তখন খুব ছোট, প্রাইমারি স্কুলে পড়ি। আমাদের পরিবারে ‘আম্মু’ নামক একজন অতি পরাক্রমশালী শাসক ছিলেন। তাঁর কড়া নিয়ম—অনুমতি ছাড়া বাড়ির সীমানা পার হওয়া যাবে না। বাড়ির বাইরে যাওয়া ছিল একপ্রকার মহাপাপ। তাই আমার জগৎ ছিল ঘরের ভেতর, চারদেয়ালে। কাঠের হাতি-ঘোড়া, প্লাস্টিকের খেলনা গাড়ি আর নকল পিস্তল দিয়ে একা একাই যুদ্ধবিগ্রহের খেলা। মাঝেমধ্যে বল নিয়ে লাফালাফি করতে গেলে আম্মু গম্ভীর গলায় বলতেন, ‘বল খেলা একদম না। ঘরের আসবাবপত্র ভাঙলে তোমার পিঠের চামড়া থাকবে না।’
ব্যস, ওখানেই খেলার সমাপ্তি।

সেই বন্দিজীবনের মধ্যেই একদিন আমাদের গ্রামে ফিফা বিশ্বকাপের উন্মাদনা এসে হাজির হলো। তখন চারদিকে শুধুই দুটো নাম—আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল। আমার ধারণা ছিল দুনিয়াতে এই দুটো দেশ ছাড়া আর কোনো দেশ নেই, আর থাকলেও তারা ফুটবল খেলতে জানে না। গ্রামে তখন খেলা নিয়ে যা হতো, তাকে উৎসব বললে খানিকটা কম বলা হবে। নিজের দল জিতলে মানুষজন নৌকায় লাঠিয়াল আর নাচের দল নিয়ে খোল-করতাল বাজিয়ে নাচতে নাচতে এ-গ্রাম থেকে ও-গ্রামে যেত। কয়েক গ্রামের ট্রলার মিলে একসঙ্গে শোডাউন হতো। সেই শোরগোল দেখে নদীর মাছেরাও বোধ হয় কিছুটা শঙ্কিত হয়ে যেত, ভয়ে ডুব দিত।

২০১০ বিশ্বকাপ। বিশ্বের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু তখন লিওনেল মেসি। আকাশচুম্বী প্রত্যাশা আর দায়িত্বের ভার তখন তাঁর তরুণ কাঁধে। চুলটা আরও একটু ছাঁটিয়ে তাই চেহারায় পরিণত ভাব এনে পুরোদস্তুর মাঠের নেতা হয়ে উঠলেন ম্যারাডোনার দলের প্রাণভোমরা।

এসব দেখতে দেখতে কবে যে মনে মনে আর্জেন্টিনার কট্টর ভক্ত হয়ে গেলাম, নিজেও জানি না। মজার ব্যাপার হলো, আর্জেন্টিনার ভক্ত হওয়ার আগে মেসির ভক্ত হয়েছিলাম। তখনো টিভির পর্দায় মেসির পায়ের জাদুকরি দেখিনি। খেলা জিনিসটাও ঠিকঠাক বুঝি না। শুধু পাড়ার ছেলেদের টি-শার্ট আর পোস্টারে মেসির ছবি দেখতাম। মানুষের মুখে মুখে শুনতাম, মেসি নামের একজন জাদুকর আছে, সে পায়ে বল ছোঁয়ালেই নাকি গোল হয়ে যায়!

একদিন বিকেলে কাকাতো ভাই ফয়সাল এসে বলল, ‘আজ রাতে আর্জেন্টিনার খেলা। মেসি খেলবে। তুমি যাবা?’
খবরটা শুনে আনন্দে মনটা নেচে উঠল। কিন্তু খেলা দেখব কোথায়? আমাদের গ্রামে তখনো আধুনিকতার ছোঁয়া পায়নি। পল্লী বিদ্যুৎ কিংবা সৌরবিদ্যুৎ কোনোটারই নাম–গন্ধ নেই। সন্ধ্যা হলেই ঘরে ঘরে কুপিবাতি জ্বলত। সেই কুপির নিবু নিবু আলোয় বসে পড়া, তারপর রাতের খাবার খেয়ে ‘ফুঁ’ দিয়ে বাতি নিভিয়ে শুয়ে পড়া—এটাই ছিল আমাদের অলঙ্ঘনীয় নিত্যদিনের রুটিন।

তবে মজার ব্যাপার হলো, খেলা উপলক্ষে বাজারে একটা এলাহি কাণ্ড ঘটে যায়। জেনারেটর ভাড়া করে আনা হয়েছে, আর জোগাড় করা হয় মোটামুটি বড়সড় একটা রঙিন টেলিভিশন। বাজারের একটা বড় গুদাম ঘরে খড় বিছিয়ে বসে খেলা দেখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। গ্রামের আবালবৃদ্ধবনিতা সবাই এখানে খেলা দেখে।

২০১০ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা

বিকেল থেকেই আমার মন অদ্ভুতভাবে খারাপ। সবাই খেলা দেখতে যাবে, আমি ঘরে বসে মশা তাড়াব—এ কেমন বিচার? আম্মুকে গিয়ে যে বলব, সেই সাহস নেই। বললেই কড়া ধমক খেতে হবে। শুনলাম, আব্বুও নাকি বাজারে খেলা দেখতে যাবে। মনে হলো একটা আশার আলো দেখা যাচ্ছে। আব্বুর সঙ্গে যাওয়ার উসিলায় যদি আম্মুকে রাজি করানো যায়!

অনেক ভেবেচিন্তে, চোখে দু-ফোঁটা জল জমিয়ে, কাঁদো কাঁদো গলায় আম্মুর সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। বললাম, ‘আম্মু, আব্বুর সঙ্গে বাজারে খেলা দেখতে যাব?’
আম্মু প্রথমে চোখ বড় বড় করে তাকাল। রাগে কপাল কুঁচকে গেল। কিন্তু আমার ভেজা চোখ আর আকুলতা দেখে তাঁর মনে কিঞ্চিৎ দয়া হলো। মনটা বোধ হয় একটু গলল। তবে একটা কঠিন শর্ত জুড়ে দিল— ‘ক্লাসের এক নম্বর রোলটা ধরে রাখতে হবে। আর আজ থেকে প্রতিদিন এক ঘণ্টা বেশি পড়তে হবে। দুষ্টুমি করা যাবে না, রাজি?’
মাথা নেড়ে বললাম, ‘রাজি, এক পায়ে রাজি!’

বাড়ি থেকে বাজারের দূরত্ব খুব বেশি না, কিন্তু বর্ষাকালে এই পথটুকুই যমদূত হয়ে দাঁড়ায়। এক পাড়া থেকে অন্য পাড়ায় যেতে হয় বাঁশের সাঁকো দিয়ে। বাজারে যেতে হলে অন্তত তিনটা সাঁকো পার হতে হয়। নিচে থই থই করা নদীর পানি, ওপরে পিচ্ছিল বাঁশ। আম্মু শেষমেশ আমাকে আব্বুর জিম্মায় ছেড়ে দিল। আমি আব্বুর ঘাড়ের ওপর শক্ত করে চেপে বসলাম। আব্বু অতি সাবধানে পা ফেলে সাঁকো পার হতে লাগল। মনে হচ্ছিল, আমি যেন কোনো আলাদিনের জাদুর কার্পেটে চড়ে মেঘের ওপর দিয়ে যাচ্ছি।

ফুটবল আর বন্ধুত্ব—তোর টিমে, তোর পাশে
আর্জেন্টিনা জাতীয় ফুটবল দলের কোচ ছিলেন ম্যারাডোনা। ২০১০ সালের ১০ জুন। ফাইল ছবি

সন্ধ্যা নামার আগেই বাজারে মানুষ জমতে শুরু করেছে। চারদিকে উৎসবের আমেজ। আকাশজুড়ে সোনার থালার মতো চাঁদ, জোছনা ঢেলে সাজিয়েছে রাত। বাজারের পাশের একটা ফাঁকা জায়গায় আমাদের বয়সী ছেলেরা চাঁদের আলোয় লুকোচুরি খেলছে। কেউবা তুমুল দৌড়াদৌড়িতে ব্যস্ত। এক পাশে কয়েকজন খড় আর পলিথিন কাগজের দলা পেঁচিয়ে ফুটবল খেলছে আর বড়রা এক কোনায় বসে হারিকেনের আলোয় খেলছে তাস।
আব্বু আমাকে আমার সমবয়সীদের সঙ্গে খেলতে দিয়ে বন্ধুদের আড্ডায় চলে গেলেন। আমি বন্ধুদের সঙ্গে লুকোচুরি খেলছি ঠিকই, কিন্তু মন পড়ে আছে ওই গুদাম ঘরের টেলিভিশনের দিকে। মনে হচ্ছে সময় যেন আর কাটছেই না।
ঘড়ির কাঁটা কি আটকে গেল?
না ঘড়ির কাঁটা আটকায়নি। কাঁটা ঠিকই চলছে, তবে সীমাহীন আনন্দে এমন মনে হচ্ছে। জীবনে প্রথম আব্বুর সঙ্গে রাতে বাইরে আসা, আর চাঁদের আলোয় বন্ধুদের সঙ্গে এতক্ষণ খেলার সুযোগ পাওয়া—এর চেয়ে বড় আনন্দ আর কী হতে পারে!

ম্যারাডোনা ও মেসি যখন গুরু–শিষ্য। ২০১০ বিশ্বকাপে

অবশেষে রাত একটা বাজল। জেনারেটরের শব্দের সঙ্গে টেলিভিশন চালু হলো। গুদাম ঘরের ভেতর তিলধারণের জায়গা নেই। মানুষের গাদাগাদি। রেফারি বাঁশি ফুঁ দিলেন, খেলা শুরু হতেই চারপাশ নিস্তব্ধ। কিন্তু যেই না মেসির পায়ে বল গেল, অমনি পুরো ঘর ভূমিকম্পের মতো কেঁপে উঠল, ‘মেসি! মেসি! গোললল!’
আমিও সেই ভিড়ের মধ্যে চোখ বড় বড় করে মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে রইলাম। খেলা দেখতে দেখতে কখন যে আব্বুর কোলে ঘুমিয়ে পড়েছি, টের পাইনি।

পরদিন সকালে ঘুম ভাঙল, কানে ভেসে আসছে, ‘মেসি! মেসি! জিতবে এবার মেসি’।
চোখ ডলতে ডলতে বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালাম। নদীর বুকে ইয়া বড় একটা মিছিল যাচ্ছে! চার-চারটে বিশাল ট্রলার সাজানো হয়েছে পতাকা দিয়ে। ছোট-বড় মিলিয়ে শ-খানেক মানুষ ট্রলারে দাঁড়িয়ে চিৎকার করছে আর স্লোগান দিচ্ছে। ট্রলারের এক কোনায় দাঁড়ানো বন্ধু পরশকেও দেখা যাচ্ছে। পরশ আনন্দে হাত নাড়ছে আর গলা ফাটিয়ে স্লোগান ধরছে, ‘মেসি! মেসি!’