন দেখে অনেক কিছু বুঝতে পারেন। কিন্তু সেন্সর, আবহাওয়া তথ্য ও ডিজিটাল রেকর্ড সেই বোঝাপড়াকে আরও নির্ভুল করতে পারে। যেমন কৃষক চোখে দেখে বুঝতে পারেন জমি শুকিয়ে গেছে। কিন্তু মাটির আর্দ্রতা সেন্সর বলতে পারে ঠিক কতটুকু পানি দরকার। এতে পানি অপচয় কমে, বিদ্যুৎ বা জ্বালানি খরচ কমে এবং ফসলের ক্ষতির ঝুঁকিও কমে।

বাংলাদেশের কৃষিতে স্মার্ট প্রযুক্তির প্রয়োজন আরও বেশি। কারণ, এ দেশের কৃষি জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাবের মুখোমুখি। কোথাও অতি বৃষ্টি, কোথাও খরা, কোথাও নদীভাঙন, কোথাও লবণাক্ততা, আবার কোথাও অনিয়মিত তাপমাত্রা ফসলের উৎপাদনকে অনিশ্চিত করছে। একই সঙ্গে কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়ছে। সার, বীজ, কীটনাশক, শ্রম ও সেচের খরচ হিসাব করে অনেক কৃষকই লাভ নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকেন। এই পরিস্থিতিতে প্রযুক্তি যদি সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায়, তবে তা কৃষকের খরচ কমাতে, উৎপাদন পরিকল্পনা উন্নত করতে এবং বাজারসংযোগ বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।

কিন্তু বাংলাদেশের কৃষক কি এই প্রযুক্তির জন্য প্রস্তুত?

এই প্রশ্নের উত্তর একদিকে আশাব্যঞ্জক, অন্যদিকে সতর্কতামূলক। আশাব্যঞ্জক দিক হলো, গ্রামাঞ্চলেও মুঠোফোনের ব্যবহার অনেক বেড়েছে। তরুণ কৃষক ও উদ্যোক্তারা ইউটিউব, ফেসবুক গ্রুপ, কৃষি অ্যাপ এবং অনলাইন বাজার থেকে তথ্য নিচ্ছেন। অনেক কৃষক এখন আবহাওয়া, রোগবালাই, বীজ, সার বা বাজারদর সম্পর্কে অনলাইনে জানতে চান। অর্থাৎ প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

কিন্তু আগ্রহ থাকা আর কার্যকর ব্যবহার করতে পারা এক বিষয় নয়। স্মার্ট কৃষির পথে বাংলাদেশের সামনে কয়েকটি বড় বাধা আছে। প্রথমত, খরচ। সেন্সর, ড্রোন, স্বয়ংক্রিয় সেচযন্ত্র বা ডেটাভিত্তিক সেবা ছোট কৃষকের কাছে ব্যয়বহুল মনে হতে পারে। দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল দক্ষতার ঘাটতি। স্মার্টফোন ব্যবহার করলেই যে কৃষক সহজে অ্যাপের তথ্য বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন, তা নয়। তৃতীয়ত, গ্রামীণ ইন্টারনেট, বিদ্যুৎ, যন্ত্রের রক্ষণাবেক্ষণ এবং স্থানীয় কারিগরি সহায়তার সীমাবদ্ধতা আছে। চতুর্থত, বাংলা ভাষায় সহজ, নির্ভরযোগ্য ও স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে মিল থাকা ডিজিটাল কৃষিসেবা এখনো পর্যাপ্ত নয়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো আস্থা। অনেক কৃষক দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করেন। নতুন প্রযুক্তি যদি সরাসরি তাঁদের সমস্যা কমাতে না পারে, তাহলে তাঁরা সেটি গ্রহণে আগ্রহী হবেন না। তাই প্রযুক্তি শুধু প্রদর্শনের বিষয় হলে চলবে না। মাঠপর্যায়ে ব্যবহারযোগ্য হতে হবে, সাশ্রয়ী হতে হবে এবং কৃষকের ভাষায় কথা বলতে হবে।

বাংলাদেশে প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি গড়তে হলে কয়েকটি বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। প্রথমত, কৃষকের জন্য সহজ ডিজিটাল রেকর্ড–ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। জমির পরিমাণ, ফসলের ধরন, বীজের নাম, সার ব্যবহারের পরিমাণ, সেচের সময়, রোগবালাই, উৎপাদন খরচ এবং বিক্রয় মূল্য নিয়মিতভাবে সংরক্ষণ করলে কৃষক নিজেই বুঝতে পারবেন কোন ফসলে লাভ বেশি, কোথায় খরচ বাড়ছে এবং কোন সিদ্ধান্ত বদলানো দরকার।

দ্বিতীয়ত, কম খরচের প্রযুক্তি দিয়ে শুরু করতে হবে। সব কৃষকের জন্য ড্রোন বা জটিল যন্ত্র কেনা সম্ভব নয়। কিন্তু মাটির আর্দ্রতা সেন্সর, আবহাওয়া সতর্কবার্তা, সেচের সময়সূচি, ডিজিটাল বাজারদর, রোগ শনাক্তকরণ নির্দেশিকা এবং মুঠোফোনভিত্তিক পরামর্শ সেবা তুলনামূলকভাবে সহজে চালু করা সম্ভব।

তৃতীয়ত, বাংলা ভাষায় কৃষকবান্ধব অ্যাপ ও সেবা দরকার। অ্যাপ যদি শুধু তথ্য দেখায়, কিন্তু কৃষক বুঝতে না পারেন কী করবেন, তাহলে সেটি কার্যকর হবে না। সেবাটি এমন হতে হবে, যেখানে সহজ ভাষায় বলা থাকবে, ‘আজ সেচ না দিলেও চলবে’, ‘এই জমিতে পানি কম’, ‘আগামী দুই দিনে বৃষ্টির সম্ভাবনা আছে’, ‘এই লক্ষণ দেখা গেলে কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নিন’, অথবা ‘এই বাজারে দাম তুলনামূলক বেশি।’

চতুর্থত, মাঠপর্যায়ে প্রশিক্ষণ বাড়াতে হবে। কৃষককে শুধু অ্যাপ ইনস্টল করে দেওয়া যথেষ্ট নয়। তাঁকে শেখাতে হবে কীভাবে তথ্য পড়বেন, কীভাবে সিদ্ধান্ত নেবেন, কীভাবে খরচ ও লাভ হিসাব করবেন, এবং কখন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেবেন। কৃষি সম্প্রসারণ কর্মী, স্থানীয় উদ্যোক্তা, বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান এখানে যৌথভাবে কাজ করতে পারে।

পঞ্চমত, স্থানীয় বাস্তবতা অনুযায়ী প্রযুক্তি তৈরি করতে হবে। বিদেশে যে প্রযুক্তি কাজ করছে, সেটি সরাসরি বাংলাদেশের মাঠে কাজ করবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বাংলাদেশের জমির আকার ছোট, কৃষকের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ভিন্ন, ভাষাগত চাহিদা আলাদা এবং ফসলের ধরন অঞ্চলভেদে পরিবর্তিত। তাই প্রযুক্তি হতে হবে স্থানীয় সমস্যা ও কৃষকের সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

ষষ্ঠত, ক্ষুদ্র কৃষকের জন্য অর্থায়ন ও নীতিসহায়তা দরকার। প্রযুক্তি যেন শুধু বড় কৃষি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। সহজ ঋণ, ভর্তুকি, সমবায়ভিত্তিক যন্ত্র ব্যবহার, ইউনিয়ন পর্যায়ে ডিজিটাল কৃষিসহায়তা কেন্দ্র এবং স্থানীয় পর্যায়ে যন্ত্র মেরামতের ব্যবস্থা থাকলে ছোট কৃষকেরাও ধীরে ধীরে প্রযুক্তির সুবিধা নিতে পারবেন।

সপ্তমত, তথ্যের নিরাপত্তা ও মালিকানা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষকের জমি, উৎপাদন, খরচ, বাজার ও ব্যক্তিগত তথ্য কীভাবে ব্যবহৃত হবে, তা পরিষ্কার হওয়া দরকার। কৃষকের তথ্য যেন তাঁর অনুমতি ছাড়া বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার না হয়। প্রযুক্তি কৃষককে ক্ষমতায়িত করবে, দুর্বল করবে না।

বাংলাদেশে স্মার্ট কৃষির সম্ভাবনা বড়, তবে এই পরিবর্তন একদিনে আসবে না। প্রথম ধাপ হতে পারে তথ্য সংগ্রহ, দ্বিতীয় ধাপ ডিজিটাল রেকর্ড, তৃতীয় ধাপ কম খরচের সেন্সর ও আবহাওয়া তথ্য, চতুর্থ ধাপ ডেটা বিশ্লেষণ, এবং পরবর্তী ধাপে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সিদ্ধান্ত সহায়তা। অর্থাৎ স্মার্ট কৃষি শুরু করতে বিশাল বিনিয়োগের দরকার নেই। দরকার ছোট, ব্যবহারযোগ্য ও কৃষককেন্দ্রিক সমাধান।

সেদিনের সেই কৃষকের কথাই আবার মনে পড়ে। তিনি বলেছিলেন, আগে আবহাওয়া বুঝে কাজ করা যেত, এখন অনেক কিছুই আন্দাজে করতে হয়। স্মার্ট প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় কাজ হতে পারে এই আন্দাজের জায়গাটি কমিয়ে আনা। কৃষককে সিদ্ধান্তহীনতা থেকে কিছুটা মুক্ত করা। কখন পানি দিতে হবে, কখন সার দিতে হবে, কখন সতর্ক হতে হবে, কোথায় খরচ কমানো যাবে, এবং কোথায় লাভ বাড়ানো সম্ভব, এসব বিষয়ে প্রযুক্তি সহায়ক হতে পারে।

কৃষির ভবিষ্যৎ শুধু মাটি, বীজ, পানি ও পরিশ্রমের ওপর নির্ভর করবে না। তথ্য, প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণও সেখানে বড় ভূমিকা রাখবে। তবে এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে প্রযুক্তি নয়, কৃষককেই রাখতে হবে। কারণ, স্মার্ট কৃষির আসল সাফল্য তখনই, যখন প্রযুক্তি কৃষকের ভাষায় কথা বলে, তাঁর সিদ্ধান্তকে সহজ করে, খরচ কমায়, আয় বাড়ায় এবং দেশের খাদ্যনিরাপত্তাকে আরও শক্তিশালী করে।

ফায়াজুন্নেসা চৌধুরী: ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষক এবং যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি অধ্যয়নরত