মাদক কারবারিদের অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান ও তদন্ত চালাচ্ছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। বলা হচ্ছে, মাদক কারবারের আর্থিক ভিত্তি ধ্বংস করাই এর লক্ষ্য। সংস্থা দুটির অনুসন্ধানে এ পর্যন্ত ৩৩৫ জন মাদক কারবারির অর্থ পাচারের তথ্য উঠে এসেছে। এর মধ্যে ১৭২ জনের বিরুদ্ধে অর্থ পাচার আইনে মামলা করে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। আদালতের নির্দেশে মাদক কারবারের মাধ্যমে অর্জিত বাড়ি, গাড়ি, জমি ও ব্যাংকে থাকা অর্থসহ ২০০ কোটি টাকার বেশি অর্থসম্পদ জব্দ ও ক্রোক করা হয়েছে।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, অনুসন্ধানের আওতায় থাকা মাদক কারবারিদের অনেকের দৃশ্যমান কোনো বৈধ আয় নেই। অথচ প্রতিবছর তাঁদের সম্পদ বাড়ছে। সম্পদের বৈধ উৎসের কাগজপত্রও তাঁরা দেখাতে পারছেন না। তাই অনুসন্ধান চালিয়ে অবৈধ সম্পদের প্রমাণ পাওয়ার পর আদালতের নির্দেশে সেসব সম্পদ ক্রোক ও জব্দ করা হচ্ছে। এখনো যাঁদের নামে মামলা হয়নি, তাঁদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান বা মামলার প্রক্রিয়া চলমান। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, একই সঙ্গে সরকার মাদক কারবারিদের নতুন তালিকা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে।

সিআইডি পুলিশ জানিয়েছে, যাঁদের বিরুদ্ধে পাঁচ থেকে ২০টি বা তারও বেশি মাদকের মামলা রয়েছে, সম্পদ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিবেদনে মাদক কারবারি হিসেবে নাম রয়েছে, তাঁদের বিষয়ে অর্থ পাচারের অনুসন্ধান করা হচ্ছে। তাঁদের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন রয়েছে, এমন ব্যক্তিদের বিষয়েও তদন্ত করা হয়। সম্পদের হিসাব, আয়ের উৎস ও আয়কর নথি যাচাইয়ের পর অর্থ পাচার বা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের প্রমাণ মিললে মামলা করা হয়।

উপরের প্রক্রিয়ায় সারা দেশে ৩৯টি অর্থ পাচার মামলা করেছে সিআইডি। এর মধ্যে ২৪টি মামলার তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট। এসব মামলায় ১১৬ জনকে আসামি করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে এজাহারনামীয় ৭০ জন। তদন্তে নতুন করে সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে আরও ৪৬ জনের। আসামিদের মধ্যে ১৪ জন গ্রেপ্তার, ২০ জন জামিনে এবং বাকিরা পলাতক।

সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, অর্থ পাচার মামলার এসব আসামির ৩৭ দশমিক ৭২ একর জমি ও চারটি বাড়ি ক্রোক করা হয়েছে। এসব সম্পত্তির বাজারমূল্য প্রায় ২৫ কোটি ৫ লাখ টাকা। এ ছাড়া ৪৫ লাখ টাকা মূল্যের একটি নিশান এক্স-ট্রেইল জিপ এবং ব্যাংকে থাকা ১ কোটি ৯৩ লাখ ১৫ হাজার ৭০৫ টাকা জব্দ করা হয়েছে।

ক্রোক করা সম্পদের মধ্যে ঢাকার আদাবরের নুরুল ইসলামের জমি, গাড়ি ও স্বর্ণালংকার; খুলনার শফিক আলম ওরফে শফির প্রায় ৫ কোটি ১১ লাখ টাকার সম্পদ; পাবনার সাঁথিয়ার শাহীন আলমের ডুপ্লেক্স বাড়ি ও মার্কেট; কক্সবাজারের টেকনাফের ফজর আলী, নুরুল কবির ও সিদ্দিক আহমেদের প্রায় ৩ কোটি টাকার সম্পদ এবং গাজীপুরের টঙ্গীর পারুল বেগম ওরফে পারুলের জমি ও তিনতলা বাড়ি উল্লেখযোগ্য।

পারুল বেগম বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, মাদক কারবারের অর্থে সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের অভিযোগে আদালত তাঁর ৫৭ লাখ টাকা মূল্যের ১৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ জমি এবং প্রায় ১ কোটি টাকা মূল্যের তিনতলা বাড়ি ক্রোক করেছেন। অর্থ পাচার ছাড়াও পারুলের বিরুদ্ধে মাদক ও অস্ত্র আইনে আরও ৯টি মামলা রয়েছে। তাঁর স্বামী মানিক আত্মগোপনে।

টঙ্গী পূর্ব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাকসুদুল আলম বলেন, ‘পারুলের বাড়ি ক্রোক হয়েছে, সেটি আদালতের হেফাজতে রয়েছে। সিআইডি অর্থ পাচার মামলা তদন্ত করেছে, তারাই এখন পারুলের সম্পত্তি দেখভাল করছে।’

সিআইডির আরও ১৫টি অর্থ পাচার মামলার তদন্ত শেষ পর্যায়ে রয়েছে। মামলাগুলোতে ৩৫ একর জমি, ১২টি বাড়ি ও একটি গাড়ি ক্রোক বা বাজেয়াপ্ত করার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এসব সম্পদের বাজারমূল্য প্রায় ৩৭ কোটি ৩ লাখ টাকা।

পাবনার সাঁথিয়ার মাদক কারবারি শাহীন আলমের বিরুদ্ধে অর্থ পাচার মামলার তদন্ত চলছে। আদালতের নির্দেশে এরই মধ্যে তাঁর প্রায় ৭ কোটি টাকার সম্পদ ক্রোক করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ডুপ্লেক্স বাড়ি, মার্কেট এবং বিভিন্ন ব্যাংকের ১০টি হিসাবে থাকা ৪২ লাখ ৪৩ হাজার ৩৮৭ টাকা। শাহীনের বিরুদ্ধে মাদক ও অস্ত্র আইনে ছয়টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে একটি অস্ত্র মামলায় গত জুলাইয়ে পাবনার একটি আদালত তাঁকে ১২ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন।

সিআইডি এর বাইরে আরও ৬৮টি অভিযোগের অনুসন্ধান করছে। এসব অভিযোগে ১৬৬ জনের বিরুদ্ধে অর্থ পাচার ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের কথা বলা হয়েছে। এই ব্যক্তিদের প্রায় ৬৪ কোটি ৪৬ লাখ টাকার সম্পদ বাজেয়াপ্তের প্রক্রিয়া চলছে। অর্থাৎ ১১৬ জন অভিযোগপত্রভুক্ত ও ১৬৬ জন তদন্তাধীনসহ মোট ২৭৬ মাদক কারবারির প্রায় ১২৮ কোটি ৪৭ লাখ ১৫ হাজার টাকার অবৈধ সম্পদ জব্দ বা বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে বা এর জন্য উদ্যোগ নিয়েছে সিআইডি।

সিআইডির ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের অতিরিক্ত ডিআইজি মুহাম্মদ বাছির উদ্দিন আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণে শুধু মাদক উদ্ধার বা গ্রেপ্তার নয়, এর আর্থিক ভিত্তি ধ্বংস করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সেই লক্ষ্যেই মাদক কারবারের অর্থের উৎস, লেনদেনের ধরন এবং অর্থ পাচারের নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করে ধারাবাহিক তদন্ত চলছে।’

অন্যদিকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) বর্তমানে মাদক কারবারি হিসেবে অভিযুক্তদের ৩৫টি অর্থ পাচারের বিষয়ে অনুসন্ধান করছে। এর মধ্যে ৯টি মামলা করেছে সংস্থাটি। চারটি মামলায় ছয়জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। বাকি পাঁচটি মামলা তদন্তাধীন এবং ২৬টি অভিযোগে ৫৩ জনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চলছে। অভিযোগপত্র দেওয়া চারটি মামলায় প্রায় ১৩৯ কোটি টাকা পাচারের প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছে ডিএনসি।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পুলিশ, বিজিবি, ডিএনসি ও একটি গোয়েন্দা সংস্থা মাদক কারবারিদের বিভিন্ন তালিকা করেছিল। বিজিবির তালিকায় ৩ হাজার ৯৬৪ জন, পুলিশের তালিকায় ১৯ হাজার ৪৫ জন এবং একটি গোয়েন্দা সংস্থার তালিকায় ২০ হাজার ৮৯১ জনের নাম রয়েছে। একই ব্যক্তি একাধিক তালিকায় থাকায় সংস্থাগুলোর ধারণা, দেশে প্রকৃত মাদক কারবারির সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার। তাদের মধ্যে গডফাদার ১ হাজার ৬২০ জন, পাইকারি পর্যায়ে ৬ হাজার ২২৭ জন এবং খুচরা পর্যায়ে ১৩ হাজার ৪৪ জন সক্রিয়।

তবে ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকার নতুন করে মাদক কারবারিদের তালিকা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। ৭ আগস্ট নিজের নির্বাচনী এলাকা কক্সবাজারে মাদক প্রতিরোধ ও আইনশৃঙ্খলা উন্নয়নসংক্রান্ত সভায় অংশ নেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। সেদিন সভার পর তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘মাদকের মূল হোতাদের দমনে কোনো ধরনের আপস করা হবে না। শীর্ষ মাদক কারবারিদের একটি নির্মোহ তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। টাস্কফোর্সের মাধ্যমে তালিকা চূড়ান্ত করার পর তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’