চার বছর ধরে ধরনা দিয়েও বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবসরপ্রাপ্ত ১ লাখ ১০ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী অবসর ও কল্যাণ সুবিধা পাচ্ছেন না। অবসর ও কল্যাণ সুবিধার টাকা পাওয়ার অপেক্ষায় হাজার হাজার শিক্ষক-কর্মচারীর শেষ জীবনের সময়গুলো কেটে গেছে। ৬ মাস ধরে অবসর বোর্ডের অর্থ পরিশোধের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় সংকট আরও বেড়েছে। সংশ্লিষ্ট দুই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা বলছেন, জমা থাকা আবেদন নিষ্পত্তি করতে এককালীন ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থের প্রয়োজন। এই টাকার সংস্থান না হলে বিপুলসংখ্যক শিক্ষক-কর্মচারীর অবসরকালীন সুবিধা দেওয়া সম্ভব নয়। সর্বশেষ তথ্যমতে, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ডে বর্তমানে প্রায় ৬৭ হাজার আবেদন নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। এসব আবেদনকারীর বড় অংশ ২০২২ সালের জুনের পর অবসরে যান। বোর্ড ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের আবেদন নিষ্পত্তির কাজ করছে। ফলে পরবর্তী ৪ বছরের আবেদন কার্যত ঝুলে গেছে। এ অবস্থায় আর্থিক কষ্টে অনেক শিক্ষক-কর্মচারী মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
অবসর সুবিধা বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, অপেক্ষমাণ ৬৭ হাজার আবেদন নিষ্পত্তি করতেও ৭ হাজার কোটি টাকার বেশি প্রয়োজন। তারা জানান, আবেদন ব্যবস্থাপনার সার্ভার ও সফটওয়্যারসংক্রান্ত জটিলতার কারণে অর্থছাড়ের প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে পড়েছে। এর ফলে অবসরপ্রাপ্তদের সংখ্যা বাড়লেও তহবিলে জমা অর্থ সে হারে বাড়েনি। এতে করে বছরের পর বছর ধরে আবেদন জমে বড় ধরনের জট তৈরি হয়েছে।
অবসর সুবিধা বোর্ডের সচিব মো. মোশাররফ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। দ্রুত শিক্ষকদের বকেয়া অর্থ পরিশোধ কার্যক্রম শুরু হবে। ধাপে ধাপে সব আবেদন নিষ্পত্তি করার চেষ্টা করব।
এদিকে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টেও একই ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। ট্রাস্ট সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে প্রায় ৪৩ হাজার আবেদন নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি এখন ২০২৩ সালের আগস্টে অবসরে যাওয়া শিক্ষক-কর্মচারীদের কল্যাণ সুবিধার অর্থ পরিশোধ করছে। এরপরে অবসরে যাওয়া হাজার হাজার শিক্ষক-কর্মচারী এখনো তাদের অর্থ পাওয়ার অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন।
জানা গেছে, প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা রাজধানীতে এসে অবসর বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টের কার্যালয়ে খোঁজ নিচ্ছেন। অনেকেই চিকিৎসা, পারিবারিক ব্যয় কিংবা ঋণ পরিশোধের জন্য এই অর্থের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা না থাকায় তারা হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন। ২০২৩ সালে অবসরে যাওয়া সিরাজুল ইসলাম নামের একজন শিক্ষক যুগান্তরকে বলেন, চাকরি শেষে ভেবেছিলাম অবসর ও কল্যাণের টাকা দিয়ে সংসার চালাতে পারব। ৪ বছর হয়ে গেল, এখনো টাকা পাইনি। চিকিৎসার খরচ মেটাতে ধারদেনা করতে হচ্ছে।
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টের সচিব অধ্যাপক ইউসুফ আলী যুগান্তরকে বলেন, অবসরে যাওয়া শিক্ষক-কর্মচারীদের অর্থ পরিশোধে সরকার খুবই আন্তরিক। আমরা জমা থাকা আবেদন নিষ্পত্তি করতে প্রতিনিয়ত কাজ করছি। আশা করি দ্রুতই সমস্যার সমাধান হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, অবসর ও কল্যাণ সুবিধার অর্থের বড় একটি অংশ আসে শিক্ষক-কর্মচারীদের নিজস্ব জমাকৃত অংশ থেকে। অবসর সুবিধার জন্য চাকরিকালীন সময়ে তাদের মূল বেতনের ৬ শতাংশ এবং কল্যাণ সুবিধার জন্য ৪ শতাংশ হারে অর্থ কেটে রাখা হয়। এছাড়া সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেও বছরে ১০০ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে, যার মধ্যে ৭০ টাকা অবসর তহবিলে এবং ৩০ টাকা কল্যাণ তহবিলে জমা হয়। বাকি অর্থ সরকারি সহায়তা ও তহবিলের বিনিয়োগ থেকে অর্জিত আয় দিয়ে সমন্বয় করা হয়। অথচ নিজেদের জমানো অর্থ পেতেই বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হচ্ছে শিক্ষক-কর্মচারীদের।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, বাজেট সংকটকে অজুহাত হিসাবে দাঁড় করিয়ে শিক্ষক-কর্মচারীদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যায় না। দীর্ঘদিন ধরে তহবিল ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত দুর্বলতা ও পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাবের কারণেই এই সংকট তৈরি হয়েছে।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ যুগান্তরকে বলেন, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রাপ্য অর্থ সময়মতো পরিশোধ না হওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এতে শিক্ষক সমাজের মনোবল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মেধাবীরা শিক্ষা পেশার প্রতি আগ্রহ হারাতে পারেন।
অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকরা জানান, শিক্ষার আলো ছড়িয়ে জীবনের প্রায় পুরোটা সময় কাটানোর পর বৃদ্ধ বয়সে এসে তারা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। চাকরি ছাড়ার পর অধিকাংশেরই নিয়মিত আয়ের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। প্রাপ্য অর্থ না পাওয়ায় অনেকেই চিকিৎসা, সন্তানের উচ্চশিক্ষা, মেয়ের বিয়ে কিংবা ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের মতো প্রয়োজনীয় কাজ করতে পারছেন না।
সম্প্রতি শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, ২০২২ সাল থেকে আটকে থাকা অবসরপ্রাপ্ত বেসরকারি শিক্ষক ও কর্মচারীদের অবসর সুবিধার বকেয়া অর্থ আগামী ২ বছরের মধ্যে পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের ঘোষণার চেয়ে বাস্তবায়নই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান ও কার্যকর পরিকল্পনা ছাড়া দীর্ঘদিনের এই সংকট কাটানো সম্ভব নয়।








