মালয়েশিয়া ও চীন সফরে অভূতপূর্ব সাফল্যের দাবি করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ধন্যবাদ জানিয়ে প্রস্তাব গ্রহণ করেছে জাতীয় সংসদ। আজ শনিবার সকালে সর্বসম্মতিক্রমে এই প্রস্তাব গৃহীত হয়। গত ২১ থেকে ২৬ জুন মালয়েশিয়া ও চীন সফর করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল শুক্রবার রাতে প্রধানমন্ত্রী চীন থেকে দেশে ফেরেন।
শনিবার বৈঠকের শুরুতে ধন্যবাদ প্রস্তাব উত্থাপন করেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তাঁর আনা প্রস্তাবটি সংক্ষিপ্ত আলোচনা শেষে ভোটে দেন স্পিকার। পরে সেটি সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়। তবে ওই সময় সংসদ কক্ষে উপস্থিত ছিলেন না প্রধানমন্ত্রী।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, এ সফরটি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বাংলাদেশের সঙ্গে মালয়েশিয়া ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়েছে। অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে তিনি (প্রধানমন্ত্রী) এ সফরে অনেকগুলো চুক্তি সম্পন্ন করেছেন। দুই দেশের সঙ্গে পারস্পরিক মর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়েছে।
তিনি বলেন, দীর্ঘ ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগ্রামে নেতৃত্বদানের পর জনগণের দ্বারা নির্বাচিত আমাদের নেতা জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে নিজের একটা অবস্থান তৈরি করে ফেলেছেন। বাংলাদেশের মানুষ তাঁর সম্পর্কে ধারণা সৃষ্টি করেছেন, তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে জনতার কল্যাণে কাজ করছেন। পুরোনো সমস্ত খারাপ বাদ দিয়ে নতুন দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছন।
‘ফ্যাসিবাদের’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিদেশে যাওয়ার সময় ও দেশে ফিরে সংবর্ধনা নিতেন উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানান, প্রধানমন্ত্রী এটি বন্ধ করেছেন। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন কোনো ধরনের সংবর্ধনা দেওয়া যাবে না।
মালয়েশিয়া ও চীন সফরে প্রধানমন্ত্রীর সফলতা অনেক বলেও জানান বিএনপির মহাসচিব। তিনি বলেন, চীনের সঙ্গে ১৭টি এমওইউ হয়েছে। গণচীনের রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ বৈঠক করেছেন, অত্যন্ত হৃদ্যতার সঙ্গে এসব বৈঠক হয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে মালয়েশিয়া ও গণচীনের সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে তাঁরা তাঁদের ভূমিকা অক্ষুণ্ন রাখবেন। শুধু তাই নয়, তাঁরা এটাকে আরও বাড়াবেন, সম্প্রসারিত করবেন। আমাদের যে সমস্যা রয়েছে, সেগুলো সমাধানে চেষ্টা করবেন। এমনকি রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে তাঁরা ইঙ্গিত দিয়েছেন। সে ব্যাপার উদ্যোগ নেবেন বলে জানিয়েছেন।
এ কারণে প্রধানমন্ত্রীর জন্য সংসদে ধন্যবাদ প্রস্তাব আনেন মির্জা ফখরুল।
প্রস্তাবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আমি মালয়েশিয়া ও চীন সফরে অভূতপূর্ব সফলতার জন্য প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতাকে ধন্যবাদ জানাতে প্রস্তাব জানাচ্ছি।
পরে প্রস্তাবটির বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে কালচারাল পরিবর্তন প্রধানমন্ত্রী শুরু করেছেন। উনি যাওয়া বা আসার সময় বিমানবন্দরে হাজার লোকের সংবর্ধনা করেননি। এটা বিরাট কালচারাল পরিবর্তন বাংলাদেশে। প্রধানমন্ত্রী একটা মানদণ্ড নির্ধারণ করেছেন, আগামীর বাংলাদেশের রাজনীতি কী হবে।
প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফরের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, এ সফরের ছিল বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতির ওপর ভিত্তি করে, আমাদের দেশের সঙ্গে প্রতিটি দেশের সম্পর্ক হবে পারস্পরিক সম্মান, পারস্পরিক স্বার্থ, কারও হস্তক্ষেপ নয় এবং আমাদের নিজস্ব সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে। প্রধানমন্ত্রীর সফর সেটা প্রমাণ করেছেন। আমাদের অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্কের বেঞ্চমার্ক নিশ্চিত করেছেন, যেটা বিএনপির রাজনীতিতে সব সময় ছিল। যেটা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান স্টাবলিশ করেছেন— প্রত্যেকটা দেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক হবে এই মানদণ্ডের ওপর। আমরা কোথাও কম্প্রোমাইজ করব না। আমাদের দেশের সঙ্গে প্রত্যেকটা দেশের যে সম্পর্ক রয়েছে, সেটা অর্থনৈতিক বা অন্য কোনো যা হোক। সেই সম্ভাবনাকে সম্পূর্ণ কাজে লাগিয়ে আমার স্বার্থে, দেশ ও জনগণের স্বার্থে কাজে লাগানোর জন্য বহু পাক্ষিক পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছি। বিএনপির রাজনীতির শুরু থেকে। সেটা উনি অব্যাহত রেখেছেন।
মালয়েশিয়াতে বাংলাদেশের শ্রম বাজার, এনার্জি এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক স্বার্থ রয়েছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, চায়নার সঙ্গে বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়ন স্বার্থ, তারা আমাদের বড় বাণিজ্যিক অংশীদার এবং এটাকে কীভাবে বাংলাদেশের স্বার্থে, চায়নার সঙ্গে বাণিজ্যিক ঘাটতি কীভাবে কমানো যায়, রপ্তানি বাড়াতে পারি সেই ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী এ সফরে যে বেঞ্চমার্ক স্থাপন করেছেন, এটা আগামীর বাংলাদেশের রাজনীতি শুধু নয়; বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কি হবে, তা নিশ্চিত করেছেন।
বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান প্রস্তাবে সমর্থন করে বলেন, এই দেশটা সবার। আমরা সকলে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির কথা বলে থাকি। আমরা সত্যিকার সত্যিকার অর্থে একটি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি দেখতে চাই, বাস্তবায়ন করতে চাই। এ ক্ষেত্রে বিরোধী দল হিসেবে আমাদের যেটুকু করণীয় আমরা সরকারকে আশ্বস্ত করছি আমরা সকল সহযোগিতা করব। সবকিছুর ওপর আমাদের প্রিয় দেশ। যে দুটি দেশের মধ্য দিয়ে তাঁর এ সফর শুরু হলো, দুটো দেশই আমাদের দীর্ঘদিনের বন্ধু, পরীক্ষিত বন্ধু।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ একটি আমদানিনির্ভর দেশ। আমাদের রপ্তানির চেয়ে আমদানি অনেক বেশি। আমাদের রপ্তানির দুই মূল খাত— তৈরি পোশাক ও ম্যানপাওয়ার (মানবসম্পদ), আমরা রপ্তানি বলি না তাদের পাঠিয়ে থাকি। এখানে বৈচিত্র্য করার যথেষ্ট সুযোগ আছে। সে জন্য সংক্ষিপ্ত, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার। আমি আশা করি, প্রধানমন্ত্রী তাঁর সফরে এ বিষয়গুলো মাথায় রেখে দুটি দেশের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করেছেন। যেহেতু আমরা সংসদীয় গণতন্ত্রের রাজনীতিতে আছি, ভালো হয় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে বিদেশের সঙ্গে যতগুলো মৌলিক চুক্তি সম্পাদিত হবে তা এই সংসদে নিয়ে আসা।
সংসদের দিকে ইঙ্গিত করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, এই সাড়ে তিন শ মানুষ সারা দেশের ১৮ বা ২০ কোটি মানুষের প্রতিনিধিত্ব করছি। তাঁরা যখন জানবেন, এর মধ্য দিয়ে সরকার ও জনগণের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি হবে। আমরা সবাই বলি ও চাই, আমাদের সম্পর্ক হবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমতার ভিত্তিতে। আমি আশা করি, তিনি সেই সতর্কতা অবলম্বন করেছেন। আমি আরও আশা করি, আমাদের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতিতে কেউ হস্তক্ষেপ করুক —এটা আমরা কখনো মেনে নেব না। দেশের স্বার্থ আগে। তারপর সমঝোতা স্মারক বা চুক্তি —যাই হোক সেটা হবে দুই দেশের স্বার্থের ভিত্তিতে। আমরা কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে চাই না। কিন্তু আমরাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে চাই না। এই ভারসাম্য রক্ষা করেই আগামীর পলিসি যেন পরিচালিত হয়।
প্রধানমন্ত্রীর সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা এবং তাঁর সরকারের সফলতাও কামনা করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, এই সংসদ যেন সকল কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু হয়। এই সংসদকে এড়িয়ে কিছুই যেন না হয়। সবকিছু হোক সংসদের ভেতরে। এই সংসদ আলো ছড়াক। আগামী দিনে জনগণ সরকারি দল ও বিরোধী দলের কার্যক্রমকে বিচার করেই সিদ্ধান্ত নেবে।
পরে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, প্রস্তাবটির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দল হতে সুচিন্তিত মতামত আমরা শুনতে পেয়েছি। সহজে অনুমেয় হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক চীন ও মালয়েশিয়া সফরটি পররাষ্ট্রনীতিতে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। এর ফলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা আরও সংহত হবে বলে মনে করি। বিশেষ করে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উন্নয়নের স্বপক্ষে অত্যন্ত বলিষ্ঠ পদক্ষেপ ছিল এ সফর। একই সঙ্গে আমাদের নিরাপত্তার প্রশ্নে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষিত হয়েছে। অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে ১৯৭১ সালে জাতি যুদ্ধ করে এ দেশটাকে স্বাধীন করেছে। তারপরে অনেক কঠিন সময় আমাদের পার করতে হয়েছে। এমন সরকার দেশের জনগণ দেখতে পেয়েছে, যারা দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রাখার জন্য কোনো প্রচেষ্টা গ্রহণ করেনি। বর্তমান সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রীর সফরের ফলে দেশের জনগণ আশান্বিত হয়েছে এবং সাধারণ মানুষও এ সফরটিকে সাফল্যের সঙ্গে সমাপ্ত করার জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছেন।
পরে প্রস্তাবটি কণ্ঠভোটে দেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। প্রস্তাবে বলা হয়, ‘সংসদের অভিমত এই যে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ২১ জুন থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত মালয়েশিয়া এবং চীন সফরে অভূতপূর্ব সাফল্যের জন্য এই মহান সংসদ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমানকে ধন্যবাদ জানাচ্ছে।’
এর পর কণ্ঠভোটে প্রস্তাবটি সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়।








