রাজশাহীর দুর্গাপুরে বিএনপি ও ছাত্রদলের দুই নেতা এবং তাদের সহযোগীদের অব্যাহত চাঁদা দাবি, হামলা, ভাঙচুর ও নির্যাতনের ঘটনায় একটি পরিবার আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। সর্বশেষ মামলা তুলে না নেওয়ায় বিএনপি ও ছাত্রদল নেতার অনুসারীরা বুধবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে দোকান মালিক জাফর মণ্ডলকে শতাধিক মানুষের সামনে রশি দিয়ে গাছে বেঁধে নির্যাতন করেছেন। প্রাণের ভয়ে এলাকা ছেড়ে রাজশাহী শহরে অবস্থান নিয়েছেন মামলার বাদী জাফর।

দুর্গাপুরের দেলুয়াবাড়ি ইউনিয়নের পাঁচ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মুনছুর এবং ইউনিয়নটির ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ উঠেছে। মুনছুর ও রাকিব বাহিনীর সদস্যরা প্রথমে দোকান মালিক জাফরের কাছে এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। চাঁদা না দেওয়ায় দোকানে ভাঙচুর চালান। লুট করেন নগদ টাকা। হামলাকারীদের আক্রমণে আহত হন এক নারী। এ ঘটনায় গত ৩ জুন উপজেলার নামুদরখালি এলাকার দোকান মালিক জাফর মণ্ডল বিএনপি নেতা মুনছুর এবং ছাত্রদল নেতা রাকিবসহ ১২ জনের নামে দুর্গাপুর থানায় মামলা করেন। এরপর মামলা তুলে নেওয়ার জন্য অব্যাহতভাবে বাদীকে ভয়-ভীতি দেখাতে থাকেন মুনছুর ও রাকিব। আতঙ্কিত হয়ে বাদী জাফর মণ্ডল গত ৭ জুন রাজশাহীর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-২ এ আরেকটি মামলা করেন। প্রাণের ভয়ে গত একমাস ধরে দোকান খুলতে পারছেন না তিনি। থানায় দায়ের করা এজাহারে বাদী উল্লেখ করেন, ‘৩ জুন সন্ধ্যায় মুনছুর ও রাকিবের নির্দেশে মামলার আসামিরা এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। বাদী চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে মুদিখানা এবং চায়ের দোকানে দেশীয় অস্ত্র হাঁসুয়া, দা, কোদাল, শাবল ও বাঁশের লাঠি দিয়ে ভাঙচুর চালিয়ে দোকান মাটিতে গুঁড়িয়ে দেন আসামিরা। এ সময় দোকানে থাকা ৭০ হাজার টাকার বিভিন্ন পণ্য এবং নগদ ২০ হাজার নগদ টাকা লুট করেন। হামলা চলাকালে বাদীর ভাইয়ের স্ত্রী সালেহা বাধা দিতে গেলে তাকে শাবল দিয়ে আঘাত করা হয়। তিনি দুর্গাপুর স্বাস্থ্যকেন্দে চিকিৎসা নিয়েছেন।’ বাদী আরও জানান, থানায় মামলা দায়েরের পর থেকে বিএনপি নেতা মুনছুর ও ছাত্রদল নেতা রাকিব প্রতিনিয়ত বাদী ও সাক্ষীদেরকে ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন। এ ঘটনায় বাদী রাজশাহীর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-২ এ দায়ের করা আরেকটি মামলার এজাহারে উল্লেখ করেন, ‘আসামিরা যেখানেই বাদী এবং সাক্ষীদের পাবেন-সেখানেই হত্যা করে লাশ গুম করে ফেলবেন এবং বাদীর বাড়ি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেবেন বলে ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন। এ ঘটনায় বাদী ও তার পরিবারের সদস্যরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন।’

এদিকে সর্বশেষ বুধবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে নামুদরখালি উত্তরপাড়া মোড়ে মুনছুর ও রাকিবের নেতৃত্বে ১২ থেকে ১৪ জনের একটি দল ধারালো দেশীয় অস্ত্র নিয়ে দোকান মালিক জাফরকে ঘিরে ফেলেন। এ সময় মুনছুর ও রাকিবের নির্দেশে তাদের বাহিনীর সদস্যরা শতাধিক মানুষের সামনে জাফরকে একটি গাছের সাথে বেঁধে ফেলেন। এরপর দায়ের করা দুটি মামলা তুলে নেওয়ার জন্য জাফরকে মারধর করেন। এ সময় স্থানীয়রা গোপনে পুলিশকে ফোন দেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলে মুনছুর ও রাকিবসহ তাদের সহযোগীরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।

মামলার বাদী জাফর মণ্ডল বলেন, ‘এক লাখ টাকা চাঁদার দাবিতে আমার দোকানঘর ভেঙে ফেলেছে। দোকানের পণ্য ও নগদ টাকা লুট করেছে। দুটি মামলা তুলে নেওয়ার জন্য গাছের সাথে বেঁধে নির্যাতন করেছে। সবসময় আমাকে প্রাণে মেরে ফেলার জন্য অস্ত্র নিয়ে মহড়া দিচ্ছে মুনছুর ও রাকিবের ক্যাডাররা।’ তিনি বলেন, ‘আমি নিঃস্ব হয়ে গেছি। দোকান চালাতে না পারার কারণে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অনেক কষ্টে আছি। দোকান পুননির্মাণ করে চালাতেও পারছি না। জীবন বাঁচাতে এখন আমি রাজশাহী শহরে অবস্থান করছি।’ অভিযোগের বিষয়ে ছাত্রদল নেতা রাকিবকে ফোন দেওয়া হলে তিনি ধরেননি। তবে বিএনপি নেতা মুনছুর অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘দোকান ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে, এটি সত্য। তবে সে সময় আমি সেখানে ছিলাম না। চাঁদা দাবি, ভয়ভীতি দেখানো কিংবা প্রাণে মেরে ফেলে লাশ গুমের হুমকি দেওয়ার যে অভিযোগ আনা হচ্ছে, সেগুলো ভিত্তিহীন ও বানোয়াট। আর বুধবার রাতে কে বা কারা জাফরকে গাছে বেঁধে নির্যাতন করেছে, সেটি বলতে পারব না।’ দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পঞ্চানন্দ সরকার বলেন, মামলার তদন্ত চলছে। আসামিরা ইতোমধ্যে আদালত থেকে জামিন নিয়েছেন। বুধবার রাতে বাদীকে গাছে বেঁধে নির্যাতনের বিষয়টি জানার পর পুলিশ পাঠানো হয়েছে।’