ব্রিটিশ আমলে ১৮৭০ সালে দেশের বৃহত্তম সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানাটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এখনো শহরের ভেতরে অনেক লাল বিল্ডিং চোখে পড়ে। একসময় এই উপজেলা শহরে হাজার হাজার মানুষ রেল কারখানায় কাজ করত। তবে কারখানাটির এখন আর সেই জৌলুশ নেই। শ্রমিক, কর্মকর্তার সংখ্যা কমে এখন হাজারের নিচে দাঁড়িয়েছে।

কারখানার কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাঁদের পরিবারের আবাসন নিশ্চিতে নির্মাণ করা হয় ২ হাজার ৬৭০টি স্টাফ কোয়ার্টার। এর মধ্যে ১৫০টি বাংলো ও ৭০০টি দ্বিকক্ষবিশিষ্ট কোয়ার্টার। সেই কোয়ার্টারে সুপেয় পানি সরবরাহের জন্য শহরের বিভিন্ন স্থানে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ৮টি গভীর নলকূপ এবং ৫০ হাজার লিটার ধারণক্ষমতাসম্পন্ন ৮টি ওভারহেড পানির ট্যাংক স্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু ৪০ বছর আগে সেগুলো ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। এরপর অনেক আগেই পাম্পহাউসগুলোতে জন্মেছে বড় বড় আগাছা ও পরগাছা। দীর্ঘদিন ধরে কোনো সংস্কার না করায় বিশালাকার লোহার ওভারহেড পানির ট্যাংক এবং ভূগর্ভস্থ সরবরাহ পাইপগুলোতে মরিচা ধরে ক্ষয়ে গেছে। অনেক জায়গায় মূল্যবান কলকবজা ও যন্ত্রাংশ চুরি হয়ে গেছে।

এর চেয়েও দুঃখজনক বিষয় হলো, রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে পাম্পহাউসসহ চারপাশের মূল্যবান রেলের জমি স্থানীয় প্রভাবশালী ও অবৈধ দখলদারদের কবলে চলে গেছে। রাষ্ট্রীয় সম্পদের এমন প্রকাশ্য অপচয় এবং বেদখল কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

বর্তমানে কারখানাসহ রেলের বিভিন্ন দপ্তরে প্রায় ৮৭০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত আছেন, যাঁদের অধিকাংশই পরিবার নিয়ে এসব কোয়ার্টারে বসবাস করেন। আধুনিক নাগরিক জীবনের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো সুপেয় পানির নিশ্চয়তা। কিন্তু তাঁদের প্রতিদিনের সাংসারিক কাজের জন্য দূরদূরান্ত থেকে ভোগান্তি সয়ে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। অনেকে বাধ্য হয়ে নিজস্ব খরচে টিউবওয়েল বসিয়েছেন।

সবচেয়ে বড় অবিচার হলো, রেলওয়ে প্রশাসন পানি দিতে ব্যর্থ হলেও প্রতি মাসে কর্মচারীদের বেতন থেকে নিয়মিত বাসাভাড়ার সঙ্গে পানির বিল ঠিকই কেটে নিচ্ছে। পানি না দিয়ে বিল কেটে নেওয়ার এই সংস্কৃতি কেবল অন্যায়ই নয়, বরং চরম অমানবিকও।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য হলো, জনবলসংকটের কারণেই মূলত এই পাম্পগুলো চালানো যাচ্ছে না। কিন্তু একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান চার দশক ধরে জনবলসংকটের অজুহাতে কোটি কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট করে রেখে কর্মচারীদের পানি থেকে বঞ্চিত করা কোনো যৌক্তিক হতে পারে না। এটি মূলত প্রশাসনের চরম উদাসীনতা ও দায়িত্বহীনতারই বহিঃপ্রকাশ।

এখন দরকার হলো, রেলওয়ের এই বিশাল রাষ্ট্রীয় সম্পদকে পুরোপুরি ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা এবং কোয়ার্টারের বাসিন্দাদের সুপেয় পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

আমরা মনে করি, এই সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য অবিলম্বে সরকারের উচ্চপর্যায়ের সরাসরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দের মাধ্যমে যথেষ্ট লোক নিয়োগ দিয়ে পাম্প ও ট্যাংকগুলো সংস্কার করে সচল করতে হবে। এতে করে পানির সংকটের সমাধান করা সম্ভব। যাঁরা এখনো ঐতিহ্যবাহী এ কারখানাটিকে সচল রেখেছেন, তাঁদের জীবনযাত্রাকে অচল করে রেখে রেলের উন্নয়ন কখনোই সম্ভব নয়।