সমঝোতা চুক্তি হলেও ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা ক্রমশ বাড়ছে। গত শনিবার রাতে দ্বিতীয় দিনের মতো ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় বিমান হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। জবাবে কুয়েত ও বাহরাইনে পালটা হামলা করে তেহরান। এতে নতুন করে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরুর ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

এ অবস্থায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডেনাল্ড ট্রাম্প আবারও হুমকি দিয়ে বলেছেন, ইরানের কোনো অস্তিত্ব থাকবে না। আর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ তুলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

গতকাল রোববার আল জাজিরা জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পাঁচটি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর পর ইরান বাহরাইন ও কুয়েতে পালটা হামলা চালিয়েছে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসি রোববার এ পালটা হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে। তারা জানিয়েছে, কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্রের ‘আলি আল সালেম’ বিমানঘাঁটি এবং বাহরাইনের ‘পোর্ট সালমান’-এ থাকা যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌ-বহর লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। বাহরাইন এ হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেছে, এর মাধ্যমে তাদের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘিত হয়েছে।

পাশাপাশি অঞ্চলে উত্তেজনা প্রশমন ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার সুযোগ ক্ষুণ্ন হয়েছে। অন্যদিকে কুয়েত ইরানের ‘বারবার সংঘটিত জঘন্য আগ্রাসন’কে তাদের ‘সার্বভৌমত্বের চরম লঙ্ঘন’ হিসাবে বর্ণনা করেছে।

গত শনিবার মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের সিরিক, বন্দর-ই-লেঙ্গেহ ও কেশম দ্বীপে আঘাত হানে। মধ্যপ্রাচ্যে থাকা ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, তাদের নৌ ও বিমানবাহিনী হরমুজ প্রণালি ও এর সংলগ্ন একাধিক স্থানে ইরানের ১০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। তেলবাহী ট্যাঙ্কারে ইরানের ড্রোন হামলার জবাবেই এসব হামলা চালানো হয়। এতে বলা হয়, পানামার পতাকাবাহী জাহাজটি প্রণালির কাছে দিয়ে যাওয়ার সময় হামলার শিকার হয়। তখন সেটিতে ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ছিল।

গত বৃহস্পতিবার সিঙ্গাপুরের ‘এভার লাভলি’ নামের কন্টেইনার জাহাজ ড্রোন হামলার শিকার হয়। জবাবে যুক্তরাষ্ট্র সিরিক এলাকার কাছাকাছি বিভিন্ন স্থানে আঘাত হানে এবং পালটা পদক্ষেপ হিসাবে ইরান ওই অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালায়। ইরান জানিয়েছে, প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে অবশ্যই তাদের নির্ধারিত পথ ব্যবহার করতে হবে। তারা সতর্ক করে দিয়েছে- অন্য কোনো পথ ব্যবহার করলে তা যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন হিসাবে গণ্য হবে।

গত শনিবার গভীর রাতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, তেহরান গত ১৭ জুন সই করা যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করেছে। সামাজিকমাধ্যমে তিনি লিখেন, ‘এমন এক সময় আসতে পারে যখন আমরা আর সংযত আচরণ করতে পারব না এবং অত্যন্ত সফলভাবে শুরু করা কাজটি সামরিক উপায়ে সম্পন্ন করতে বাধ্য হব।’ তিনি লিখেন, ‘যদি তেমনটা ঘটে, তবে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের আর কোনো অস্তিত্ব থাকবে না!’

অপরদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলে নজরদারি ও পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রগুলোর ওপর মার্কিন হামলার নিন্দা জানিয়েছে। মন্ত্রণালয় বলেছে, এ ‘বর্বর হামলা’ সমঝোতা স্মারক ও জাতিসংঘের সনদের লঙ্ঘন। এক বিবৃতিতে বলা হয়, এ ঘটনা প্রমাণ করে যুক্তরাষ্ট্র ‘তার প্রতিশ্রুতির বিন্দুমাত্র মূল্য বা বিশ্বাসযোগ্যতা দেয় না’। পাশাপাশি ইরান ঘোষণা দিয়েছে- তারা ‘যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আগ্রাসন’ থেকে নিজেদের সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা রক্ষা করবে।

গতকাল রোববার ইরাকে এক বক্তব্যে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, ‘আগামী ৩০ দিন হরমুজ প্রণালি ইরানের পূর্ণ তদারকি ও ব্যবস্থাপনার অধীনে থাকবে এবং সব বাধা দূর হওয়ার পর এ জলপথের পূর্ণ সক্ষমতা পুনরুদ্ধার করা হবে।’ তিনি বলেন, ‘যে কোনো নতুন ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে এবং প্রণালিটি খুলে দেওয়ার প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করবে। ফলে উত্তেজনাও আরও বাড়বে।’ তিনি সব পক্ষকে সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী তাদের দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান; অন্যথায় পুরো প্রক্রিয়াটি ভেস্তে যেতে পারে।

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক উলফগ্যাং পুসতাই আল-জাজিরাকে বলেন, যদিও যুক্তরাষ্ট্র বা ইরান-কোনো পক্ষেরই সংঘাত আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়ার কোনো আগ্রহ নেই। তবুও অনিচ্ছাকৃতভাবে এমনটা ঘটে যাওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।

যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ মোজতবা খামেনির

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি ইরানের বিচার বিভাগের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, যেন তারা গত বছর থেকে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের আগ্রাসী যুদ্ধের ফলে লঙ্ঘিত হওয়া জাতির অধিকার পুনরুদ্ধারের জন্য আইনি পদক্ষেপ নেন। ইরানের প্রেস টিভি অনলাইন জানায়, গতকাল রোববার এক বার্তায় মোজতবা বলেন, বর্তমানে গোটা ইরানি জাতির সামনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আইনি ও বিচারিক বিষয় হলো ‘আন্তর্জাতিক অপরাধী এবং দাম্ভিক ও আগ্রাসী শক্তিগুলোর’ দ্বারা লঙ্ঘিত অধিকার পুনরুদ্ধার করা।