প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক, মাধ্যমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক থেকে উচ্চশিক্ষার প্রতিটি স্তরে যে অবহেলা ও দীনতা চলছে, তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা ও কর্মসংস্থানের ওপর। শিক্ষার্থীরা বড় ধরনের শিখন ঘাটতি নিয়ে ওপরের শ্রেণিতে উঠছে এবং ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের সংখ্যাও আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।
দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনে ক্যাডেট কলেজের আদলে ৬০০ মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। প্রতিটি সংসদীয় আসনে ছেলে ও মেয়েদের জন্য একটি করে আবাসিক সরকারি স্কুল অ্যান্ড কলেজ গড়ে তোলা হবে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে। প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য প্রায় তিন একর জমি প্রয়োজন হবে। জমি অধিগ্রহণে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া ৬০০টি একাডেমিক ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি ভবন হবে ১০ তলাবিশিষ্ট এবং প্রতিটির সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৮০ কোটি টাকা। এই খাতে মোট ব্যয় হবে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা। শিক্ষার্থীদের জন্য মোট ৬০০টি হোস্টেল নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রতিটি হোস্টেল নির্মাণের ব্যয় ১০ কোটি টাকা। পাশাপাশি ৬০০টি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ল্যাব স্থাপনে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা। যেন এক মহাযজ্ঞ!
যাঁরা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পান তাঁদের দেশের প্রতিটি বিষয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা থাকা প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি। সরকারের যাঁরা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাঁদের নিশ্চয়ই জানা আছে, দেশে ক্রমেই চাষকৃত জমি কমে যাচ্ছে। দিন দিন জমি কমে গেলেও তা নিয়ে কারও কোনো চিন্তা দেখা যাচ্ছে না। যেভাবেই হোক প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রশ্ন হলো, দেশে নতুন করে এত অর্থ ব্যয় করে কেন এতগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ করতে হবে? দেশে তো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভাব নেই আর সেগুলোতে কি শিক্ষার্থীদের সংকুলান হচ্ছে না?
দেশের বড় কলেজগুলোর প্রতিটিতে অনেক জমি পড়ে আছে, সেসব জায়গায় নতুন নতুন বিভাগ ও বিল্ডিং তৈরি করে বহু শিক্ষার্থীর ভর্তির সুযোগ এবং সুন্দর আবাসিকেরও ব্যবস্থা করা যায়। সেসব বাদ দিয়ে জেলায় জেলায় ধানি জমি নষ্ট করে ছোট ছোট কলেজের মতো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বানানো হয়েছিল, অনেকগুলোতে কাজ শুরু হয়েছিল পূর্ববর্তী সরকারের আমলে। এর আসল উদ্দেশ্য কারোরই অজানা নয়। অহেতুক উচ্চশিক্ষার নামে বেকার তৈরির কারখানার জন্য জনগণের টাকা অপচয় করার অধিকার কারোরই নেই। কিন্তু কে শোনে কার কথা। দেশের জমি নষ্ট হবে, কিছু কর্তাব্যক্তি লাভবান হবেন আর দেশের ও জনগণের টাকা অপচয়, তাতে রাষ্ট্রের খুব একটা কিছু আসে-যায় না। সরকারি প্রকল্পগুলো দেখলে তা-ই মনে হয়।
শিক্ষিত বেকারে দেশ ছেয়ে যাচ্ছে। এবার অর্ধেক শিক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় বসেনি, এগুলো যেন শিক্ষার সমস্যা নয়। সমস্যা হচ্ছে কারিকুলাম, নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন আর নতুন মডেল কলেজ তৈরি করা। কোথায় সমস্যা আর আমরা কী চিন্তা করি? মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সরকারি পর্যায়ে ‘সেন্টার অব এক্সিলেন্স’ গড়ে তোলাই এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য। দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চমানের শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে এসব প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রীয় হাজার হাজার কোটি টাকা দিয়ে এসব প্রতিষ্ঠান বানালেই যেন শিক্ষার সব সমস্যা দূর হয়ে যাবে।
সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী, শিক্ষাক্ষেত্রে সামাজিক ও ভৌগোলিক বৈষম্য কমানো এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে নাকি এই বিশাল প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেটি কি এভাবে? রাষ্ট্রীয় এত অর্থ ব্যয় করে বিদ্যমান মূল সমস্যাগুলোকে পাশ কাটিয়ে এগুলো করা কতটা যুক্তিসংগত!
পিছিয়ে পড়া এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারের এত চিন্তা, খুবই ভালো মনে হচ্ছে। অথচ বহু বছর যাবৎ লিখে যাচ্ছি, সরকার যে পদ্ধতিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারি করছে, তাতে পিছিয়ে পড়া এলাকা ও জনগণ আরও বঞ্চিত হচ্ছে। যেমন যখন কোনো বিদ্যালয় সরকারি করা হয়, তখন করা হয় অপেক্ষাকৃত সচ্ছল ও শহরকেন্দ্রিক বিদ্যালয়, যাতে সরকারের তেমন একটা অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে না হয়। এ হচ্ছে তেলে মাথায় তেল দেওয়া। আমি বারবার বলেছি, গ্রাম ও পিছিয়ে পড়া এলাকার বিদ্যালয়গুলো সরকারি করতে হবে। গ্রামীণ ও পিছিয়ে পড়া এলাকায় ভালো শিক্ষকেরা যেতে চান না। এসব এলাকার সরকারি-বেসরকারি যেকোনো বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন দ্বিগুণ করে দিতে হবে।
মাউশির পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন শাখার এক গবেষণার তথ্যমতে, মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা ইংরেজি ও গণিতে দক্ষতা অর্জনে বেশ পিছিয়ে। এমনকি বাংলায়ও শিক্ষার্থীদের অবস্থা কাঙ্ক্ষিত মানের নয়। মূলত বিদ্যালয়গুলোতে ঠিকমতো পড়াশোনা না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা কোচিং ও গৃহশিক্ষকের দ্বারস্থ হতে বাধ্য হয়। তাই ৬০০ মডেল বিদ্যালয় বানালেই কি দেশের সব শিক্ষার্থীর দক্ষতা অর্জন সম্ভব হবে?
দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর প্রায় অর্ধেকে প্রধান শিক্ষক নেই। এ সমস্যা বছরের পর বছর ধরে চলছে। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক-শিক্ষিকার অনুমোদিত পদ ১৫ হাজার ২৯৩টি। এর মধ্যে ২ হাজার ৮৪২টি পদ শূন্য অর্থাৎ ১৮ শতাংশের বেশি পদে শিক্ষক নেই। আর বেসরকারির অবস্থা কী, সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। দেশে বর্তমানে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৭০২টি। এর মধ্যে ৩৮৩টি বিদ্যালয়েই প্রধান শিক্ষক নেই। সহকারী প্রধান শিক্ষকের ২৪৯টি পদ শূন্য। এতে একদিকে যেমন বিদ্যালয়গুলো নেতৃত্বের সংকটে ভুগছে, অন্যদিকে প্রয়োজনীয়সংখ্যক বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীদের অনেক বিষয়েই শিখন ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।
২০ হাজার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে যে দেশের ৮০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে তাদের অবস্থা তো কেউ জানে না। শুধু ৭০২টি সরকারি স্কুলের কথাই আমরা বলছি। বেসরকারিগুলোর যে কী করুণ অবস্থা, সেটি আমরা জানি না।
প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক, মাধ্যমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক থেকে উচ্চশিক্ষার প্রতিটি স্তরে যে অবহেলা ও দীনতা চলছে, তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা ও কর্মসংস্থানের ওপর। শিক্ষার্থীরা বড় ধরনের শিখন ঘাটতি নিয়ে ওপরের শ্রেণিতে উঠছে এবং ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের সংখ্যাও আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পাস করে কর্মক্ষেত্রের জন্য উপযোগী মানবসম্পদ হয়ে উঠতে তারা ব্যর্থ হচ্ছে। এসব সমস্যার কথা আলোচনা না করে, এগুলোর জন্য কোনো একটি ব্যবস্থা না করে ৬০০ মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণের প্রয়োজন কতটুকু?
সবচেয়ে বড় কথা হলো, রাষ্ট্র পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে সরকার প্রকৃত পড়ালেখার জন্য কতটা ও কী বাস্তবায়ন করতে পেরেছে? সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ব্যতিক্রমী কিছু শিক্ষক যেসব প্রতিষ্ঠানে আছেন তাঁরা নিজেদের প্রচেষ্টায় কিছু করছেন, কিন্তু বাকিগুলোর কী অবস্থা? ভালো পরিবারের কোনো অভিভাবকই তাঁদের সন্তানদের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াতে চান না। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলো, বিশেষ করে জিলা স্কুল আর ল্যাবরেটরি স্কুলগুলোর কী অবস্থা? ক্লাসে শিক্ষার্থী নেই, তারা সব বাসায়। সে অর্থে সরকারি আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সেভাবে পড়ালেখা হয় না। সরকারি পর্যায়ে নেই অন্তত আদর্শিক অবস্থায়। আবার ক্যাডেট কলেজগুলো যদি সেনাসদরের অধীনে না থাকত, তাহলে সেখানে তো বিড়ি-সিগারেটের আড্ডা আর পার্টি আর লাঠিতন্ত্রের চর্চা হতো। তাও একেক সময় একেক সরকার এসে সব ওলটপালট করে দিতে চায়। কারণ, সেখানে যা ইচ্ছে তাই তারা করতে পারছে না। আমরা জানি, প্রয়াত তোফায়েল আহমেদ এই কলেজগুলোতে ছাত্ররাজনীতি চালু করতে চেয়েছিলেন, পারেননি বলে পুরো ক্যাডেট কলেজের চেহারা পাল্টে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কিছু দেশপ্রেমিক ক্যাডেট ও সেনা অফিসার বহু কষ্ট করে সেই বাধা অতিক্রম করতে পেরেছিলেন। বাকি যেসব আবাসিক প্রতিষ্ঠান বা আধা আবাসিক প্রতিষ্ঠান একটু বড় আকারের আছে সবগুলোতে যেমন ঢাকা রেসিডেনসিয়াল, রাজউক কলেজ, বিসিআইসি কলেজে সেনা অফিসার বসানো হয়েছে। কিন্তু তাঁরা না পারছেন পুরো আর্মি কায়দায় কিছু করতে, না পারছেন পুরো সিভিলিয়ান প্রতিষ্ঠানের মতো চালাতে। এক মধ্যবর্তী অবস্থায় চলছে। সরকার যে ক্যাডেট কলেজের আদলে ৬০০ বিদ্যালয় চালুর চিন্তা করছে, তাদের চিন্তায় এসব ধারণা কতটা কীভাবে আছে আমার জানা নেই।
ক্যাডেট কলেজ ক্যাডেট কলেজই। সেই আদলে কিছু করা মানে ক্যাডেট কলেজ নয়, আবার আদর্শিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও নয়। এ নিয়ে গভীর চিন্তা করা প্রয়োজন। এটি হঠাৎ করে কিছু করার বিষয় নয়।
লেখক: সাবেক অধ্যাপক, মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজ






