একটি ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারী কর্মকর্তাদের বরখাস্ত করার ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাহী ক্ষমতা বাড়িয়েছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। তবে একই সঙ্গে বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির মুদ্রানীতি নির্ধারণী স্বাধীন প্রতিষ্ঠান ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) স্বাধীনতাকে সুরক্ষা দিয়েছে দেশটির সর্বোচ্চ আদালত।

৬-৩ ব্যবধানের একটি রায়ে আদালতের রক্ষণশীল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ডেমোক্রেটিক ফেডারেল ট্রেড কমিশনার রেবেকা স্লটারের করা একটি চ্যালেঞ্জ বা আপিল খারিজ করে দেন। আদালত রায় দেয় যে, অধীনস্থদের চাকরি থেকে বরখাস্ত করার পূর্ণ ক্ষমতা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে ও গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে নিজেদের রাজনৈতিক মিত্রদের বসানোর লক্ষ্যে ট্রাম্প যেভাবে আগ্রাসীভাবে প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছিলেন, সেই প্রেক্ষাপটে আদালতের এই সিদ্ধান্তের সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সুপ্রিম কোর্টের এই রায়কে স্বাগত জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করে লেখেন, ১৯৩০-এর দশক থেকে শুরু করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টরা দীর্ঘদিন ধরে এই সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় ছিলেন। বর্তমান প্রেসিডেন্ট হিসেবে এই ঐতিহাসিক এবং নজিরবিহীন রায় জয় করাটা অত্যন্ত সম্মানের, যা রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ক্ষেত্রে দেওয়া এখন পর্যন্ত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি রায়।

ফেডারেল রিজার্ভের স্বাধীনতা রক্ষা

তবে ফেডারেল রিজার্ভের গভর্নর লিসা কুক-এর সাথে জড়িত অন্য একটি পৃথক মামলায় সুপ্রিম কোর্ট ভিন্ন রায় দিয়েছে। আদালত জানিয়েছে, ট্রাম্পের কাছে সুনির্দিষ্ট ও যৌক্তিক কারণে ফেডারেল রিজার্ভের গভর্নরদের বরখাস্ত করার ক্ষমতা থাকলেও, তিনি ‘যে কোনো অজুহাতে বা কোনো কারণ ছাড়াই’ তাদের পদচ্যুত করতে পারবেন না।

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ একটি সম্পূর্ণ অদলীয় বা নির্দলীয় (নন-পার্টিসান) প্রতিষ্ঠান, যা বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির মুদ্রানীতি প্রণয়ন করে। সিনেটের অনুমোদন প্রক্রিয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট এই ব্যাংকের গভর্নরদের নিয়োগ দিয়ে থাকেন।

আদালতের দেওয়া ৫-৪ ব্যবধানের বিভক্ত রায়ে ফেডারেল রিজার্ভের স্বাধীনতার গুরুত্ব বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। রায়ে বলা হয়, ফেডারেল রিজার্ভের কাঠামোগত নকশার জন্য কেবল স্বাধীনতার বাস্তব সত্যটুকুই নয়, বরং এর স্বাধীনতার বাহ্যিক রূপ বা দৃশ্যমানতা বজায় রাখাও অত্যন্ত জরুরি।

আদালত এই মামলার রায় দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি সুনির্দিষ্ট আইনি দিক বিবেচনা করেছে। রায়ে বলা হয়, প্রেসিডেন্ট কুক-কে সেই সংবিধিবদ্ধ বা আইনি প্রক্রিয়াগত সুরক্ষা (প্রসিডিউরাল প্রোটেকশন) দিতে ব্যর্থ হয়েছেন, যা আইনত তার প্রাপ্য ছিল। একই সাথে ফেড গভর্নর কুক যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া পেয়েছিলেন বলে যে ‘দুর্বল দাবি’ করা হয়েছিল, আদালত তাও খারিজ করে দেয়।

আদালতের এই রায়কে স্বাগত জানিয়ে লিসা কুক বলেন, এই সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতাকে ‘নিশ্চিত ও সুদৃঢ়’ করেছে। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, আজকের এই রায় এমন একটি নীতিকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেছে যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ভিত্তি হিসেবে কাজ করে আসছে। আর তা হল- ফেডারেল রিজার্ভকে যে কোনো ধরণের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন বিচারবুদ্ধি এবং প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে তাদের সমস্ত নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

ঐতিহাসিক এক সংঘাত

মার্কিন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আনার লক্ষ্যে সুদের হার কমানোর জন্য ট্রাম্প অতীতে ফেডারেল রিজার্ভের ওপর নজিরবিহীন চাপ সৃষ্টি করেছিলেন। আর গভর্নর লিসা কুক-কে বরখাস্ত করার এই চেষ্টাটি ছিল ব্যাংকটির ১১১ বছরের ইতিহাসে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের দ্বারা চালানো এই ধরণের প্রথম পদক্ষেপ।

তবে কুক তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, ফেডারেল রিজার্ভে কুক-এর ভবিষ্যতের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কেবল তখনই নেওয়া যাবে, যখন তিনি তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর জবাব দেওয়ার পর্যাপ্ত সুযোগ পাবেন।

সূত্র: এএফপি

এসএইচ