দেরিতে সদরঘাট পৌঁছানোর কারণে হাতিয়া ভায়া মনপুরাগামী লঞ্চ ধরতে পারিনি। রাত ৮টার সময় বেতুয়াগামী তাশরিফে যাত্রা শুরু করলাম। সিঙ্গেল কেবিন ভাড়া ১ হাজার ২০০ টাকা। ডাবল কেবিন ২ হাজার ২০০ টাকা। ডেকের ভাড়া ৫০০ টাকার মতো। অর্ধজ্যোৎস্না রাতে মায়াবী নদী পার হতে বেশ ভালো লাগে। লঞ্চের মধ্যেই খাওয়া-দাওয়ার সুব্যবস্থা আছে। রাতজুড়ে চা ও হালকা নাশতার ব্যবস্থাও আছে। তৃতীয় তলায় কেবিন নিয়েছিলাম। নদী, চাঁদ আর আলো-আঁধারির দৃশ্য উপভোগ করার জন্য এক সারি বসার ব্যবস্থা আছে। ভোলা আমার প্রথম যাত্রা। বরিশালে লঞ্চে একবার গিয়েছিলাম। কী দারুণ রোমাঞ্চকর অনুভূতি। চাঁদ আর জলজ্যোৎস্না দেখতে দেখতে সকাল ৭টার দিকে বেতুয়া পৌঁছালাম। এরপর অটোরিকশায় নতুন স্লুইসঘাট। ২০ মিনিটে এখান থেকে উথাল-পাতাল মেঘনা পাড়ি দিয়ে স্পিডবোটে মনপুরা জনতার বাজারঘাট। ভাড়া জনপ্রতি ৩০০ টাকা। এখান থেকে একটি বাইক ১ হাজার ৫০০ টাকায় ভাড়া করে প্রায় চার ঘণ্টা ঘুরলাম মনপুরা দ্বীপ। ইচ্ছা করলে অটোরিকশা ভাড়া করে যেতে পারবেন। রাস্তাঘাট মাঝে-মধ্যে ভাঙাচোরা। বেড়িবাঁধ নির্মিত হয়ে গেলে মনপুরা ঘুরতে পর্যটকদের আর কষ্ট হবে না। ছায়া সুনিবিড় পল্লি ও মাঠ পেরিয়ে প্রথমেই পৌঁছলাম দখিনা হাওয়াই বিচ। এখানে ইচ্ছা করলে কেউ ক্যাম্প করে রাতযাপন করতে পারবেন। ঝাউবন নষ্ট হয়ে গেছে। এখানকার সি বিচ তেমন সমৃদ্ধ মনে হলো না। এরপর গ্রামীণপথ মাড়িয়ে চারাবাগান। দুপাশে সারি সারি গাছপালা মুগ্ধ করবে। পল্লিজুড়ে ফসলের মাঠ, ফাঁকা ফাঁকা বাসস্থান। বাসস্থানে গরু-ছাগল-হাঁস-মুরগির বিচরণ। মাঝে মধ্যে গবাদিপশুর খাবারের জন্য বিচালির স্তূপ। বেশ ভালো লাগে। অপূর্ব এসব দৃশ্য দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম হাজিরবাজার। এখানে থাকা-খাওয়ার সুব্যবস্থা আছে। ডাকবাংলোও আছে। বিভিন্ন সরকারি অফিসের মধ্যদিয়ে গেলাম মেঘনার তীরে গড়ে ওঠা ল্যান্ডস্টেশন। পর্যটকদের জন্য দারুণ স্পট। ছবি তোলার জন্য আকর্ষণীয় স্থান। এখানে চা-নাশতা করে চলে এলাম দুপুর ২টায় জনতাবাজার লঞ্চঘাটে। স্পিডবোট সবসময় পাওয়া যায়। আসার পথে স্পিডবোটে গিয়েছিলাম বলে এবার উঠলাম লঞ্চে। ছাড়ল বিকাল ৩টায়। ভাড়া মাত্র ৭০ টাকা। সময় লাগে প্রায় দুই ঘণ্টা।

ভোলা একটি দ্বীপ জেলা। এ জেলার দখিনে বিচ্ছিন্ন, কিন্তু নয়নাভিরাম দ্বীপের নাম মনপুরা। চলচ্চিত্র নির্মিত হওয়ায় বেশি জনপ্রিয়তা পায় মনপুরা দ্বীপ। এ দ্বীপের তিন দিকে মেঘনা নদী এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি। দ্বীপের চারদিকে নির্মিতব্য বেড়িবাঁধ নির্মিত হলে সাইক্লিং কিংবা ক্যাম্পিংয়ের জন্য আরও উপযুক্ত হবে।

এখানকার বেশির ভাগ অধিবাসীই জেলে। এরা মেঘনা ও সাগরে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে। মাঝে মধ্যে সাগরে মাসের অধিকও অবস্থান করেন। তখন প্রয়োজনীয় রান্নাসামগ্রী সঙ্গে রাখেন জেলেরা। ঘাটেই দেখা যায় জেলেরা জাল বুনছে আপন মনে। কেউ কেউ ফিশিং-ট্রলার মেরামতও করছে। মাঠজুড়ে ধু-ধু প্রান্তর, কোথাও ফসলের মাঠ। মাঠে চরে বেড়াচ্ছে গরু-মহিষ ও ছাগল। মহিষের দুধের চা এখানকার বিখ্যাত একটি পণ্য। পর্যটকরা দুধের চায়ের স্বাদ নিতে ভুল করেন না। দ্বীপজুড়ে মানুষের সংগ্রামী জীবন। মনপুরাজুড়ে এ দৃশ্য বড়ই মনোহর। এখানে ধান, বাদাম কিংবা অন্যান্য ফসলের চাষ হয়। এ দ্বীপের দক্ষিণে হাওয়াই সি বিচ। নদীর ৫০০ মিটার ভেতরে ল্যান্ডিংস্টেশন স্থানীয় ও পর্যটকদের বিনোদনের চমৎকার একটি স্থান।

যাতায়াত : ঢাকার সদরঘাট (১০ ও ১১ প্লাটুন/ঘাট) থেকে লঞ্চ ভ্রমণ হতে পারে আকর্ষণীয়। এমভি ফারহান কিংবা তাশরিফ নামীয় লঞ্চ বিকাল ৫.৩০ ও ৬.০০টায় সদরঘাট ছেড়ে যায় হাতিয়া ভায়া মনপুরার উদ্দেশে। মনপুরার রামনেওয়াজ লঞ্চ ঘাটে নেমে যাবে খুব সকালেই কিংবা ভোরে। এ ছাড়া বেতুয়াগামী লঞ্চে বেতুয়া নেমে অটোরিকশায় নতুন স্লুইস লঞ্চ ঘাট। এখান থেকে স্পিডবোটে ভাড়া জনপ্রতি ৩০০ টাকা কিংবা সীমিত আকারে চলা (দুই-তিনবার) লঞ্চে মনপুরার জনতাবাজার লঞ্চঘাটে নামতে হবে। স্পিডবোটে সময় লাগবে ২০ মিনিট। লঞ্চে এক ঘণ্টার বেশি।

থাকা ও খাওয়া : হাজিরবাজার উপজেলায় কিছু আবাসিক হোটেল রয়েছে। সেখানে অল্প দামে খাওয়া-দাওয়া করতে পারবেন।

বাইক ভাড়া : স্পট ও সময় হিসাবে ২ হাজার টাকা ভাড়ায় প্রায় সব জায়গায় ঘোরা যাবে। ফ্যামিলি হলে অটোরিকশায় ঘোরা যাবে দ্বীপ।