২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের রাউন্ড অব ৩২-এর মঞ্চে বুধবার (১ জুলাই) দিবাগত রাত ২টায় সিয়াটল স্টেডিয়ামে রোমাঞ্চকর এক লড়াইয় অপেক্ষা করছে। মুখোমুখি হতে যাচ্ছে ইউরোপের পরাশক্তি বেলজিয়াম এবং আফ্রিকার অন্যতম সেরা দল সেনেগাল। 

গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে বেলজিয়াম নকআউটে পা রাখলেও পুরো টুর্নামেন্টে তাদের পথচলাটা খুব একটা মসৃণ ছিল না। অন্য দিকে সেরা তৃতীয় স্থানধারী দলগুলোর একটি হিসেবে শেষ মুহূর্তে খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে নকআউটে জায়গা করে নিয়েছে সেনেগাল। সব পর্যায় মিলিয়ে ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো মুখোমুখি হচ্ছে দল দুটি।

বেলজিয়ামের এবারের বিশ্বকাপ মিশন শুরু হয়েছিল বেশ কিছু প্রশ্ন আর সংশয় নিয়ে। প্রথম ম্যাচে মিশরের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করার পর, দ্বিতীয় ম্যাচে ইরানের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র করে রুদি গার্সিয়ার দল। এই দুটি পারফরম্যান্সের পর দলটির সামর্থ্য নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়। তবে শেষ গ্রুপ ম্যাচে নিউজিল্যান্ডকে ৫-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে নিজেদের আসল রূপ দেখায় বেলজিয়াম। পাঁচ পয়েন্ট নিয়ে, গ্রুপ পর্বে ছয়টি গোল করে এবং মাত্র দুটি গোল হজম করে শেষ পর্যন্ত তারা গ্রুপের শীর্ষে থেকেই নকআউটে ওঠে।

২০১৮ বিশ্বকাপে তৃতীয় স্থান অর্জনকারী ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ের নবম দল বেলজিয়াম ২০২২ সালে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিয়েছিল। সেই স্বর্ণালি প্রজন্মের পর নতুন এই প্রজন্মের জন্য সেনেগালকে হারিয়ে শেষ ষোলোয় ওঠা হবে মস্ত বড় এক মাইলফলক। তবে কোচ গার্সিয়া খুব ভালো করেই জানেন, নকআউটের বৈতরণী পার হতে হলে দলের পারফরম্যান্সকে আরও নিখুঁত করতে হবে।

অন্য দিকে সেনেগালের গল্পটা আরও বেশি নাটকীয়। গ্রুপ পর্বের প্রথম দুই ম্যাচে ফ্রান্স ও নরওয়ের কাছে হেরে নকআউটের স্বপ্ন যখন প্রায় ধূসর, ঠিক তখনই পাপে থিয়াওয়ের দল চাপের মুখে অনন্য এক রূপ ধারণ করে। শেষ ম্যাচে ইরাককে ৫-০ গোলে স্রেফ উড়িয়ে দিয়ে তারা নিশ্চিত করে পরের পর্ব। এই জয়ের মাধ্যমে তারা বিশ্বকাপের এক ম্যাচে পাঁচ গোল করা প্রথম আফ্রিকান দল হিসেবেও নতুন এক ইতিহাস গড়ে। ২০০২ সালে কোয়ার্টার ফাইনাল খেলা সেনেগাল ২০২২ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের কাছে হেরে শেষ ষোলো থেকে বিদায় নিয়েছিল।

এবার রাউন্ড অব ৩২-এ ওঠা নয়টি আফ্রিকান দলের মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকা ইতোমধ্যে বিদায় নেওয়ায় পুরো মহাদেশের আশা এখন অনেকটাই সেনেগালের কাঁধে। তবে ইরাকের বিপক্ষে দুর্দান্ত খেললেও তাদের রক্ষণভাগের দুর্বলতা কিন্তু এখনো রয়ে গেছে, যা বেলজিয়ামের সৃজনশীল মিডফিল্ডের সামনে বড় পরীক্ষা তৈরি করতে পারে।

হাইভোল্টেজ ম্যাচে বেলজিয়াম প্রায় পূর্ণ শক্তির দল নিয়েই মাঠে নামছে। গোলপোস্টের নিচে অভিজ্ঞতার দেয়াল তুলতে ১১২টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা থিবো কোর্তোয়া থাকছেন প্রথম একাদশে। পায়ের চোট কাটিয়ে জেনো ডেবাস্ট রবিবার দলের সাথে অনুশীলন করায় তিনি মাঠে নামার জন্য ফিট হতে পারেন বলে আশা করা যাচ্ছে। ফুলব্যাক হিসেবে দেখা যেতে পারে টিমোথি কাস্তানিয়ে ও ম্যাক্সিম ডি কুইপারকে এবং সেন্টার ব্যাকে দায়িত্ব সামলাবেন আর্থার থিয়াতে।

সেনেগালের রক্ষণভাগের জন্য সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ হবে বেলজিয়ামের বহুমুখী আক্রমণভাগ। দলের হয়ে সর্বোচ্চ দুটি গোল করা লিয়ান্দ্রো ত্রোসার্ডের পাশাপাশি কেভিন ডি ব্রুইনে, রোমেলু লুকাকু ও আলেক্সিস সেলেমেকার্সের মতো তারকারা যেকোনো মুহূর্তে ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দিতে পারেন।

বিপরীতে সেনেগাল শিবিরে রয়েছে এক বড় ধাক্কার খবর। নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচে হাঁটুতে চোট পেয়ে দলের প্রথম পছন্দের গোলরক্ষক এদুয়ার মেন্ডি চিকিৎসার জন্য সৌদি আরবের ক্লাব আল আহলিতে ফিরে গেছেন। এ ছাড়া নরওয়ের বিপক্ষে নড়বড়ে পারফরম্যান্সের কারণে অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার কালিদু কুলিবালিকে আবারও বেঞ্চে বসতে হতে পারে, আর তার জায়গায় ইরাকের বিপক্ষে দারুণ খেলা আবদুলায়ে সেক শুরুর একাদশে থাকার জোর দাবিদার।

তবে রক্ষণভাগের এই দুশ্চিন্তা কাটিয়ে সেনেগালের আশার প্রদীপ হয়ে জ্বলছেন আক্রমণভাগের সেরা পারফরমার সার। তার সঙ্গে অভিজ্ঞ সাদিও মানে তো আছেনই, যিনি নিজের একক দক্ষতায় যেকোনো মুহূর্তে বদলে দিতে পারেন পুরো ম্যাচের চিত্র। এক দলের লক্ষ্য ধারাবাহিকতা ফিরে পাওয়া আর অন্য দলের লক্ষ্য খাদের কিনারা থেকে উঠে এসে নিজেদের সেরা সাফল্যকে স্পর্শ করা। সিয়াটলের মাঠে এই দুই শক্তির লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত কার হাসি চওড়া হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।