জাপানের প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক হারুকি মুরাকামির বহুল আলোচিত ও উদ্ধৃত একটি উক্তি তাঁর উপন্যাস ‌‘কাফকা অন দ্য শোর’ থেকে নেওয়া। উপন্যাসের শুরুতেই তিনি পরিচয় করিয়ে দেন পনেরো বছর বয়সী এক কিশোরের সঙ্গে। যে নিজের পনেরোতম জন্মদিনে বাড়ি ছেড়ে অজানার পথে যাত্রা করার সিদ্ধান্ত নেয়।

সেই প্রেক্ষাপটে মুরাকামি লিখেছেন, একসময় ঝড় কেটে যাবে। তখন মানুষ আর মনে করতে পারবে না, কীভাবে সেই সময় পার করেছিল বা কীভাবে টিকে ছিল। এমনকি ঝড় সত্যিই শেষ হয়েছে কি না, সে বিষয়েও সংশয় থেকে যেতে পারে। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত, ঝড় থেকে বেরিয়ে আসার পর সে আর সেই মানুষটি থাকবে না, যে একদিন ঝড়ের ভেতরে প্রবেশ করেছিল। মুরাকামির ভাষায়, এটাই এই ঝড়ের আসল অর্থ।

এখানে ‘ঝড়’ কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রতীক নয়। এটি মানুষের জীবনের সংকট, যন্ত্রণা, ভয় এবং আত্মিক সংগ্রামের রূপক। এমন সময় পার করে আসা সহজ নয়। কিন্তু প্রতিটি সংকটেরই একসময় অবসান ঘটে। পরে ফিরে তাকালে মানুষ প্রায়ই বুঝতে পারে না, কীভাবে সে সেই সময়টুকু অতিক্রম করেছিল। কারণ সেই অভিজ্ঞতা এতটাই গভীর হয় যে, সেই সময়ের স্মৃতিগুলো ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে যায়। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত, সেই অভিজ্ঞতা মানুষকে বদলে দেয়। ঝড় শেষে সে আর আগের মানুষটি থাকে না।

আরও পড়ুন

গল্পগুলো একটা সুতোয় বাঁধার কাজ চলছে: উদয় রহমান

উপন্যাসে কিশোর নায়ক কাফকা প্রথমে বিশ্বাস করে, সে কেবল তার বাবার কাছ থেকে পালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কাহিনি যত এগোয়, ভবিষ্যদ্বাণীমূলক স্বপ্ন, পরাবাস্তব অভিজ্ঞতা এবং বাস্তবতা ও কল্পনার অস্পষ্ট সীমারেখা তাকে নিজের ভেতরের সেই সত্যগুলোর মুখোমুখি দাঁড় করায়, যেগুলো থেকে সে এতদিন পালিয়ে বেড়িয়েছিল।

মুরাকামির ‘ঝড়’-এর রূপক অর্থ

বিখ্যাত উক্তিটির আগে মুরাকামি ভাগ্যকে এক পরিবর্তনশীল বালুঝড়ের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁর ভাষায়, মানুষ যতবারই পথ বদলানোর চেষ্টা করুক না কেন, ঝড়ও ততবার দিক বদলে তাকে অনুসরণ করে। ফলে তা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা যেন ভোরের ঠিক আগে মৃত্যুর সঙ্গে এক অশুভ, অন্তহীন নৃত্যে শামিল হওয়ার মতো। কারণ এই ঝড় বাইরে থেকে এসে পড়া কোনো দুর্যোগ নয়; এটি মানুষের নিজের ভেতরের ঝড়, তারই একটি অংশ।

তাই এর বিরুদ্ধে লড়াই করার নয় বরং নিজেকে এর কাছে সমর্পণ করার আহ্বান জানান মুরাকামি। চোখ বন্ধ করে, কান ঢেকে, যাতে বালুকণা ভেতরে ঢুকতে না পারে, ধীরে ধীরে এক পা এক পা করে সেই ঝড়ের ভেতর দিয়েই এগিয়ে যেতে হয়। সেখানে নেই সূর্য, নেই চাঁদ, নেই কোনো দিকনির্দেশনা, এমনকি সময়েরও কোনো বোধ নেই। আছে শুধু হাড়ের গুঁড়োর মতো সূক্ষ্ম সাদা বালুকণা, যা আকাশজুড়ে ঘুরপাক খেতে থাকে।

আরও পড়ুন

সাহিত্যে শ্লীলতা-অশ্লীলতা: মনস্তাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণ

মুরাকামি বোঝাতে চান, জীবনের কিছু ঝড় বাইরে থেকে আসে না; সেগুলোর জন্ম আমাদের নিজের ভেতরেই। তাই সেগুলোকে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আমাদের সেই অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়েই এগিয়ে যেতে হয়। আর যখন আমরা অন্য প্রান্তে পৌঁছাই; তখন আমরা আর আগের মানুষটি থাকি না।

এই পরিবর্তন ভালো না খারাপ, সে বিষয়ে মুরাকামি কোনো চূড়ান্ত ব্যাখ্যা দেন না। তবে তিনি স্পষ্ট করেন, ঝড় পেরিয়ে আসার পর আগের মানুষটিতে আর ফিরে যাওয়া যায় না। এ কারণেই ‘কাফকা অন দ্য শোর’-এর এই বিখ্যাত উদ্ধৃতিটি শুধু উপন্যাসের একটি স্মরণীয় অংশ হয়ে থাকেনি বরং জীবনের কঠিন সংকট অতিক্রম করে ভেতর থেকে বদলে যাওয়া অসংখ্য মানুষের অভিজ্ঞতার প্রতিধ্বনি হয়ে উঠেছে।

(টাইমস অব ইন্ডিয়া অবলম্বনে ভাষান্তর)

এসইউ