মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর নামে কয়েক বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠা রিক্রুটিং এজেন্সি মালিক ও সংশ্লিষ্টদের সম্পদের অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এ পর্যন্ত দায়ের করা মামলাগুলোর তদন্তের অংশ হিসেবে ১০০ রিক্রুটিং এজেন্সির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ২৩২ জনকে সম্পদের বিবরণী দাখিলের নোটিশ পাঠানো হয়েছে। দুদকের তদন্ত-সংশ্লিষ্ট এক শীর্ষ কর্মকর্তা এ তথ্য জানিয়েছেন।  

সূত্র জানায়, মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের কাছ থেকে সরকার নির্ধারিত ব্যয়ের কয়েক গুণ বেশি অর্থ আদায়ের মাধ্যমে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠায় এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অভিযুক্তদের সম্পদের উৎস ও বৈধতা যাচাই করতেই সম্পদ বিবরণী চাওয়া হয়েছে।  

মালয়েশিয়া দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশি কর্মীদের অন্যতম প্রধান শ্রমবাজার। তবে এই বাজারকে কেন্দ্র করে সীমিতসংখ্যক রিক্রুটিং এজেন্সির একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নানান অভিযোগ ছিল। বিশেষ করে ২০২১ সালে শ্রমবাজার চালুর পর কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়ায় একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ ওঠে।

আরও পড়ুন

প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী / ফের চালু মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার, শিগগির বিনা খরচে কর্মী পাঠানো শুরু

দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, মালয়েশিয়া সরকার কখনোই নির্দিষ্টসংখ্যক এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী নেওয়ার শর্ত দেয়নি। কিন্তু বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সীমিতসংখ্যক রিক্রুটিং এজেন্সিকে সুযোগ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। এতে বাজারে প্রতিযোগিতা কমে যায় এবং কর্মীদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি হয়।  

সরকারিভাবে একজন কর্মীর মালয়েশিয়া যেতে ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল ৭৯ হাজার টাকা। কিন্তু বাস্তবে অনেক কর্মীকে সাড়ে চার লাখ থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত পরিশোধ করতে হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, অতিরিক্ত এই অর্থের বড় একটি অংশ সিন্ডিকেটের সদস্যদের কাছে গেছে।  

দুদকের হিসাবে, ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত চার বছরে কর্মীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত আদায় করা অর্থের পরিমাণ প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা। এই অর্থ আত্মসাতের অভিযোগেই গত বছরের মার্চ থেকে নভেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে কয়েক দফায় এসব মামলা দায়ের করা হয়।  

মামলাগুলোতে ১০০ রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক, পরিচালক ও সংশ্লিষ্ট ২৩২ জনকে আসামি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন বায়রার সাবেক সভাপতি বেনজীর আহমেদ, ব্যবসায়ী রুহুল আমিন স্বপন, সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, তার স্ত্রী কাশ্মীরি কামাল, মেয়ে নাফিসা কামাল, সাবেক সংসদ সদস্য মাসুদ উদ্দিন এবং নিজাম উদ্দিন হাজারীসহ আরও অনেকে। 

আরও পড়ুন

একটি হত্যা, শ্বাসরুদ্ধকর জবানবন্দি ও একটি মৃত্যু

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে মালয়েশিয়া শ্রমবাজারে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় আসে। পরে অন্তর্বর্তী সরকার বিষয়টি তদন্তের উদ্যোগ নেয়। এর ধারাবাহিকতায় দুদক পাঁচটি পৃথক অনুসন্ধান টিম গঠন করে অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা শুরু করে। 

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, মামলার পরবর্তী ধাপ হিসেবে এখন অভিযুক্তদের সম্পদের তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। তাদের নামে থাকা স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ, ব্যাংক হিসাব, শেয়ার, ব্যবসায়িক বিনিয়োগ এবং পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদের তথ্যও খতিয়ে দেখা হবে।  

দুদক সূত্র জানায়, অভিযুক্তদের আয়কর নথি ও ঘোষিত আয়ের সঙ্গে সম্পদের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, সেটিও যাচাই করা হবে। কোনো সম্পদের বৈধ উৎস পাওয়া না গেলে তা অবৈধ সম্পদ হিসেবে বিবেচনায় নেওয়া হতে পারে।  

দুদকের উপ-পরিচালক আকতারুল ইসলাম বলেন, মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগে গত বছর প্রায় একশটি মামলা করা হয়েছে। সেসব মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে অভিযুক্তদের সম্পদের তথ্য চেয়ে নোটিশ জারি করা হয়েছে।

এসএম/কেএসআর