মানুষ সাধারণত যে কোনো কাজের পেছনে এক ধরনের ‘বস্তুগত প্রাপ্তি’ বা ‘লাভের’ হিসাব খোঁজে। পাওয়ার এ তীব্র আকাঙ্ক্ষা আমাদের ওপর এমনভাবে ভর করে থাকে-আমরা যখন মহান আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন হই, তখনো মনটাকে পবিত্র করার চেয়ে যেন মনের ভেতরের চাওয়া-পাওয়ার তালিকা মেলাতেই আমরা বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ি। আমরা ভেবে থাকি, ইবাদত-বন্দেগির বিনিময়ে জাগতিক সুখ-শান্তি, ধন-সম্পদ, প্রভাব-প্রতিপত্তি ও অশেষ প্রাচুর্য লাভ করব। কিন্তু ইবাদতের বিনিময়ে জাগতিক স্বার্থ হাসিলের এ আকাঙ্ক্ষা ইসলামের মর্মবাণীর সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয় কি? তাহলে ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে মানুষ আসলে কী পায়? আর ইবাদতের মূল লক্ষ্যই বা কী? এ প্রশ্নগুলো যেমন যুগে যুগে অনুসন্ধানী মানুষকে ভাবিয়ে তুলেছে, তেমনিভাবে আজ থেকে প্রায় আটশ বছর আগে এক কৌতূহলী মুসাফিরের অন্তরেও এ প্রশ্নগুলো ভীষণভাবে দোলা দিচ্ছিল। আর তার উত্তর খুঁজতে খুঁজতে এক পড়ন্ত বিকালে তিনি হেঁটে চলছিলেন তুরস্কের প্রাচীন শহর কোনিয়ার ধুলোমাখা পথ ধরে। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ করেই মুসাফিরের মনে ভেসে উঠল সুফি দর্শনের অমর সাধক হজরত মাওলানা জালালুদ্দিন রুমী (রহ.) [১২০৭-১২৭৩ খ্রিষ্টাব্দ]-এর নুরানি চেহারা। তার মনে হলো, এ প্রশ্নগুলোর উত্তর তো সাধারণ মানুষের কাছে মিলবে না! এর সমাধান পেতে হলে তাকে যেতে হবে হজরত রুমী (রহ.)-এর কাছেই। কারণ, তিনি তো শুধু একজন সুফিসাধক নন, তিনি হলেন তৎকালীন যুগের শ্রেষ্ঠ আলেম, ইসলামি চিন্তাবিদ, গবেষক, বিখ্যাত আইনবিদ এবং অন্যতম প্রধান ফকিহ, যার অগাধ পাণ্ডিত্যের সুখ্যাতি জগৎব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে।

মুসাফিরের মনে দৃঢ় বিশ্বাস জাগল-তার ভেতরের এ ব্যাকুলতার অবসান একমাত্র হজরত মাওলানা জালালুদ্দিন রুমী (রহ.)-ই করতে পারবেন। যেই ভাবা, সেই কাজ, মনের তীব্র কৌতূহল আর এক বুক আশা নিয়ে মুসাফির দ্রুত পা বাড়ালেন সেই শ্রেষ্ঠ জ্ঞানীর সন্ধানে। সেসময় হজরত রুমী (রহ.) ঘরের বারান্দায় বসেছিলেন। ঠিক তখনই কোনিয়ার সেই কৌতূহলী মুসাফির এসে হাজির হলেন তার সামনে। আগন্তুক লোকটি কিছুটা দ্বিধা আর খানিকটা সংশয় নিয়ে হজরত জালালুদ্দিন রুমী (রহ.)-এর সামনে এসে বসলেন। তারপর সরাসরি তার চোখের দিকে তাকিয়ে বিনয়ের সঙ্গে প্রশ্ন করলেন-

‘হুজুর! আপনি তো দিন-রাত স্রষ্টার প্রেমে মগ্ন থাকেন। প্রতিনিয়ত এত যে আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগি করেন, তা থেকে আসলে আপনি কী পেলেন? আপনার প্রাপ্তিটা কী?’

এমন আচমকা প্রশ্নে মাওলানা রুমী (রহ.) কিন্তু বিন্দুমাত্র বিচলিত হলেন না, বরং তার ঠোঁটের কোণে মায়াবী মুচকি হাসি ফুটে উঠল। প্রশ্নকর্তা এমন হাসি দেখে মনে মনে ভাবছিলেন-হজরত রুমী (রহ.) হয়তো এখন তার কোনো অলৌকিক ক্ষমতার গল্প শোনাবেন, কিংবা বলবেন পরকালের কোনো মহিমান্বিত প্রাপ্তির কথা। কিন্তু মুসাফিরকে অবাক করে দিয়ে মাওলানা রুমী (রহ.) একদম শান্ত কণ্ঠে উত্তর দিলেন-

‘ভাই! আসলে আমি ইবাদত করে নতুন কিছু পাইনি, তবে হারিয়েছি অনেক কিছু।’

এ কথা শুনে সেই মুসাফির বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল! আর মনে মনে ভাবতে লাগল, ‘ইবাদত করে মানুষ হারায় কীভাবে?’ মুসাফিরের চোখের সেই অবাক চাহনি দেখে হজরত রুমী (রহ.) বললেন-

‘শোনো হে ভাই! যখন আমি পরম প্রভুর দরবারে সিজদায় গিয়ে মাথাটা নত করি, তখন আমার ভেতর থেকে পাহাড়সম অহংকার আর দাম্ভিকতা নিমেষেই হারিয়ে যায়! যখন নিঝুম রাতে তার পবিত্র নামের জিকিরে বসি, তখন মনের ভেতরের সব উগ্রতা আর অধৈর্য হারিয়ে যায়। আমি হারিয়ে ফেলি আমার যত দুশ্চিন্তা, হতাশা আর বুকের ভেতরের আত্মবিশ্বাসহীনতা; কারণ আমি তখন খুব গভীরভাবে অনুভব করি-এ মহাবিশ্বের মালিক মহান আল্লাহ্ স্বয়ং আমার সঙ্গে আছেন। দুনিয়ার মোহে মত্ত মানুষ যা পাওয়ার জন্য অন্ধ হয়ে ছুটে বেড়ায়, স্রষ্টার প্রেমে পড়ে আমি সেই তীব্র লোভটাই হারিয়ে ফেলেছি। এখন আর আমাকে মিথ্যার মধ্যে সাময়িক আনন্দ খুঁজতে হয় না, আমি চিরতরে হারিয়েছি সেই মিথ্যার আনন্দ আর পাপের বিষাক্ত স্বাদ!’

হজরত জালালুদ্দিন রুমী (রহ.)-এর এ উত্তর শুনে মুসাফির স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তার চিন্তাভাবনাগুলো যেন নিমেষেই বদলে গেল। তিনি মনে মনে আফসোস করে বলে উঠলেন-‘হায়! এতদিন ধরে আমি চাওয়া-পাওয়ার যে হিসাব কষে এসেছি, তা কতই না তুচ্ছ আর অর্থহীন!’

প্রিয় পাঠক! সেই মুসাফিরের মতো আমরাও কি এক অন্তহীন গোলকধাঁধায় হারিয়ে যাইনি? আমাদের সব ব্যস্ততা যেন শুধুই ‘কী পেলাম আর কী হারালাম’-এ হিসাবের খাতা মেলানোর! অথচ হজরত জালালুদ্দিন রুমী (রহ.)-এর চমৎকার দর্শন আমাদের মনের ভেতরের ঘুমন্ত চেতনাকে জাগিয়ে তোলে। যে হৃদয় প্রতিনিয়ত দুনিয়ার মোহে পূর্ণ থাকে, সেখানে মহান আল্লাহর পবিত্র নুর প্রবেশ করবে কীভাবে? একটি পানিপূর্ণ পাত্র তো কখনোই মধু দ্বারা পূর্ণ করা যায় না, যতক্ষণ না পর্যন্ত সেই পাত্র থেকে পানি সরিয়ে নেওয়া হয়। তাই জীবনের আসল জয় কোনো কিছু পাওয়ার ক্ষণিকের উল্লাসে নিহিত নয়; বরং তা লুকিয়ে আছে মহান আল্লাহর কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মধ্যে।

পরিশেষে, মহান রাব্বুল আলামিনের দরবারে ফরিয়াদ-আমরা যেন আমাদের অন্তরের যাবতীয় কলুষতা, অহংকার ও দুনিয়ার মোহ দূর করতে পারি এবং সেই সঙ্গে দয়াময় আল্লাহর নুর ও রহমতে নিজেদের অন্তরকে পরিপূর্ণ করতে পারি। আমিন।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, দি পিপলস ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ