বিশ্বকাপ ফাইনালের মঞ্চ। যেখানে ফুটবলাররা স্বপ্ন লেখেন, ইতিহাস গড়েন, কিংবদন্তি হয়ে ওঠেন। কিন্তু এই একই মঞ্চে এমন কিছু মুহূর্তও জন্ম নিয়েছে, যা চিরকাল থেকে গেছে লজ্জার স্মৃতি হয়ে।

২০২৬ বিশ্বকাপ ফাইনালে সেই তালিকায় যোগ হলো নতুন একটি নাম। আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার এনজো ফার্নান্দেজ লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়ার মধ্য দিয়ে বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে বহিষ্কৃত ফুটবলারদের ছোট্ট কিন্তু কুখ্যাত তালিকার সর্বশেষ সদস্য হয়ে গেলেন।

শুধু তাই নয়, এনজোর এই বহিষ্কার আর্জেন্টিনার জন্যও এনে দিয়েছে এক অনাকাঙ্ক্ষিত রেকর্ড। বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি লাল কার্ড দেখার রেকর্ড এখন এককভাবে আর্জেন্টিনার। বিশ্বকাপ ফাইনালে এনজোর আগে মাত্র পাঁচজন ফুটবলার লাল কার্ড দেখেছিলেন। প্রত্যেকের গল্পই ভিন্ন, কিন্তু শেষটা একই, অপূর্ণতা আর আক্ষেপে ভরা।

১৯৯০ সালের ফাইনালেই প্রথমবারের মতো লাল কার্ডের ঘটনা ঘটে। আর্জেন্টিনার পেদ্রো মনসন বদলি হিসেবে মাঠে নেমেছিলেন মাত্র ২০ মিনিট আগে। এরপর পশ্চিম জার্মানির স্ট্রাইকার ইউর্গেন ক্লিন্সমানের ওপর উঁচু ট্যাকল করে সরাসরি লাল কার্ড দেখেন। ক্লিন্সমান নাটকীয়ভাবে ফাউল আদায়ে পরিচিত ছিলেন, কিন্তু সেটিও মনসনকে ইতিহাসের প্রথম বহিষ্কৃত ফাইনাল খেলোয়াড় হওয়া থেকে আটকাতে পারেনি।

সেই ম্যাচেই আরেক আর্জেন্টাইন গুস্তাভো দেজোত্তি দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন। ইউর্গেন কোলারের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কির ঘটনায় দ্বিতীয়বার সতর্ক হওয়ার পর তাকেও বিদায় নিতে হয়। ফলে একই বিশ্বকাপ ফাইনালে দুই খেলোয়াড় লাল কার্ড দেখার বিরল ঘটনা ঘটে।

এরপর ১৯৯৮ সালের ফাইনালে ফ্রান্সের মার্সেল দেসাইও সেই তালিকায় নাম লেখান। স্বাগতিক ফ্রান্স সেদিন জিনেদিন জিদানের জোড়া গোলে প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের পথে ছিল। কিন্তু দেসাই দুইবারই ব্রাজিলের ডিফেন্ডার কাফুকে ফাউল করে দুটি হলুদ কার্ড দেখেন এবং মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন।

ম্যাচ শেষে ডোপ টেস্টের জন্য তাকে আলাদা কক্ষে নিয়ে যাওয়া হলে তিনি থাকতে রাজি হননি। পরে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে দেসাই বলেছিলেন, তিনি ভয়ে ছিলেন, যদি ফ্রান্স ম্যাচটি হেরে যায় তাহলে সবাই তাকে দোষ দেবে। শেষ পর্যন্ত ফ্রান্স ৩-০ ব্যবধানে জিতে যাওয়ায় স্বস্তি ফিরে পান তিনি।

বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত লাল কার্ডের ঘটনাটি আসে ২০০৬ সালের ফাইনালে। ফ্রান্স অধিনায়ক জিনেদিন জিদান নিজের ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচে ইতালির মার্কো মাতেরাজ্জিকে মাথা দিয়ে আঘাত করেন। অতিরিক্ত সময়ে ঘটে যাওয়া সেই ঘটনা রেফারি সরাসরি না দেখলেও চতুর্থ কর্মকর্তার সহায়তায় জিদানকে লাল কার্ড দেখানো হয়।

পরে ম্যাচের রেফারি হোরাসিও এলিসোন্দো জানান, লাল কার্ড দেখানোর সময় জিদান তাকে বলেছিলেন, "শান্ত থাকুন, লাল কার্ড ঠিকই দিয়েছেন। কিন্তু তার আগে কী হয়েছিল, সেটা কি আপনি দেখেননি বা শোনেননি?"

সেদিন ট্রফির পাশ দিয়ে মাথা নিচু করে মাঠ ছাড়েন জিদান। শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে শিরোপা জিতে নেয় ইতালি। তবে জিদানের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন তৎকালীন ফরাসি প্রেসিডেন্ট জ্যাক শিরাকও।

২০১০ সালের ফাইনালে নেদারল্যান্ডসের জন হেইটিঙ্গা হন সর্বশেষ বহিষ্কৃত ফুটবলার। স্পেনকে শারীরিকভাবে চাপে ফেলতে গিয়ে ডাচরা পুরো ম্যাচজুড়ে কঠোর ফুটবল খেলেছিল। ইংল্যান্ডের রেফারি হাওয়ার্ড ওয়েব সেই ম্যাচে মোট ১৪টি হলুদ কার্ড দেখান।

হেইটিঙ্গা দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন। আর যে আন্দ্রেস ইনিয়েস্তাকে ফাউল করার কারণে তিনি বহিষ্কৃত হয়েছিলেন, সেই ইনিয়েস্তাই কয়েক মিনিট পর স্পেনের হয়ে জয়সূচক গোল করে বিশ্বকাপের ট্রফি নিশ্চিত করেন।

১৬ বছর পর সেই তালিকায় নতুন নাম এনজো ফার্নান্দেজ। বিশ্বকাপ ফাইনালে লাল কার্ডের ইতিহাস খুব বড় নয়, কিন্তু প্রতিটি ঘটনার মতোই এনজোর বহিষ্কারও স্মরণীয় হয়ে থাকবে। কারণ বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় মঞ্চে নায়ক হওয়ার সুযোগ যেমন থাকে, তেমনি এক মুহূর্তের ভুল একজন ফুটবলারকে ইতিহাসের অন্য এক অধ্যায়েও ঠাঁই করে দিতে পারে।