আধুনিক কোয়ান্টাম বলবিদ্যার অন্যতম পথিকৃৎ এবং ১৯১৮ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেলজয়ী জার্মান বিজ্ঞানী ম্যাক্স প্লাংকের ১৯৪০-এর দশকে লেখা দুটি ঐতিহাসিক গবেষণা প্রবন্ধ প্রত্যাহার করেছে বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক প্রকাশনা সংস্থা ‘স্প্রিংগার নেচার’ (Springer Nature)।
বিজ্ঞান ঐতিহাসিকদের দাবি, আধুনিক স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার বা অ্যালগরিদমের ভুলের কারণে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই ধরনের ভুল বৈজ্ঞানিক গবেষণার ইতিহাসকে বিকৃত করছে।
কানাডার কুইবেক বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইউকিউ) বিজ্ঞান ঐতিহাসিক ইভ গিংগ্রাস এবং মাহদি খেলফাউই এই ঘটনাটি আবিষ্কার করার পর বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞান মহলে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
বিজ্ঞানীদের নৈতিকতা ও গবেষণার মান বজায় রাখার পাশাপাশি ইতিহাসের সত্যতা রক্ষা করার ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তির অন্ধ ব্যবহার কতটুকু যৌক্তিক, তা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন।
চলতি বছরের মে মাসের শুরুতে কানাডার ইতিহাসবিদ ইভ গিংগ্রাস বৈজ্ঞানিক জালিয়াতি ও জালিয়াতি ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট ‘রিট্র্যাকশন ওয়াচ’ ব্রাউজ করার সময় একটি তালিকা দেখতে পান। তালিকাটির শিরোনাম ছিল—‘নোবেল বিজয়ীদের প্রত্যাহারকৃত প্রবন্ধসমূহ’।
সেখানে চতুর্থ নামটি দেখে চমকে ওঠেন গিংগ্রাস। তালিকায় জ্বলজ্বল করছিল বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী ম্যাক্স প্লাংকের নাম, যাঁর বৈজ্ঞানিক অবদান এবং ব্যক্তিগত সততা সর্বজনবিদিত। এমনকি ১৯৩৩ সালে নাৎসি জার্মানির ইহুদিবিদ্বেষী আইনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে স্বৈরশাসক অ্যাডলফ হিটলারের মুখোমুখি হওয়ার অসীম সাহস দেখিয়েছিলেন প্লাংক।
গিংগ্রাস ঘটনাটি খতিয়ে দেখতে তাঁর সহকর্মী মাহদি খেলফাউইকে যুক্ত করেন। তাঁরা জানতে পারেন, ১৯৪০-এর দশকের শুরুতে জার্মানির নামী বিজ্ঞান সাময়িকী ‘নাটুয়ারউইসেনশাফটেন’ (Naturwissenschaften)-এ প্রকাশিত প্লাংকের দুটি লেখা ২০১১ সালে নীরবে প্রত্যাহার করে নেয় এটির বর্তমান মালিক স্প্রিংগার নেচার।
১৯৪২ সালে প্রকাশিত প্লাংকের প্রথম প্রবন্ধটির শিরোনাম ছিল ‘সিন উন্ড গ্রেনজেন ডের এগজাক্টেন উইসেনশাফট’ (যথাযথ বিজ্ঞানের অর্থ ও সীমাবদ্ধতা)। বিজ্ঞান ঐতিহাসিক মাহদি খেলফাউই অনুসন্ধান করে দেখেন, এই লেখাটি সে সময় আরও দুটি সাময়িকী এবং দুটি বইয়ে পুনঃমুদ্রিত হয়েছিল।
আজকের যুগে একই লেখা একাধিক জার্নালে প্রকাশ করাকে ‘সেলফ-প্লেজারিজম’ বা আত্ম-চৌর্যবৃত্তি হিসেবে গণ্য করা হয় এবং এটিকে নেতিবাচকভাবে দেখা হয়। স্প্রিংগার নেচার তাদের ওয়েবসাইটে প্রত্যাহারের কারণ হিসেবে ‘কপিরাইট লঙ্ঘন’ উল্লেখ করেছে।
তবে ইতিহাসবিদদের মতে, ইন্টারনেট আবিষ্কারের আগে গত শতাব্দীতে এটি একটি অত্যন্ত সাধারণ ও স্বাভাবিক অনুশীলন ছিল। মাহদি খেলফাউই বলেন, ‘তখনকার বিজ্ঞান জগৎ আজকের মতো একসূত্রে গাঁথা ছিল না। বিজ্ঞানীরা চাইতেন তাঁদের গবেষণাকর্ম যেন ভিন্ন ভিন্ন পাঠকগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছায়।’ আলবার্ট আইনস্টাইনও তাঁর লেখা একাধিকবার ভিন্ন জায়গায় প্রকাশ করেছিলেন, কিন্তু তাঁর কোনো লেখা প্রত্যাহার করা হয়নি।
পাবলিক ডোমেইন আইন অনুযায়ী, ১৯৪৭ সালে প্লাংকের মৃত্যুর পর তাঁর সমস্ত কাজ ইতিমধ্যে সাধারণের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত হয়ে গেছে। ফলে ১৯৪২ সালের একটি লেখার ওপর আধুনিক যুগের নিয়ম চাপিয়ে দেওয়াকে ইতিহাসবিদরা ‘অ্যানাক্রোনিজম’ বা কালবৈষম্যমূলক ভুল সিদ্ধান্ত হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
১৯৪০ সালে প্রকাশিত প্লাংকের দ্বিতীয় প্রবন্ধটি প্রত্যাহারের ঘটনাটি আরও বেশি রহস্যময়। এটিও কপিরাইট লঙ্ঘনের অভিযোগে প্রত্যাহার করা হয়, যদিও এই লেখাটি অন্য কোথাও প্রকাশিতই হয়নি।
গবেষকদের ধারণা, এটি সম্পূর্ণ একটি স্বয়ংক্রিয় কম্পিউটার প্রোগ্রামের (বট) ভুলের ফসল। ১৯৪০ সালের নভেম্বরে দার্শনিক আলোইস মুলার ‘নাটুয়ারউইসেনশাফটেন’-এ প্লাংকের কোয়ান্টাম তত্ত্বের দৃষ্টিভঙ্গির সমালোচনা করে একটি প্রবন্ধ লেখেন, যার শিরোনাম ছিল ‘প্রকৃতি বিজ্ঞান ও বাস্তব বহির্বিশ্ব’। এক মাস পর ম্যাক্স প্লাংক হুবহু একই শিরোনাম ব্যবহার করে সেই সমালোচনার একটি জবাব দেন।
ঐতিহাসিকদের ধারণা, স্প্রিংগার নেচারের স্বয়ংক্রিয় কপিরাইট সফটওয়্যার বা বট দুই দশকেরও বেশি সময় পর এসে কেবল শিরোনামের মিল দেখে প্লাংকের প্রবন্ধটিকে মুলারের লেখার ‘নকল’ বা প্লেজারিজম ভেবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল করে দেয়। অথচ দুটি লেখার বিষয়বস্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল।
বিজ্ঞান মহলে এই ঘটনা নিয়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণত কোনো প্রবন্ধ প্রত্যাহার করা হলে সেটির ওপর বড় অক্ষরে ‘RETRACTED’ জলছাপ দিয়ে দেওয়া হয় যাতে গবেষকেরা অন্তত লেখাটি পড়তে পারেন। কিন্তু স্প্রিংগার নেচার প্লাংকের লেখা দুটি সম্পূর্ণ মুছে দিয়ে একটি সাদা পিডিএফ ফাইল ঝুলিয়ে রেখেছে।
সবচেয়ে আপত্তিকর বিষয় হলো, স্প্রিংগার নেচার সেই ফাঁকা পিডিএফ ফাইলটি এখনো ৩৯ দশমিক ৯৫ মার্কিন ডলারে বিক্রি করছে!
‘নাটুয়ারউইসেনশাফটেন’ (যা এখন ‘দ্য সায়েন্স অব নেচার’ নামে পরিচিত) জার্নালের বর্তমান প্রধান সম্পাদক ও রসায়নবিদ সুজান স্কারলাটা এই ঘটনা শুনে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘এটি সম্পূর্ণ পাগলামি। আমি বুঝতে পারছি না লেখাগুলো কেন বাতিল করা হলো। সম্ভবত তাদের স্বয়ংক্রিয় অ্যালগরিদমের ভুলের কারণে এটি ঘটেছে এবং তাদের এটি সংশোধন করা উচিত।’
এই বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে স্প্রিংগার নেচার বিস্তারিত মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তারা শুধু বলেছে, ‘প্রত্যাহারের বিশদ তথ্য গোপনীয় থাকে।’ এমনকি জার্নালের প্রধান সম্পাদক সুজান স্কারলাটা এই বিষয়ে একটি সম্পাদকীয় লিখতে চাইলেও প্রকাশনা সংস্থাটি তা আটকে দেয়।
ইতিহাসবিদ ইভ গিংগ্রাস ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘কার ভুলে এটি হয়েছে তা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই, কিন্তু প্রবন্ধগুলো ডেটাবেইসে ফিরিয়ে আনা জরুরি। বুদ্ধিবৃত্তিক ও ঐতিহাসিকভাবে এই ক্ষতি মেনে নেওয়া যায় না।’






