বিদ্যালয়ের ভবন ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণার দুই বছর পেরিয়ে গেলেও নতুন ভবন নির্মাণ বা বিকল্প কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

ফলে বাধ্য হয়ে লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার তালুক দুলালী রাজকাছারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পাঠদান চলছে পাশের একটি মন্দিরের খোলা বারান্দায়।

এতে ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান, ক্ষতিগ্রস্থরা হচ্ছে শিশু শিক্ষার্থীরা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সীমান্তঘেঁষা আদিতমারী উপজেলার তালুক দুলালী গ্রামে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে ১৯৭৮ সালে স্থানীয়রা বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন। সরকার পরবর্তীতে দুটি ভবন নির্মাণ করে এবং ২০১৩ সালে বিদ্যালয়টি জাতীয়করণ করা হয়। ২৫৩ জন শিক্ষার্থী নিয়ে বর্তমানে এটি উপজেলার তৃতীয় সর্বোচ্চ শিক্ষার্থীর বিদ্যালয়। দুই শিফটে বিদ্যালয়টিতে পাঠদান করেন ছয়জন শিক্ষক।

কিন্তু দুই বছর আগে উপজেলা প্রকৌশল দপ্তর সরেজমিনে পরিদর্শন করে বিদ্যালয়টির একটি ভবন ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে। এরপর থেকেই ভবনটি পরিত্যক্ত। অন্য ভবনটির তিনটি কক্ষের মধ্যে একটি ব্যবহৃত হচ্ছে অফিস হিসেবে, বাকি দুটিতে চলছে পাঠদান। দুই শিফটের এই বিদ্যালয়ে পাঠদানে ন্যূনতম তিনটি শ্রেণিকক্ষ প্রয়োজন হলেও আছে মাত্র দুটি। ফলে বাধ্য হয়েই প্রাক-প্রাথমিক ও তৃতীয় শ্রেণির ক্লাস নেওয়া হচ্ছে পাশের দুর্গা মন্দিরের বারান্দার মেঝেতে।

খোলামেলা পরিবেশে ক্লাস করতে গিয়ে চরম অস্বস্তিতে পড়ছে শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থী শারমিন, তাননিশা ও সিয়াম ইসলাম জানায়, ভবন নষ্ট, তাই মন্দিরের বারান্দায় বসে ক্লাস করি। এখানে ক্লাস করতে একদম ভালো লাগে না। পাকা ভবন না হোক, অন্তত একটি টিনশেড ঘর হলেও ভালোভাবে রুমে বসে ক্লাস করতে পারতাম।

মন্দিরের বারান্দায় পাঠদান, টিনশেডের আশ্বাসেও নেই উদ্যোগ

অভিভাবক সাইফুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যেখানে শিক্ষার্থী নেই সেখানে সরকার দ্বিতল ভবন করছে, অথচ এখানে সর্বোচ্চ শিক্ষার্থী থাকার পরও শ্রেণিকক্ষ নেই। দুর্গম এলাকা হওয়ায় কর্মকর্তাদেরও সুদৃষ্টি নেই। বাধ্য হয়ে মন্দির কমিটিকে বলে অস্থায়ী পাঠদানের অনুমতি নিয়েছি, কিন্তু সেখানে শিশুরা পড়াশোনায় মনোযোগী হতে পারছে না।

তালুক দুলালী রাজকাছারী দুর্গা মন্দিরের সভাপতি ললিত চন্দ্র বলেন, বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অভিভাবকদের আবেদনের প্রেক্ষিতে সাময়িকভাবে মন্দিরের বারান্দায় পাঠদানের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে। তবে শিশুরা মন্দিরের ভেতরে ময়লা ফেলে, যা নিয়ে পূজারিরা কিছুটা মনঃক্ষুণ্ন। মন্দির নিয়মিত পরিষ্কার করার লোক না থাকায় আমাদের জন্যও বিষয়টি কষ্টকর। কর্তৃপক্ষের কাছে দ্রুত শ্রেণিকক্ষ নির্মাণের দাবি জানাই।

সহকারী শিক্ষক সন্ধ্যা রানী বলেন, খোলামেলা পরিবেশে শিশুদের পড়ানো খুবই কঠিন। তারা পাঠদানে মনোযোগী না হয়ে চারদিকের পরিবেশে বেশি কৌতূহলী হয়ে পড়ে। এতে শিক্ষার মান নিম্নমুখী হচ্ছে।

প্রধান শিক্ষক আব্দুল মান্নান বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণার পর নতুন ভবনের জন্য একাধিক চিঠি পাঠানো হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এমনকি অস্থায়ী পাঠদানের জন্য একটি টিনশেড ঘর চেয়েও বরাদ্দ মেলেনি।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আজিজুল হক বলেন, নতুন ভবনের জন্য কয়েক দফায় আবেদন করা হয়েছে। চলমান প্রজেক্ট শেষ হয়েছে, নতুন প্রজেক্ট চালু হলে বরাদ্দ পাবো। অস্থায়ীভাবে শ্রেণিকক্ষ করার কোনো বরাদ্দ নেই।

তবে বিষয়টি দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গুঞ্জন বিশ্বাস বলেন, সরেজমিনে বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করেছি। শ্রেণিকক্ষের অভাবে শিশুরা মন্দিরের বারান্দায় ক্লাস করছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। আপাতত অস্থায়ী একটি শ্রেণিকক্ষের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নিচ্ছি। একই সাথে দ্রুত নতুন ভবনের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিতভাবে জানানো হবে।

মহসীন ইসলাম শাওন/এসজেডএইচ/জেআইএম