কাল রাতে কোথায় ছিলেন আপনি? আটলান্টায়, না অ্যান্টার্কটিকায়? বুয়েনস এইরেসে, না কায়রোতে? লাল-সবুজের দেশে? টিভি সেটের সামনে? তাহলে তো আটলান্টা স্টেডিয়ামের ৬৮,২৩৯ দর্শকের সঙ্গে আপনিও জুয়েল আইচের জাদু দেখেছেন। ৭৯ মিনিট পর্যন্ত ২-০ গোলে পিছিয়ে থাকা আর্জেন্টিনা ম্যাচের শেষ ১৪ মিনিটে তিনটি গোল করে চলে গেল কোয়ার্টার ফাইনালে। অবিশ্বাস্য, অকল্পনীয়, অবিস্মরণীয় জয়ে বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা লিখল এক অমর কাব্য। এজন্যই তো আর্জেন্টিনা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। মেসি সর্বকালের সেরা। রুদ্ধশ্বাস, মায়াবী বিভ্রমের এক অপূর্ব রূপকথায় মধুরেণ সমাপয়েৎ হলো ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর এই ম্যাচ, বিশ্বকাপের ইতিহাসে ৩,০০০তম গোলের মধ্য দিয়ে।

৩-২ গোলের অচিন্তনীয় জয়ের পর মেসির দুচোখে নেমে এলো আষাঢ়ের বৃষ্টি। অঝোরে কাঁদছেন জাদুকর। হয়তো বুয়েনস এইরেসেও অগুনতি মানুষের দুচোখে তখন আনন্দ অশ্রু। দূর আকাশ থেকে সেই দৃশ্য দেখে দিয়েগো ম্যারাডোনার দুই নয়ন আর্দ্র হয়েছে। আর মিসর? কত পিরামিড কেঁদেছে! ফারাওরা বিলাপ করেছেন। এভাবেও কেউ হারে? এভাবে কেউ কারও মুখের গ্রাস কেড়ে নেয়? ৭৯ মিনিট পর্যন্ত ২-০ গোলে এগিয়ে ৩-২ গোলে হার। ইতিহাসের অন্যতম সেরা প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখে আর্জেন্টিনা এখন শেষ আটে সুইজারল্যান্ড ও কলম্বিয়া ম্যাচের জয়ী দলের সামনে।

ম্যাচের ১৫ মিনিটে অচলায়তন ভাঙে। আর্জেন্টিনা নয়, মিসর এগিয়ে যায়। মারওয়ান আত্তিয়ার চমৎকার বাঁকানো শটে দুর্দান্ত হেডে গোল করেন মিসরের ইয়াসির ইব্রাহিম। আর্জেন্টাইন গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ নড়াচড়ারও সুযোগ পাননি। এবারের বিশ্বকাপে এই প্রথম আর্জেন্টিনা পিছিয়ে পড়ে ম্যাচে। ১-০ গোলের লিড নেওয়া মিসর তখন স্বপ্ননগরীতে। মিনিটপাঁচেক পর গোল শোধের সুযোগ পায় আর্জেন্টিনা। বক্সের বাঁদিকে মিসরের হাসান ফেলে দেন আর্জেন্টিনার ট্যাগলিয়াফিকোকে। রেফারি পেনালটির বাঁশি বাজান। কিন্তু লিওনেল মেসি সবাইকে অবাক করে দিয়ে পেনালটি মিস করেন। এই বিশ্বকাপে নিজের অষ্টম গোল হাতছাড়া করেন তিনি। এ নিয়ে এবারের বিশ্বকাপে দুটি পেনালটি মিস করলেন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক। তার বাঁ পায়ের শট বাঁদিকে ঝাঁপিয়ে ফিরিয়ে দেন মিসরের গোলরক্ষক মোস্তফা শোকেইর। বিশ্বকাপে সব মিলিয়ে আটটি পেনালটির মধ্যে চারটি নষ্ট করলেন মেসি।

দ্বিতীয়ার্ধে আর্জেন্টিনা গোল শোধের জন্য মরিয়া চেষ্টা চালায়। মেসির ফ্রিকিক লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ার পর দুর্দান্ত এক পালটা আক্রমণে মিসরের মোস্তফা জিকো অসম্ভব সুন্দর ফিনিশিংয়ে স্কোরলাইন ২-০ করেছিলেন। হাসান ও সালাহ হয়ে বলটা পেয়েছিলেন জিকো। কিন্তু অসাধারণ সেই গোল শেষতক রেফারি বাতিল করে দেন পিএআরের সহায়তায়। বৈধ হলে এটি হতো বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা গোল। তবে এতে হতোদ্যম না হয়ে আফ্রিকার দেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে খেলতে এবং সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। ৬৬ মিনিটে আর্জেন্টাইন কোচ লিওনেল স্কালোনি একাদশে দুটি পরিবর্তন আনেন। ডি পলের জায়গায় লাওতারো মার্তিনেজ এবং ট্যাগলিয়াফিকোর বদলে গনজালেজকে মাঠে নামান কোচ।

৬৭ মিনিটে দ্বিতীয় গোল পায় মিসর। পালটা আক্রমণ থেকে হাসানের স্লাইডে মার্তিনেজকে পরাস্ত করে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন মিসরের জিকো (২-০)। ৭৩ মিনিটে আর্জেন্টিনা গনজালো মন্তিয়েলকে মাঠে নামায় নাহুয়েল মোলিনার জায়গায়। আর মিসর হাইসেম হাসানকে তুলে নিয়ে তার বদলি হিসাবে ত্রেজেগুয়েকে মাঠে নামায়। এর মধ্য দিয়ে ত্রেজেগুয়ে মিসরের হয়ে ১০০তম ম্যাচ খেলার মাইলফলক স্পর্শ করেন।

৭৯ মিনিটে কাঙ্ক্ষিত গোল পায় আর্জেন্টিনা। ডানদিক থেকে মেসির ক্রসে ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর হেড জাল খুঁজে পায় (১-২)। মিসরের ডিফেন্ডাররা অফসাইডের দাবি জানালেও, রেফারি তাতে সাড়া দেননি। চার মিনিট পর মেসি ম্যাজিক। এই বিশ্বকাপে আর্জেন্টাইন অধিনায়কের অষ্টম গোলে স্কোরলাইন হয় ২-২। চার মিনিটে দুই গোল করে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা ম্যাচটিকে পরিণত করে একটি ক্লাসিক ম্যাচে। এ নিয়ে বিশ্বকাপে টানা নয় ম্যাচে গোল করলেন মেসি। মিসর হতভম্ব। কিংকর্তব্যবিমূঢ়। মেসির সমতাসূচক গোলের পর গ্যালারিতে আর্জেন্টিনার জার্সি পরা আতলেতিকো মাদ্রিদের কোচ দিয়েগো সিমিওনেকে উল্লাসে ফেটে পড়তে দেখা যায়।

ক্লাইম্যাক্সের পর অ্যান্টি ক্লাইম্যাক্স। খেলা যখন অতিরিক্ত সময়ের দিকে গড়াচ্ছে, তখনই বিস্ফোরণ। লাওতারো মার্তিনেজের ক্রসে এনজো ফার্নান্দেজের হেড জালে চুমু খায়। ম্যাচের বয়স তখন ৯২ মিনিট। ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়েও আর্জেন্টিনা জিতল ৩-২ গোলে। বিশ্বকাপের এক রুদ্ধশ্বাস ম্যাচের সমাপ্তি হলো মিসরের স্বপ্নভঙ্গ এবং আর্জেন্টিনার অসাধারণ প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে।