ধরো, ক্লাসভর্তি বন্ধুদের সামনে হঠাৎ তুমি এমন একটা বেফাঁস কথা বলে ফেললে, যা শুনে সবাই হো হো করে হেসে উঠল! একটু ভাবো তো অবস্থাটা? লজ্জায় তখন রীতিমতো মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছা করে, তাই না? আর ঠিক সেই মুহূর্তেই তোমার মনে হয়, গাল দুটো যেন গরম তাওয়ার মতো তেতে উঠেছে। সে সময় দৌড়ে গিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়ালে দেখবে, তোমার মুখটা লাল হয়ে গেছে!

কিন্তু লজ্জা পেলে বা নার্ভাস হলে আমাদের গাল এমন লাল হয়ে যায় কেন? চলো, এই মজার ব্যাপারটা জেনে নিই।

লজ্জা পাওয়ার সঙ্গে আমাদের মুখের লাল হয়ে যাওয়ার সম্পর্কটা তৈরি করে মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রে। যখনই আমরা এমন কোনো পরিস্থিতিতে পড়ি, যা আমাদের জন্য চরম অস্বস্তিকর বা লজ্জার, তখন আমাদের শরীর সেটাকে একধরনের বিপদ হিসেবে ধরে নেয়। আর বিপদ টের পেলেই আমাদের শরীরের স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্র একটা ইমার্জেন্সি অ্যালার্ম বাজিয়ে দেয়।

এই অ্যালার্ম বাজার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের রক্তে অ্যাড্রেনালিন নামে একটি হরমোন ছড়িয়ে পড়ে। এই হরমোনের কাজ হলো শরীরকে দ্রুত যেকোনো পরিস্থিতির জন্য তৈরি করা। ফলে আমাদের হৃৎপিণ্ড দ্রুত পাম্প করতে শুরু করে, শ্বাস-প্রশ্বাস ঘন হয়ে যায়। সবচেয়ে মজার ব্যাপার ঘটে আমাদের রক্তনালিগুলোয়। অ্যাড্রেনালিনের প্রভাবে আমাদের মুখের, বিশেষ করে গালের কাছের সূক্ষ্ম রক্তনালিগুলো হঠাৎ করে আগের চেয়ে চওড়া হয়ে যায়। রক্তনালি চওড়া হয়ে যাওয়ার কারণে সেখানে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি রক্ত হুড়মুড় করে এসে জমা হয়। যেহেতু আমাদের গালের চামড়া শরীরের অন্য জায়গার চেয়ে কিছুটা পাতলা, তাই ত্বকের নিচ দিয়ে ওই অতিরিক্ত লাল রক্তগুলো বাইরে থেকে স্পষ্ট দেখা যায়। এ কারণেই লজ্জায় গাল লাল হয়ে ওঠে!

নক্ষত্রের ভোজে গ্রহ, অপেক্ষায় আছে বাদামি বামন

আচ্ছা তুমি কি জানো, পুরো প্রাণিজগতে শুধু মানুষেরাই লজ্জা পেলে লাল হয়ে যায়? তোমার পোষা বিড়ালটি যদি চুরি করে মাছ খেয়ে ধরাও পড়ে, সে হয়তো লেজ গুটিয়ে পালাবে, কিন্তু তার গাল কখনো লাল হবে না।

তাহলে গাল লাল হওয়া কি আমাদের জন্য ক্ষতিকর? একটু ভেবে দেখলে মনে হতে পারে, গাল লাল হয়ে যাওয়াটা তো আমাদের জন্য একটা বিশাল অসুবিধা! ধরো, তুমি কোনো একটা ভুল করেছ বা একটা ছোট মিথ্যা বলেছ। তুমি চাইছ, কেউ যেন সেটা বুঝতে না পারে। কিন্তু তোমার শরীর তো তোমার কথা শুনছে না! গাল লাল হয়ে গিয়ে সবার সামনে তোমার মিথ্যাটাকে ফাঁস করে দিচ্ছে। কিন্তু না, এটা কোনো সমস্যা নয়। ২০০৯ সালে নেদারল্যান্ডসের একদল মনোবিজ্ঞানী প্রমাণ করে দেখিয়েছেন, গাল লাল হয়ে যাওয়াটা আমাদের জন্য কোনো দুর্বলতা নয়, বরং এটা মানুষের একধরনের সুপারপাওয়ার!

প্রায় ভুলে যাওয়া এক ফলের নাম পুতিজাম

বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, কেউ যখন কোনো ভুল করে বা সামাজিক নিয়ম ভাঙে, তখন সে যদি লজ্জায় লাল হয়ে যায়, তবে অন্য মানুষেরা তাকে খুব দ্রুত ক্ষমা করে দেয়। ধরো, তোমার এক বন্ধু না বলে তোমার টিফিন খেয়ে ফেলেছে। ধরা পড়ার পর সে যদি একদম স্বাভাবিক মুখে ‘সরি’ বলে, তোমার কি রাগ কমবে? হয়তো না! কিন্তু সে যদি ধরা পড়ার পর লজ্জায় একদম লাল হয়ে মাথা নিচু করে ফেলে, তখন তোমার মন এমনিতেই নরম হয়ে যাবে।

কারণ, তোমার গাল লাল হয়ে যাওয়াটা আসলে চারপাশের মানুষকে একটা সংকেত দেয়। এটি বুঝিয়ে দেয় যে তুমি সামাজিক নিয়মটা জানো, তুমি বুঝতে পেরেছ যে তোমার ভুল হয়েছে এবং তুমি এই ভুলের জন্য সত্যিই অনুতপ্ত। তোমার এই অনুশোচনাটা যে একদম খাঁটি, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো তোমার লাল গাল। কারণ, এটি চাইলেও নকল করা যায় না।

সূত্র: বিবিসি সায়েন্স ফোকাস

বৃষ্টির পানি সরাসরি পান করা কি নিরাপদ