চার সন্তানকে পাশে নিয়ে ভাঙা ভিটার ধারে উদাস হয়ে বসে ছিলেন মিনারা বেগম। মাথার ওপর খোলা আকাশ, পাশে গুছিয়ে রাখা কয়েকটি টিন। চার বছর আগে তিস্তার ভাঙনে হারিয়েছিলেন নিজের ভিটেমাটি। এবার ব্রহ্মপুত্র কেড়ে নিয়েছে শেষ আশ্রয়টুকুও। নীরবতা ভেঙে দীর্ঘশ্বাসের পর বললেন—‘এলাও মাথা গোঁজার ঠাঁই পাইনি।’
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার তিস্তার চরে ছিল মিনারা বেগম (৫৫) ও তাঁর স্বামী সাইফুল ইসলামের (৬০) বসতভিটা। তিস্তার ভাঙনে সব হারিয়ে তাঁরা কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার চিলমারী ইউনিয়নের কড়াইবরিশাল চরের একটি আশ্রয়ণ প্রকল্পে মিনারার বোনের ঘরে আশ্রয় নেন। কিন্তু তিন দিন আগে ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে সেই আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরটিও নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এর পর থেকে খোলা আকাশের নিচেই দিন কাটছে তাঁদের।
কৃষিশ্রমিক সাইফুল ইসলাম মৌসুমে মাছ ধরে সংসার চালান। নিজের কোনো জমিজমা বা ঘরবাড়ি নেই। নদীভাঙনের পর থেকে একের পর এক অন্যের আশ্রয়েই কাটছে তাঁদের জীবন।
কথা বলতে বলতে চোখ ভিজে আসে মিনারার। তিনি বলেন, এই চরে আসার পর থেকে ভোটার হতে অনেক চেষ্টা করেছেন। গরিব মানুষ, টাকা দিতে পারেননি বলে কাজও হয়নি। গতকাল মঙ্গলবার ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত অনেকেই ত্রাণ পেয়েছে, ভোটার আইডি না থাকায় তাঁরা পাননি।

আজ বুধবার দুপুরে সরেজমিনে চিলমারী ইউনিয়নের কড়াইবরিশাল ও শাখাহাতি চরে গিয়ে দেখা যায়, উজানের ঢলে ব্রহ্মপুত্রে তীব্র স্রোত সৃষ্টি হয়েছে। নদী ভাঙতে ভাঙতে পৌঁছে গেছে বিশারপাড়া আশ্রয়ণ প্রকল্প পর্যন্ত। ইতিমধ্যে প্রকল্পসংলগ্ন সাতটি বিদ্যুতের খুঁটি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। গত সাত দিনে কড়াইবরিশাল ও শাখাহাতি চরের অন্তত ৭০টি পরিবার বসতভিটা হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিয়েছে।
একই দুর্দশায় পড়েছেন শাখাহাতি চরের আতাউর রহমান (৩৫)। গত রোববার ব্রহ্মপুত্র তাঁর বসতভিটাও গিলে নিয়েছে। এখন ছোট সন্তানকে নিয়ে প্রতিবেশীর বারান্দায় রাত কাটছে তাঁর। তিনি বলেন, ‘চর এলাকায় বাড়ি করতে জমি চুক্তিতে নিতে হয়। এর জন্য প্রায় এক লাখ টাকা লাগে। সেই সামর্থ্য আমার নেই।’
কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টি ও উজানের ঢলে কুড়িগ্রামের ধরলা, তিস্তা, দুধকুমার ও ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বেড়ে জেলার অন্তত ৪০টির বেশি স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে চিলমারী ইউনিয়নের শাখাহাতি ও কড়াইবরিশাল চরের ভাঙন সবচেয়ে তীব্র। ঝুঁকিতে রয়েছে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ইউনিয়নের একমাত্র নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং কড়াইবরিশাল বাজার।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, উজানের ঢলে জেলার নদ-নদীতে ৪০টির বেশি স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩০টি স্থানে জরুরি ভিত্তিতে ভাঙন প্রতিরোধের কাজ চলছে। তবে শাখাহাতি ও কড়াইবরিশাল চর নদীর মাঝখানে হওয়ায় পাউবোর নীতিমালা অনুযায়ী সেখানে জিও ব্যাগ ফেলা সম্ভব নয়।

চিলমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদুল হাসান বলেন, গত কয়েক দিনে ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে চিলমারী ইউনিয়নের শাখাহাতি, কড়াইবরিশাল ও বিশারচর এলাকার অন্তত ৭০টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের মধ্যে জিআরের চাল ও শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। নদীভাঙন রোধে পাউবোর সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত আছে।








