ওয়াশিংটন ডিসির আশেপাশে তিন তিনটা বিমানবন্দর। বন্ধু মেরিল্যান্ডের বেথেসডা থেকে রেগান বিমানবন্দরে যখন গাড়ি চালিয়ে নিচ্ছিল, তখনো সকাল হয়নি, রাস্তাটা নীরব, চারদিকে ঘন গাছপালা আর মাঝদিয়ে মহাসড়ক। শত শত গাড়ি ভীষণ গতি নিয়ে ছুটে চলছে, এত ভোরে এরা কোথায় যায়? আমরাও চলছি ওয়াশিংটন শহরের পটমেক নদীর ধার ঘেঁষে শহরের বাইরে। আমরা উঁচু রাস্তা থেকে আলোকিত ওয়াশিংটন মনুমেন্ট দেখতে পাচ্ছিলাম, গতকাল শেষ বিকেলে এটার পাদদেশে পা ঝুলিয়ে বসে এর চারপাশ দেখছিলাম, এই সুউচ্চ চক–পেনসিলের মতো লম্বা অবেলিস্কের সামনে–পেছনে বিস্তৃত মল চত্বর, বেশ কয়েকটা জাদুঘর, অনেক সরকারি ভবন চারদিকে ছড়ানো, এমনকি হোয়াইট হাউস এর ডানে। এটার অবস্থান কিছুটা উঁচু হওয়াতে এখান থেকে চারদিকে অনেক দূর দেখা যায়। আমরা শহর ছেড়ে বিমানবন্দর এসে পৌঁছলাম। তখনো আঁধার। বন্ধুকে কোলাকুলি করে বিদায় জানিয়ে আমরা বিমানের জন্য অপেক্ষায় রইলাম। বিমানবন্দরটা ছোট আর খুব বেশি সুন্দর নয়, ঠিকঠাক সময়ে আমাদের সাউথইস্ট এয়ারের ফ্লাইট সানফ্রান্সিসকোর দিকে রওনা দিল। বিমানটা সরাসরি না যেয়ে শিকাগোর মিডওয়ে বিমানবন্দরে একটা ছোটখাটো যাত্রাবিরতি দিল। এটাও ছোটখাটো বিমানবন্দর, লাউঞ্জ ছিল না।

এটাসেটা খেয়ে পরের বিমানে উঠে পড়লাম। সানফ্রান্সিসকো বিমানবন্দরে নেমে চক্ষু চড়কগাছ। এত্ত বড় আর সুন্দর চারদিক। বিমানবন্দরটা মনোরম। এখানে রোদেলা দিনের হাতছানি। শহরটা সময়ে নিউইয়র্ক থেকে পিছিয়ে, তাই মাঝবেলাতেই এসে পৌঁছলাম। দিনটা নষ্ট হয়নি। আবহাওয়া উষ্ণ। বিমানে এতক্ষণ শীতের পোশাকে ছিলাম, তাই গরম কাপড় খুলে একটু ফ্রি হয়ে টার্মিনালের বাইরে অল্পক্ষণ অপেক্ষা করতে না করতেই এ শহরের বন্ধুটা তার ভীষণ দামি গাড়ি নিয়ে হাজির। বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুটা মার্কিন দেশে এসে হার্ভার্ডে উচ্চতর তথ্যপ্রযুক্তির ডিগ্রি নিয়েছে, থাকে সান হোজে নামের শহরের সিলিকন ভ্যালি লাগোয়া মিলপিটাস। এই এলাকা মার্কিন দেশের বড়লোক এলাকার একটা।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

বন্ধুর তথ্যপ্রযুক্তির স্টার্টআপ আছে তিন মহাদেশব্যাপী, বাংলাদেশ, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ নানান জায়গায়। ভীষণ ব্যস্ত মানুষ, তার ছেলেমেয়ে উত্তর আমেরিকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে। আমাদের জন্য সে কাজ ফেলে বিমানবন্দর থেকে ভীষণ গতিময় ফ্রি ওয়ে দিয়ে তার মনোরম বাসায় নিয়ে এলো। রাস্তার দুপাশে ফেসবুক, মাইক্রোসফট, এনভিডিয়া, ক্যানন, অ্যাপলের ক্যাম্পাস। ভীষণ অবস্থা। এখানে থাকব চার দিন।

আমরা দুপুরে মার্কিন জাঙ্কফুড খেয়ে একটু বিশ্রাম নিতে নিতে বিকাল শেষ। সেই শেষ বিকালে বের হলাম সিলিকন ভ্যালি দেখতে, অ্যাপল ক্যাম্পাস ঘুরে টুরে হাজির হলাম এক মনোরম শপিং মলে। কী বিশাল। এখানে এত্ত জায়গা যে এদের মলগুলো দেখি নিউমার্কেট ধরনের ছড়ানো হয়। আমরা এরপর সেখানকার কস্টকো বা ওয়ালমার্টে হাজির হলাম। এটাও বিশালাকার। সেখানে অনেক খাবার কেনা হলো আমাদের চার দিনের জন্য। আমাদের জন্য বিশেষভাবে কেনা হলো স্টেক বানানোর দামি গরুর মাংসের টুকরা। আমিও হালকা চকলেটজাতীয় জিনিস কিনে ফেললাম দাম কম দেখে।

এরপর বাসায় ফিরে বন্ধু লেগে গেল নানান পদের ফিউশন রান্নাবান্নায়। সঙ্গে চলল অবিরাম গল্প আড্ডা।

মার্কিন মুলুকে সফর কাহিনি—১ম পর্ব: ঢাকা থেকে নিউইয়র্ক

রান্না শেষ। আমরা ভীষণ মজার স্টেক খেলাম, আমিতো চিন্তাও করিনি দেশি মশলা না দিয়ে সামান্য অল্প আঁচে করা প্রায় কাঁচা মাংসের স্বাদ এতটা অসাধারণ হয় কী করে? আদি মানবেরা এই আগুনে পোড়া মাংস খেয়েই তো স্পেনের আলতামিরা গুহার সব অসাধারণ গুহাচিত্র এঁকেছিল। এতক্ষণে সেই গুহাচিত্রের কারণ বুঝলাম। আমরা খাচ্ছি তো খাচ্ছি আর সঙ্গে কোরিয়ান সি উইডের পাতলা স্লাইস খেয়ে একদম ফিদা। শেষে চা। আহ জীবন!

অনেক অনেক গল্পগুজব শেষে আমরা ঘুমাতে গেলাম অনেক রাতে। আগামীকাল আমরা যাব সানফ্রান্সিসকো শহর দেখতে, নিজেরাই।

পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়ে গেল। আবার ফিউশন খাবারের পালা, মাশরুম বা ব্যাঙের ছাতার ভাজি খেলাম আর মুরগি আর রুটি। আর সব শেষে চা। এত্ত খেয়েদেয়ে অনেকটা অনিচ্ছায় বের হলাম সানফ্রান্সিসকো দেখতে। মিলপিটাস মেট্রোরেল যেটাকে এরা বার্ট বলে, সেটাতে করে সানফ্রান্সিসকো হাজির হলাম। শান্ত স্নিগ্ধ শহর। হেঁটে হেঁটে চায়না টাউন গেলাম, উঁচু–নিচু রাস্তা এগলি ওগলি হয়ে অনেকখানি হেঁটে হেঁটে এম্বারকাডেরো নামের এক জায়গায় এলাম। এখানে সেই নিউইয়র্কের হাডসন ইয়ার্ডের মতো পিয়ার বা জেটিগুলোর গোডাউনগুলোকে সুন্দর সুন্দর বার রেস্তোরাঁ আর মনোরম বিনোদনকেন্দ্র বানানো হয়েছে। এখানে অনেক ছবি তুলে আমরা এখানকার পিয়ার ৩৯ থেকে ২৮ নম্বর মুনি বাসে চড়ে গোল্ডেন গেট সেতুর পাদদেশে হাজির হলাম। এখান থেকে গোল্ডেন গেট সেতু, সানফ্রান্সিসকো উপসাগর আর কুখ্যাত আলকাত্রাজ দ্বীপ দেখা যায়, যেখানে একসময় কারাগার ছিল। আমাদের ভাগ্য ভালো। রোদেলা দিন, কুয়াশা অনপুস্থিত। তাই শেষ বিকেলের আলোতে সেতুটাকে অদ্ভুত লাগছিল। বাঁকা ধনুকের মতো। এ দৃশ্য দেখার জন্য কত পর্যটক সেখানে গিজগিজ করছিল। আমরা সুন্দর একটা জায়গা দেখে কিছুক্ষণ বসে বসে অনুভব করছিলাম। এরপর আবারও সেই ২৮ নম্বর মুনি বাসে করে পিয়ার ৩৯–এ এলাম। সেখান থেকে হেঁটে একটা স্টপ থেকে সানফ্রান্সিসকো শহরের বিখ্যাত কাঠের ট্র্যামে উঠে সেই প্রমেনাডের একপাশ থেকে আরেকপাশে গেলাম। আমরা ট্রাম থেকে নেমে এসব পিয়ারের পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে শহরটার সিবিডি বা বাণিজ্যিক এলাকায় এসে পড়লাম। কত্ত লোক যে জাঁকজমকপূর্ণ এ এলাকায় বাইরে বসে খানাপিনা করছে। কিন্তু আমাদের রয়েছে রাতের দাওয়াত। তাই খেতে মানা।

মার্কিন মুলুকে সফর কাহিনি—২য় পর্ব

আমরা সিবিডি দিয়ে হেঁটে বিশাল সুউচ্চ সব ভবন পেরিয়ে একটা বার্ট মেট্রোরেলে করে সহযাত্রীর আত্মীয়ের বাড়িতে দাওয়াত খেতে গেলাম শহরের আরেক প্রান্তে। যেতে যেতে উড়াল মেট্রোতে প্রসারিত শহরটাকে কি ভীষণ সুন্দর লাগছিল। আত্মীয় আমাদের স্টেশন থেকে নিয়ে সুন্দর ফিতার মতো রাস্তা করে এক পাহাড়ি এলাকায় তাদের বাসায় নিয়ে এলো। সেই সড়কের এক বাঁক থেকে শহরের বুকে সূর্যাস্ত অসাধারণ লাগছিল। শহরটাকে ঘিরে এই পাহাড়ের সারি। আর পাহাড়ের পাদদেশে তিন তিনটা শহর। শহরগুলো চাঁদের মতো বিস্তৃত। সাগরটা চাঁদের পেটে ঢুকে গেছে। তাই সূর্যটা সাগরের মাঝে যখন ডুবছিল, তখন সেই পাহাড়ের ঢাল থেকে কী যে সুন্দর লাগছিল, তা কি ভাষায় বোঝানো সম্ভব?

আমরা সন্ধ্যাটা নামতে দিলাম। আমার সহযাত্রীর অসংখ্য আত্মীয় এখানে থাকে। একে একে তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে তাদের কয়েকজন আমাদের বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঝে এক পার্সিয়ান রেস্তোরাঁতে নিয়ে এলো। কী মজার মজার সব খাবার। এত্তসব খেয়ে আমরা বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয়ের এ–প্রান্ত ও–প্রান্ত করে এক আইসক্রিম পার্লারে হাজির হলাম।

কী মজার সব আইসক্রিম এখানে খেলাম, নোনতা একধরনের আইসক্রিম এখানে বেশ ফ্যাড মনে হলো।

আইসক্রিম খেয়ে বিদায় নিলাম তাদের কাছ থেকে। অশ্রুসজল বিদায় শেষে আমরা সেই বার্ট মেট্রোরেল করে মিলপিটাস স্টেশনে এসে পৌঁছলাম অনেক রাতে।

বন্ধু এসে তুলে নিল। বাসায় এসে অবশ্য শুধুই চা আর আড্ডা হলো বেশ রাত অবধি।

পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠতেও দেরি। আজ যাব সান হোজে শহরের চারদিকে ঘিরে রাখা পাহাড়ের ঢালে। বন্ধু নিয়ে যাবে সেখানে। সকালের মুখরোচক নাশতা শেষে আমরা এগিয়ে চললাম পাহাড়ি পথ বেয়ে। অবিশ্বাস্য সুন্দর ফিতার মতো রাস্তা আর দুপারের দৃশ্য। ক্যালিফোর্নিয়া এত্ত সুন্দর!

আমরা পাহাড়ের ওপর উঠে পুরা সান হোজে শহরটাকে দেখতে পাচ্ছিলাম। সেই পাহাড়ি ঘাসের ফাঁকে অদ্ভুত সুন্দর নাদুসনুদুস মারমটের ঝাঁক দেখছি। এরা অনেকটা ইঁদুর আর খরগোশের শংকর। বাদামি। সেই পাহাড়ের জংলি ফুলের মেলায় আমরা হারিয়ে গেলাম। এরপর আমরা নিচে নেমে এলাম সান ফ্রান্সিসকো উপসাগরটার আরেক প্রান্ত হয়ে। আসার সময় ভীষণ দীর্ঘ একটা সেতু পার হয়ে এলাম। কী বিশাল অনেকটা পদ্মা সেতুর মতো। একসময় এটাই ছিল দুনিয়ার দীর্ঘতম সেতু। বন্ধু আমাদের মিলপিটাস বার্ট মেট্রো রেলস্টেশনে নামিয়ে চলে গেল। আমরা ২/২.৫ ডলারের টিকিট কেটে সান হোজে ঘুরতে বের হলাম। আজকে রোদের তেজ ভীষণ। শহরটাতে গাছপালা কম। কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তিবিদদের কাছ থেকে অনেক অনেক কর পাওয়ায়, শহরটাকে অনেক নতুন করে সাজানো হচ্ছে। আমরা এখানে সেখানে ঘুরে বিকালের দিকে বার্টে চেপে আবারও বন্ধুর বাসার ধারেকাছের স্টেশনে এলাম। সেখান থেকে বন্ধু তুলে নিয়ে সে আমাদের কাছের এক ন্যাচার রিসার্ভে নিয়ে গেল। শহরটা বাড়ন্ত। এর শেষ প্রান্তে পাহাড়ের ঢালে নিচু লবণের প্লাবন ভূমি, যাকে এতা সল্ট প্লেইন বা ফ্ল্যাট বলে। এখানে বেড়ে ওঠা বড় বড় ঘাস আর ফুল লতাপাতা আর লবণ হ্রদের বিস্তৃত পানির ওপর পড়ন্ত সূর্যের কিরণের প্রতিচ্ছবি এক অতিপ্রাকৃত দৃশ্য তৈরি করল। সূর্যটা পাহাড়ের মাথায় যতই ডুবছিল, তার প্রতিবিম্ব আর পাহাড়ের লম্বা ছায়া এক মোহময় দৃশ্য তৈরি করল। আমরা হতচকিত। সূর্যটা পাহাড়ের ওপাশে হারিয়ে গেল, কিন্তু তখনো দিন বাকি। সেই আবছায়া ছেড়ে আমরা হাজির হলাম এক বিশাল প্রসারিত মেগা মলে। সব দামি ব্র্যান্ডের ছড়াছড়ি। আমরা বাংলাদেশে তো এগুলো দেখিও না। তার ওপর ফ্যাক্টরি আউটলেট মূল্যহ্রাস। আমাদের আর পায় কে? দুনিয়ার শপিং শেষে বন্ধু আমাদের বাসায় হাজির করাল। এসেই আবার মুখরোচক খাবারের মাঝে হারিয়ে গেলাম।

আগামীকাল আমরা যাব এ এলাকার অন্যতম সুন্দর জায়গা নাপা ভ্যালি। আঙুরের বাগান, স্পা আর নাপা দ্রাক্ষারস বা ওয়াইন এখন বিশ্বখ্যাত। নিউ ওয়ার্ল্ড ওয়াইনে নাপার নাম অনেক ওপরে, অজি বা দক্ষিণ আমেরিকার ওয়াইনের সঙ্গে এর জোর টক্কর।

আমরা দ্রাক্ষারসের একেবারেই ভক্ত না হলেও, নাপা ভ্যালির আসা-যাওয়ার পথটার সৌন্দর্য বিখ্যাত। তাই এই সুযোগ আমরা হারাতে চাই না। চলবে...