গ্রীষ্মের ছুটি বা যেকোনো ঋতুতে বাইরে বের হলে দেখা যায়, কেউ কেউ মশার কামড়ে অতিষ্ঠ হয়ে উঠছেন, অথচ তাঁর পাশে থাকা অন্য মানুষটিকে মশা পাত্তাই দিচ্ছে না। অনেকেই রসিকতা করে বলেন, নির্দিষ্ট কোনো মানুষের রক্ত হয়তো বেশি ‘মিষ্টি’, আর সে কারণেই মশারা তাঁর প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়। তবে বিজ্ঞান বলছে, রক্তের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। মূলত মানুষের শরীর থেকে নির্গত বিভিন্ন জৈবিক সংকেত যেমন—শ্বাস, শরীরের তাপমাত্রা এবং ত্বকের বিশেষ গন্ধই নির্ধারণ করে যে কে মশার প্রধান লক্ষ্যবস্তু হবে।

দূর থেকেই মশারা এই সংকেতগুলো অনুধাবন করতে পারে এবং নির্দিষ্ট কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এই সংকেতগুলো এতই তীব্র হয় যে তারা মশার জন্য এক প্রকার ‘চুম্বক’ হিসেবে কাজ করে। বিজ্ঞানীদের গবেষণায় মানুষের প্রতি মশার এই পক্ষপাতিত্বের পেছনে প্রধানত তিনটি বড় কারণ উঠে এসেছে।

মানুষের শরীর মশার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো কার্বন ডাই-অক্সাইড। কেবল নারী মশারাই ডিমের প্রোটিনের প্রয়োজনে মানুষের রক্ত চোষে এবং তারা প্রায় ১০ মিটার বা ৩৩ ফুট দূর থেকেই ঘ্রাণশক্তি ব্যবহার করে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করতে পারে। মানুষ যখন শ্বাস ছাড়ে, তখন ফুসফুস থেকে নির্গত কার্বন ডাই-অক্সাইড মশার ঘ্রাণেন্দ্রিয়কে সক্রিয় করে তোলে এবং তাদের কামড়ানোর জন্য উদ্বুদ্ধ করে। যেহেতু প্রাপ্তবয়স্ক মানুষেরা শিশুদের তুলনায় বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড ত্যাগ করে, তাই মশারা বড়দের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়।

মশারা মানুষের শরীরের তাপমাত্রা এবং আর্দ্রতার প্রতি ভীষণ সংবেদনশীল। কার্বন ডাই-অক্সাইডের সঙ্গে শরীরের উষ্ণতা যুক্ত হলে মশার আকর্ষণ বহুগুণ বেড়ে যায়। এই কারণে গর্ভবতী মায়েরা সাধারণ নারীদের তুলনায় দ্বিগুণ হারে মশার কামড়ের শিকার হন। গর্ভাবস্থায় শরীরে বিপাকীয় চাহিদা বৃদ্ধির কারণে তাঁদের শরীরের তাপমাত্রা যেমন বেশি থাকে, তেমনি তাঁরা শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইডও নির্গত করেন। একইভাবে যারা কঠোর শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়াম করেন, তাদের শরীরেও সাময়িকভাবে বিপাকীয় হার ও তাপমাত্রা বেড়ে যায় এবং ঘামের কারণে তারা মশার সহজ শিকারে পরিণত হন। সাধারণত স্থূলকায় বা বড় শরীরের মানুষেরাও বেশি তাপ ও কার্বন ডাই-অক্সাইড তৈরি করায় মশার প্রিয় লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠেন।

মশারা যখন মানুষের খুব কাছাকাছি অর্থাৎ ১০ মিটারের কম দূরত্বে চলে আসে, তখন তারা মূলত ত্বকের গন্ধ শুঁকে কামড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। মানুষের ত্বক ও শ্বাসের উদ্বায়ী জৈব যৌগ মশার মস্তিষ্কে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। মানুষের ত্বকে প্রায় ৫০০টিরও বেশি এই ধরনের উদ্বায়ী রাসায়নিক উপাদান থাকে, যা মূলত ত্বকের অণুজীব বা ব্যাকটেরিয়া দ্বারা শর্করা ও ফ্যাটি অ্যাসিড ভেঙে তৈরি হয়। মানুষের ঘাম মূলত গন্ধহীন হলেও ত্বকের ব্যাকটেরিয়া একে বিশেষ গন্ধে রূপান্তর করে।

বিজ্ঞানীদের গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের ত্বকে কার্বক্সিলিক অ্যাসিড, ল্যাকটিক অ্যাসিড বা অ্যামোনিয়ার মাত্রা বেশি থাকে, মশারা তাদের দিকে ১০০ গুণ বেশি আকৃষ্ট হয়। মানুষের ত্বকের এই বিশেষ গন্ধ বা আকর্ষণীয়তা মূলত জিনগতভাবে নির্ধারিত এবং এটি আজীবন প্রায় অপরিবর্তিত থাকে। যমজ সন্তানদের ওপর করা গবেষণাতেও দেখা গেছে, অভিন্ন বা আইডেন্টিক্যাল যমজদের মশা সমহারে কামড়ায়, যা প্রমাণ করে যে মশার আকর্ষণ ক্ষমতা বংশগতভাবে ছড়ায়।

মশার কামড়ে সবার শারীরিক প্রতিক্রিয়া এক রকম হয় না। অনেকের ক্ষেত্রে মশা কামড়ালে সামান্য লাল দাগ হয়, আবার অনেকের চামড়া ফুলে গিয়ে চুলকানিসহ অ্যালার্জির সৃষ্টি হয়। জিনগত বৈশিষ্ট্যের কারণে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ভিন্নতার জন্যই এমনটি হয়ে থাকে। অনেক সময় কেউ কেউ ভাবেন যে তাঁদের বেশি মশা কামড়াচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে হয়তো তাঁদের শরীরে কামড়ের প্রতিক্রিয়া বা চুলকানি বেশি হওয়ায় তাঁরা তা বেশি অনুভব করেন। মশার হাত থেকে বাঁচতে হলে রসুন খাওয়া বা ভিটামিন বি সাপ্লিমেন্ট নেওয়ার মতো প্রচলিত ধারণার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই বলেও জানিয়েছেন গবেষকেরা। মশার কামড় থেকে রক্ষা পাওয়ার একমাত্র কার্যকরী উপায় হলো ডেট, পিকারিডিন বা পিএমডি সমৃদ্ধ প্রমাণিত মসকুইটো রেপেলেন্ট ব্যবহার করা এবং শরীর ভালোভাবে ঢেকে রাখা লম্বা হাতার পোশাক পরিধান করা।

তথ্যসূত্র: বিবিসি