শুরুতে কিছু তথ্যের কচলাকচলি হোক।

আফ্রিকার আর কোনো দল মরক্কোর চেয়ে বেশি বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় ওঠেনি।
আফ্রিকার আর কোনো দল মরক্কোর চেয়ে বেশি বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠেনি।

আফ্রিকার আর কোনো দল মরক্কোর চেয়ে বেশি বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে খেলেনি।

শেষ তথ্যটায় একটু থামতে পারেন। কারণ, মরক্কো তো এবার এখনো সেমিফাইনালে ওঠেনি। কানাডাকে হারিয়ে কেবল কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করেছে। তবু আফ্রিকার সবচেয়ে বেশি সেমিফাইনাল খেলা দলের তালিকায় তারাই শীর্ষে। ২০২২ সালে সেই ইতিহাস তারাই লিখে ফেলেছে। এবার ৪৮ দলের টুর্নামেন্টে তারা এই মুহূর্তে সেরা আটে। এটাও কমসম কিছু নয়। ফাইনালে খেলার স্বপ্ন তো সবচেয়ে বেশি ডানা ঝাপটায় এখান থেকেই। মাত্রতো দুটি নকআউট ম্যাচের ব্যাপার।

চার বছর আগে কাতারে যখন আফ্রিকার দলটি সেমিফাইনালে উঠেছিল, গোটা বিশ্ব সেটিকে দেখেছিল রূপকথা হিসেবে। যে অঞ্চল থেকে কেউ কোয়ার্টারে পৌঁছাতে পারেন না, সেখানকার কারও সেরা চারে উঠে যাওয়া তো রূপকথাই। তবে মরক্কোর এবারের কোয়ার্টার ফাইনালও কি রূপকথার কাছাকাছি? চারপাশে কান পাতলে কি এমন কোনো শব্দ শোনা যায়?

সে আলাপে যাওয়ার সর্বশেষ ম্যাচটায় আরেকবার চোখ বোলানো যেতে পারে। বিশ্বকাপের নকআউটে মরক্কোর জয় এখন চারটি। সংখ্যাটা আফ্রিকার বাকি সব দেশের নকআউট জয়ের সমান। ক্যামেরুন (১৯৯০), সেনেগাল (২০০২), ঘানা (২০১০) আর মিসর (২০২৬) মিলে জিতেছে চারটি। মরক্কো একারই চারটি। আরেকটি ইতিহাসও তারা গড়েছে। বিশ্বকাপের দুই ভিন্ন আসরে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা প্রথম আফ্রিকান দল এখন তারাই।

কোয়ার্টার ফাইনালে পা রাখার উল্লাস মরক্কোর

এটুকু এগোনোর পথ অবশ্য একেবারে মসৃণ ছিল না। শক্তির ঝলক যেমন দেখা গেছে, ফুটে উঠেছে দুর্বলতাও। গ্রুপে প্রথম ম্যাচেই প্রতিপক্ষ ছিল ব্রাজিল, ফল ১-১ ড্র। যে ফলের পর মরক্কোর সামর্থ্য নিয়ে যতটা না কথা হয়েছে, বেশি হয়েছে ব্রাজিলের ভালো খেলতে না পারা নিয়ে।

তবে পরের দুই ম্যাচে স্কটল্যান্ডকে ১-০ আর হাইতিকে ৪-২ গোলে হারিয়েই নকআউটে জায়গা করে ফেলে মরক্কো। শেষ ৩২-এর খেলায় নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে অবশ্য শেষ পর্যন্ত লড়তে হয়েছে। যেতে হয়েছে টাইব্রেকার পর্যন্ত। আর সেখান থেকেই শেষ ষোলোয় কানাডাকে টপকে এখন কোয়ার্টার ফাইনালে।

এই যে বিশ্বকাপ-যাত্রা, তাতে কিছুটা অসংগঠিতই মনে হবে মরক্কোকে। কোনো ম্যাচে দুর্দান্ত, আবার কোনো ম্যাচে ছন্নছাড়া। ২০২২ সালে ওয়ালিদ রেগুরাইয়ের অধীনে মরক্কোর সাফল্যের ভিত্তি ছিল রক্ষণের দৃঢ়তা। ওয়ালিদ বিদায় নেওয়ার পর মাত্রই মার্চে দায়িত্ব নিয়েছেন উয়াহবি।

দীর্ঘদিন ধরে মরক্কোর বয়সভিত্তিক ফুটবলে কাজ করা এই কোচের পছন্দ আবার আক্রমণাত্মক ফুটবল। তাতে রক্ষণের সেই সংহতি খানিকটা কমেছে, একই সঙ্গে আবার আক্রমণে যোগ হয়েছে নতুন ধার।

গোলের পর উদ্‌যাপন

হাকিম জিয়েশ-ইউসুফ আন নাসিরিদের সেই দলটি ছিল পরিশ্রমী, লড়াকু আর রক্ষণে অবিচল। স্পেন ১২০ মিনিট খেলেও গোল করতে পারেনি। পর্তুগালও পারেনি। ফ্রান্সের বিপক্ষেও শেষ পর্যন্ত লড়েছিল তারা। কিন্তু সেই দলে প্রতিপক্ষের রক্ষণ খুলে ফেলার মতো কোনো সৃষ্টিশীল প্লেমেকার ছিল না।

ম্যাচ জেতার জন্য অপেক্ষায় থাকতে হতো একটা মোক্ষম মুহূর্তের। এই বিশ্বকাপে সেই ঘাটতি অনেকটাই পূরণ করেছেন ব্রাহিম দিয়াজ। রিয়াল মাদ্রিদে খেলা এই মিডফিল্ডার ব্রাজিলের বিপক্ষে ড্রয়ে আর স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে জয়ে সাইবারির গোলে অ্যাসিস্ট করেছিলেন, কানাডার বিপক্ষেও করেছেন জোড়া অ্যাসিস্ট।

আক্রমণে দিয়াজের পাশাপাশি জ্বলে উঠেছেন আজ্জেদিন উনাহিও। ২০২২ সালে স্পেনকে টাইব্রেকারে বিদায় করার পর তখনকার স্পেন কোচ লুইস এনরিকে বলেছিলেন, ‘এই ছেলেটা কোত্থেকে এল! আমাকে অবাক করে দিয়েছে।’ এখন আর উনাহি কারও কাছে বিস্ময় নন। কানাডার বিপক্ষে জোড়া গোল করে সেই পরিচয় আরও একবার মনে করিয়ে দিয়েছেন তিনি। জিরোনার হয়ে গত মৌসুমে দুর্দান্ত খেলার পর তাঁকে নিয়ে বড় ক্লাবগুলোর আগ্রহও এখন বাড়ারই কথা।

এদিকে রক্ষণে কম যাচ্ছেন না আশরাফ হাকিমিও। পিএসজির হয়ে টানা দুটি চ্যাম্পিয়নস লিগে জিতে আসা এই রাইটব্যাক এই মুহূর্তে তাঁর পজিশনের অন্যতম সেরা। মরক্কো দলে এলে আক্রমণেও ভূমিকা বাড়ে তাঁর। এই যেমন এবারের আসরে ৩টি অ্যাসিস্ট করে ফেলেছেন। ১৯৬৬ সালের পর থেকে এক বিশ্বকাপে এর চেয়ে বেশি অ্যাসিস্ট আছে মাত্র তিনজন ডিফেন্ডারের—ডেলি ব্লাইন্ড, ডেনজেল ডামফ্রিস আর কাফু (চারটি করে)।

মাঠে মরক্কোর যে সাফল্যটা এখন দেখা যাচ্ছে, তার বীজ অবশ্য বোনা হয়েছিল অনেক আগে।। ১৯৮৬ থেকে ১৯৯৮ সালের মধ্যে চারটি বিশ্বকাপের তিনটিতে খেলার পর মরক্কো টানা প্রায় দুই দশক বিশ্বকাপে জায়গা করতে পারেনি। ২০০৯ সালে চালু হয় কিং মোহাম্মদ ষষ্ঠের নামে জাতীয় ফুটবল একাডেমি। ২০১৯ সালে চালু হয় প্রায় ৬৫ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে আধুনিক জাতীয় প্রশিক্ষণ কমপ্লেক্স।

আশরাফ হাকিমি এখন দলের নেতা

এই দুই প্রকল্প বদলে দেয় দেশটির ফুটবল। একদিকে স্থানীয় প্রতিভা গড়ে ওঠে, অন্যদিকে ইউরোপে জন্ম নেওয়া মরক্কান বংশোদ্ভূত ফুটবলারদের জাতীয় দলে আনার কাজও সহজ হয়। আশরাফ হাকিমি স্পেনে বড় হয়েছেন। ব্রাহিম দিয়াজও স্পেনেই জন্মেছেন। কেউ কেউ আছেন ফ্রান্স, বেলজিয়াম কিংবা নেদারল্যান্ডসের ফুটবল সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠা।

কিন্তু জাতীয় দলে এসে সবাই একই পরিচয়ে খেলেন। হয়ে ওঠেন বিস্ময়। যদিও কোচ উয়াহবির দাবি, ‘আজ আমরা আর কোনো চমক নই। মানুষ যখন মরক্কোর কথা বলে, তারা একটা প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বী দলের কথাই বলে, একটা বড় ফুটবল-শক্তির কথা বলে, আর এটা আমাদের জন্য বিশাল গর্বের।’

নেইমার কি খেলবেন, নাকি আবারও ‘মরীচিকা’

বিশ্বকাপের আগেও তিনি বলেছিলেন, ‘২০২২ বিশ্বকাপের পর মরক্কো নতুন এক মাত্রায় প্রবেশ করেছে। এখন আমাদের বিশ্বাস করতে হবে যে আমরা শিরোপার দাবিদার হতে পারি। সেরা হওয়ার জন্য যা যা লাগে, তার সবই আমাদের আছে। শুধু সেটা বিশ্বাস করাটাই বাকি।’

সেই বিশ্বাসের ভিত্তিটা শুধু আত্মবিশ্বাস নয়, মাঠের পারফরম্যান্সও। ব্রাজিলের সঙ্গে সমানতালে লড়াই, নেদারল্যান্ডসকে বিদায় আর কানাডার বিপক্ষে খুব ভালো না খেলেও ৩-০ গোলের জয় তো বড় দল হওয়ার লক্ষণই বলছে।

আর বিশ্বকাপ জিততে তো শুধু প্রতিভা লাগে না। লাগে অভিজ্ঞতা, মানসিক শক্তি, কৌশলগত বৈচিত্র্য, গভীর স্কোয়াড এবং বড় মুহূর্তে ঠান্ডা মাথা। মরক্কোর এখন সব উপাদানই কমবেশি আছে। ২০২২ বিশ্বকাপে মরক্কো ছিল অসম্ভবকে সম্ভব করার গল্প।

এবার তাদের লক্ষ্য শুধু ইতিহাস গড়া নয়; আফ্রিকার ফুটবলকে এমন এক জায়গায় নিয়ে যাওয়া, যেখানে বিশ্বকাপ জেতার স্বপ্নকে আর রূপকথা বলে মনে হবে না। আর যদি সত্যিই কোনো আফ্রিকান দল প্রথমবার বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরে, আজকের দিনে দাঁড়িয়ে সবচেয়ে শক্তিশালী দাবিটা সম্ভবত মরক্কোরই।

এমবাপ্পে বললেন, কুৎসিত ফুটবল আমরাও খেলতে জানি