একদিকে বাড়ির উঠানে রাখা মায়ের নিথর দেহ, অন্যদিকে বাজারে পুড়ছে জীবিকার একমাত্র অবলম্বন চায়ের দোকানটি। বাড়িতে মায়ের লাশ ফেলে চায়ের দোকানের আগুন নেভাতে যাওয়া তাই আর হলো না সুরমা বেগমের (৩০)।

বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার রায়হানপুর ইউনিয়নের লেমুয়া গ্রামের বাসিন্দা সুরমা। গতকাল সোমবার রাতে লেমুয়া বাজারে আগুনে তাঁর চায়ের দোকানটি পুড়ে গেছে। ওই সময় মাকে চিরবিদায় জানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন সুরমা। মায়ের দাফন শেষে আজ মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে আগুনে পুড়ে যাওয়া নিজের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি শুধু বলছিলেন, ‘মায়ের লাশ রেখে কেমনে এখানে আসি?’

জানা গেছে, সাত বছর আগে সুরমার বাবা আলমগীর হাওলাদার মারা যান। এরপর ছোট একটি চায়ের দোকান খুলে সংসারের হাল ধরেন সুরমা। সেই দোকানই ছিল তাঁর পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর গতকাল বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে সুরমার মা শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। ঘরে তখন শোকের মাতম। মায়ের মরদেহ বাড়ির উঠানে রেখে স্বজনেরা শেষ বিদায়ের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এরই মধ্যে গতকাল দিবাগত রাত ২টার দিকে লেমুয়া বাজারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। মুহূর্তের মধ্যে আগুন বাজারজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। একের পর এক দোকান দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকে। এ সময় পরিচিতজনদের ফোনে সুরমা জানতে পারেন, তাঁর চায়ের দোকানেও আগুন লেগেছে। কিন্তু মায়ের মরদেহ রেখে ঘটনাস্থলে যাওয়ার মতো মানসিক অবস্থায় ছিলেন না তিনি।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এই অগ্নিকাণ্ডে মুদি, মনোহরী, ফার্মেসি, পোশাক, জুতার দোকানসহ অন্তত ৪৫টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ পুড়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের দাবি, এতে প্রায় ১৬ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের পাথরঘাটা, মঠবাড়িয়া ও বামনা স্টেশনের তিনটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে ততক্ষণে অধিকাংশ দোকান পুড়ে ছাই হয়ে যায়।

খবর পেয়ে আজ সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন বরগুনার জেলা প্রশাসক তাছলিমা আক্তার, পুলিশ সুপার মো. কুদরত-ই-খুদা ও পাথরঘাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাপস পাল।

সরেজমিনে দেখা যায়, লেমুয়া বাজারজুড়ে পোড়া গন্ধ, ধ্বংসস্তূপ আর ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের আহাজারি। কেউ ছাইয়ের স্তূপে অবশিষ্ট মালামাল খুঁজছেন, আবার কেউ সর্বস্ব হারিয়ে নির্বাক হয়ে বসে আছেন।

জেলা প্রশাসক তাছলিমা আক্তার জানান, ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। তালিকা সম্পন্ন হলে সরকারি আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। এ ছাড়া বরগুনা-২ আসনের সংসদ সদস্য ও চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনির পক্ষ থেকেও সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।