ফুটবল বিশ্বকাপ শুরু হলেই বদলে যায় বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের চেনা চিত্র। ক্লাস, পরীক্ষা আর অ্যাসাইনমেন্টের ফাঁকেও শিক্ষার্থীদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে বিশ্বকাপ। কোথাও প্রিয় দলের পতাকা উড়ছে, কোথাও জার্সি পরে চলছে শোভাযাত্রা। আবার কোথাও গভীর রাত কিংবা ভোরে শতশত শিক্ষার্থী একসঙ্গে বড় পর্দার সামনে বসে খেলা দেখছেন। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোয় অনুষ্ঠিত ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ ঘিরে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেন ছোট ছোট স্টেডিয়ামে পরিণত হয়েছে।

সবচেয়ে বেশি উচ্ছ্বাস দেখা যাচ্ছে বড় পর্দায় খেলা দেখার আয়োজন ঘিরে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি চত্বরে ডাকসুর উদ্যোগে চলছে ‘গুরু ওয়ার্ল্ড কাপ ফিয়েস্তা’। উদ্বোধনী ম্যাচ থেকে গুরুত্বপূর্ণ সব ম্যাচই সেখানে জায়ান্ট স্ক্রিনে দেখানো হচ্ছে। একই সঙ্গে রয়েছে মিনি বিশ্বকাপ, রম্য বিতর্ক, কুইজ, ফ্যান এনগেজমেন্ট এবং নানা সাংস্কৃতিক আয়োজন। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি, জগন্নাথ হল, শহীদুল্লাহ হল, মুহাসীন হল ও হলপাড়ায় বড় পর্দায় খেলা দেখানো হচ্ছে।

ঈদ ও গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে অনেকটাই নিরিবিলি ছিল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু বিশ্বকাপ সেই নীরবতায় নতুন প্রাণ ফিরিয়ে এনেছে। জাকসুর উদ্যোগে মুক্তমঞ্চে বড় পর্দায় খেলা দেখতে একত্র হচ্ছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ফুটবলপ্রেমীরা। প্রিয় দলের জার্সি, পতাকা আর স্লোগানে মুখর হয়ে উঠছে পুরো এলাকা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শহীদ মিনার এলাকায় বসানো হয়েছে প্রায় ২০০ বর্গফুটের এলইডি স্ক্রিন। ভোর চারটার ম্যাচ দেখতেও সেখানে ভিড় করছে হাজারো শিক্ষার্থী। গোল হলেই মুহূর্তে উল্লাসে কেঁপে উঠছে পুরো প্রাঙ্গণ। অনেকেই বলছেন, স্টেডিয়ামে বসে খেলা দেখার অনুভূতি মিলছে এ আয়োজনেই। রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, নেত্রকোনা বিশ্ববিদ্যালয়সহ আরও কয়েকটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বড় পর্দায় খেলা দেখার ব্যবস্থা করেছে প্রশাসন ও বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন।

বিশ্বকাপ এলেই ক্যাম্পাসে সবচেয়ে চোখে পড়ে বিভিন্ন দেশের পতাকা। আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, স্পেন, ফ্রান্স, জার্মানি, পর্তুগালসহ নানা দেশের পতাকায় সাজানো হচ্ছে হলো, বিভাগ, একাডেমিক ভবন ও সড়ক। গণবিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমবার অংশগ্রহণকারী ৪৮টি দেশের পতাকা টানানো হয়েছে। পাশাপাশি ড্রিবলিং প্রতিযোগিতা, পেনালটি কিক চ্যালেঞ্জ ও জার্সি প্রদর্শনীর আয়োজনও শিক্ষার্থীদের উৎসবে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশ্বকাপের আবেগ ধরা পড়েছে দেওয়ালচিত্রে। টিএসসি ভবনের দেওয়ালে ফুটে উঠেছে লিওনেল মেসির গ্রাফিতি। দ্বিতীয় গেটে ব্রাজিলের পতাকার আবরণে আঁকা হয়েছে নেইমার জুনিয়রের বিশাল প্রতিকৃতি। প্রতিদিনই সেখানে ভিড় করছেন শিক্ষার্থীরা। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ আবার প্রিয় তারকার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করছেন।

বিশ্বকাপ মানেই আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল সমর্থকদের বন্ধুত্বপূর্ণ লড়াই। সেই চিরচেনা দৃশ্যও দেখা যাচ্ছে প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ে। চায়ের দোকান, হলের বারান্দা কিংবা ক্যাফেটেরিয়ায় চলছে তর্ক। কে সেরা, কে জিতবে কাপ এসব নিয়েই প্রাণবন্ত আলোচনা। তবে ম্যাচ শেষ হলে সেই তর্কের জায়গা দখল করে নেয় হাসি আর বন্ধুত্ব। ভিন্ন দলের সমর্থকরা একই টেবিলে বসে চা পান করছেন, ছবি তুলছেন, আবার পরের ম্যাচ নিয়েও আলোচনা করছে। বিশ্বকাপের আনন্দ তাই শুধু একটি খেলায় সীমাবদ্ধ থাকছে না। এটি ক্যাম্পাসে তৈরি করছে উৎসব, বন্ধুত্ব এবং স্মরণীয় কিছু মুহূর্ত। বিশ্বকাপ শেষ হবে, পতাকা নামবে, বড় পর্দাও সরিয়ে নেওয়া হবে। কিন্তু একসঙ্গে রাত জেগে খেলা দেখা, গোলের উল্লাসে আলিঙ্গন আর বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো এ সময়গুলো বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের অন্যতম প্রিয় স্মৃতি হয়ে থেকে যাবে।