টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ধসে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে কক্সবাজার। বৃষ্টিতে জেলার বিভিন্ন উপজেলার অনেক এলাকা প্লাবিত হয়ে লাখো মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পাহাড়ধস। উখিয়ায় রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির এবং কক্সবাজার শহরে পাহাড়ধসে সম্প্রতি ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, রোহিঙ্গা ক্যাম্প বাদ দিয়ে কক্সবাজার জেলায় প্রায় ২০ হাজার পরিবার পাহাড়ের ঢালে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছে। এর মধ্যে দক্ষিণ বন বিভাগের আওতায় প্রায় ১৩ হাজার এবং উত্তর বন বিভাগের এলাকায় প্রায় সাত হাজার পরিবার রয়েছে।

ভারি বৃষ্টিতে ৫০ গ্রাম প্লাবিত বৃষ্টিতে কক্সবাজার জেলার অনন্ত ৫০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।  কক্সবাজার শহরের সমিতি পাড়া, কুতুবদিয়াপাড়া, ঈদগাঁও উপজেলা বাজার, হাসপাতাল ও ভূমি অফিসসহ আশপাশের এলাকা, টেকনাফের সাবরাং, শাহপরীর দ্বীপ, সদর, হ্নীলা, হোয়াইক্যং ও বাহারছড়ার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। একই সঙ্গে কক্সবাজার-টেকনাফ সড়ক, কুতুবদিয়ার পাঁচটি গ্রাম, মহেশখালী উপজেলার ধলঘাটা ইউনিয়নের অধিকাংশ গ্রাম প্লাবিত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। টানা বৃষ্টিতে উখিয়ার ২ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ৪০টির বেশি ঘর পানিবন্দি রয়েছে।

অনেক বাড়িঘরে বৃষ্টির পানি ঢুকে পড়েছে। বিভিন্ন সড়কে পানি জমে থাকায় যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে। ভোগান্তিতে পড়েছেন শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষ।

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এসএম অনীক চৌধুরী বলেন, “পাহাড়ি ও নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। পরিস্থিতির আরো অবনতি হলে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ছেড়ে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যেতে হবে। যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করারও অনুরোধ জানানো হচ্ছে।”

এদিকে, কুতুবদিয়ায় লেমশীখালী ইউনিয়নের শাহাজির পাড়া এবং কৈয়ারিলের ইউনিয়নের মলমচর এলাকার সংযোগ ব্রিজটি ভেঙে গেছে। অতিরিক্ত জলাবদ্ধতা হওয়ার কারণে পানির স্রোতে ব্রিজের নিচের খুটিগুলোর মাটি সরে গেলে ব্রিজটি ভেঙে যায়।

উখিয়ায় পানিবন্দি ৫০ হাজার মানুষ: বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে উখিয়ার হলদিয়াপালং, জালিয়াপালং ও পালংখালী ইউনিয়নের ৩০টির বেশি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।

হলদিয়াপালং ইউনিয়নের প্রায় ২০টি গ্রাম সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক বাড়িতে পানি ঢুকে পড়ায় রান্নাবান্না বন্ধ হয়ে গেছে। অসংখ্য পরিবার খাবারের সংকটে পড়েছে। শিশু, নারী ও বয়স্করা সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে রয়েছেন। উপজেলা প্রশাসন ৪৭টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রেখেছে। পাশাপাশি সিপিপি ও বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্টের স্বেচ্ছাসেবকেরা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজ করছেন।

উপজেলার হলদিয়াপালং ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান ইমরুল কায়েস চৌধুরী বলেন, “ক্ষতিগ্রস্তদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ চলছে। একই সময়ে উখিয়ার স্থানীয়দের বসবাসের অন্তত আটটি স্থানে পাহাড়ধস হলেও সেখানে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।”

চকরিয়া-মাতামুহুরীতে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত: টানা তিনদিনের বৃষ্টি ও মাতামুহুরী নদীতে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার অন্তত ১৬টি ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। সেখানও কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

অভ্যন্তরীণ বহু সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীন দেলোয়ার জানান, প্লাবনের পর দ্রুত ব্যবস্থা হিসেবে উপকূলীয় সব স্লুইস গেট খুলে দেওয়া হয়েছে। পাহাড়ি এলাকার ঝুঁকিপূর্ণ বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে কন্ট্রোল রুম চালু রাখা হয়েছে।

জেলার ২০ হাজার পরিবার ঝুঁকিতে: কক্সবাজারের পাহাড়ি এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ বসতির সংখ্যা দিনদিন বাড়ছে। শহরের লাইট হাউস, সৈকতপাড়া, সার্কিট হাউস এলাকা, মোহাজেরপাড়া, দক্ষিণ ঘোনারপাড়া, বাদশাঘোনা, বৈদ্যঘোনা, মধ্যম ঘোনারপাড়া, পাহাড়তলী, কলাতলী আদর্শগ্রাম, ঝরিঝরিকুয়া, সদর উপজেলা কার্যালয়সংলগ্ন এলাকা ও লিংকরোডসহ বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় হাজারো পরিবার ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে। 

একই চিত্র সদর উপজেলার পিএমখালী, খুরুশকুল, মহেশখালী, রামু, উখিয়া ও টেকনাফেও।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, রোহিঙ্গা ক্যাম্প বাদ দিয়ে কক্সবাজার জেলায় প্রায় ২০ হাজার পরিবার পাহাড়ের ঢালে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছে। এর মধ্যে দক্ষিণ বন বিভাগের আওতায় প্রায় ১৩ হাজার এবং উত্তর বন বিভাগের এলাকায় প্রায় সাত হাজার পরিবার রয়েছে।

ভূমিধসের ঝুঁকিতে ১ লাখ রোহিঙ্গা: ২০১৭ সালে উখিয়া ও টেকনাফের প্রায় আট হাজার একর বনভূমি উজাড় করে ৩৩টি রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির গড়ে তোলা হয়। বর্তমানে এসব শিবিরে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করছে। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে অন্তত এক লাখ মানুষ ভূমিধসের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। অতিভারী বর্ষণে পাহাড়ি ঢাল নরম হয়ে পড়ায় ক্যাম্পজুড়ে উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে।

কয়েকদিনের টানা বর্ষণে ক্যাম্পে পাহাড়ধসে ৮ রোহিঙ্গা মৃত্যুর ঘটনায় সেখানে বসবাসরত ৪০০-৫০০ পরিবারের প্রায় ২০ হাজার রোহিঙ্গাদের মাইকিং করে সমতলের স্থানে নেওয়া হয়েছে। তারা বিভিন্ন লার্নিং সেন্টারে অবস্থান করছেন এবং জাতিসংঘ পরিচালিত সংগঠনগুলো তাদের জন্য শুকনো খাবারের ব্যবস্থা করেছে বলে জানিয়েছেন শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান।

তিনি বলেন, ভূমিধসের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা এলাকাগুলো বিশেষ নজরদারিতে রাখা হয়েছে। ঝুঁকিতে থাকা রোহিঙ্গাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম চলছে এবং প্রয়োজনে তা আরো জোরদার করা হবে। আর যেসব রোহিঙ্গাদের পাহাড়ি এলাকা থেকে সরিয়ে সমতলে নেওয়া হয়েছে তাদেরকে ক্যাম্প ইনচার্জ ও সাইড ম্যানেজমেন্ট এর লোকজন নিয়মিত দেখভাল করছে। 

উখিয়ায় কর্মরত ৮ এপিবিএনের অধিনায়ক মো. রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, “ভারী বর্ষণের সময় পাহাড়ের ঢালে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে নিয়মিত মাইকিংসহ বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।”

উখিয়া ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের ইনচার্জ ডলার ত্রিপুরা জানান, বর্ষা শুরুর আগেই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সঙ্গে সমন্বয় সভা করা হয়েছে। মাঝি ও কমিউনিটি প্রতিনিধিদের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে সতর্ক করা হয়েছে। টানা বৃষ্টির সময় আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাওয়ার জন্য বারবার আহ্বান জানানো হচ্ছে।

স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক দলনেতা মো. কায়সার হামিদ বলেন, অনেক সময় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের বারবার অনুরোধ করার পরও তারা বসতঘর ছেড়ে যেতে চান না। এতে উদ্ধারকাজও কঠিন হয়ে পড়ে।

১৯ বছরে পাহাড়ধসে প্রাণহানি ৩৭০ : সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৯ বছরে কক্সবাজারে পাহাড়ধসে ৩২৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির স্থাপনের পর থেকে ক্যাম্পে আরো ৪১ জন প্রাণ হারিয়েছেন। সব মিলিয়ে পাহাড়ধসে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৭০ জনে।

সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা ঘটে ২০১০ সালের ১৫ জুন। সেদিন রামুর হিমছড়িসহ বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধসে ১৭ ইসিবির ছয় সেনাসদস্যসহ মোট ৬২ জনের মৃত্যু হয়।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৮ সালে ১৩, ২০০৯ সালে ৫, ২০১২ সালে ২৯, ২০১৫ সালে ৫, ২০১৬ সালে ১৭, ২০১৭ সালে ২৬, ২০১৮ সালে ২৮, ২০১৯ সালে ২২, ২০২০ সালে ২৯, ২০২২ সালে ২৫, ২০২৩ সালে ৬, ২০২৪ সালে ১০ এবং চলতি বছর এ পর্যন্ত ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে পাহাড়ধসে।

পাহাড় দখল থামেনি: শত শত প্রাণহানির পরও পাহাড় দখল ও ঝুঁকিপূর্ণ বসতি নির্মাণ থামেনি। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, এখনো প্রায় সাড়ে ১৬ হাজার একর পাহাড় দখল করে প্রায় চার লাখ মানুষ বসবাস করছেন, যা জেলার মোট বনভূমির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। নির্বিচারে পাহাড় কাটা, ঘর নির্মাণের জন্য মাটি সংগ্রহ এবং জ্বালানির চাহিদা মেটাতে বন উজাড়ের ফলে পাহাড়ের স্বাভাবিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হচ্ছে। ফলে ভারী বর্ষণ হলেই ভূমিধসের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে।

পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের পরিচালক জমির উদ্দিন বলেন, “পাহাড় কাটা ও বনভূমি দখল বন্ধে পরিবেশ অধিদপ্তর নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। তবে শুধু আইন প্রয়োগ করলেই হবে না, ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে নতুন বসতি গড়ে ওঠা রোধ করতে হবে। এবং সকলের সচেতনতা জরুরী। পাহাড়ের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করা না গেলে বর্ষা মৌসুমে ভূমিধসের ঝুঁকি কমানো সম্ভব নয়।”

কক্সবাজার পরিবেশ ও বন সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি দীপক শর্মা দিপু বলেন,  “প্রতিবছর বর্ষা এলেই মাইকিং, সতর্কবার্তা ও উদ্ধার তৎপরতা দেখা যায়, কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে পাহাড় দখল রোধ, অবৈধ বসতি অপসারণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর পুনর্বাসনে কার্যকর উদ্যোগ নেই বললেই চলে। ফলে একই ধরনের দুর্ঘটনা বারবার ঘটছে। প্রাণহানির পর নয়, বরং দুর্যোগের আগেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।”

কক্সবাজার জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আজাদের রহমান বলেন, “রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধসে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছে জাতিসংঘ পরিচালিত বিভিন্ন সংস্থা। পাহাড়ধসে নিহত স্থানীয় প্রত্যেক ব্যক্তির পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা এবং আহত প্রত্যেক ব্যক্তির পরিবারকে ১৫ হাজার টাকা করে সরকারি ভাবে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।”

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, “ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মাইকিং অব্যাহত রয়েছে। ভারী বর্ষণ আরও কয়েকদিন অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। সব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কক্সবাজারের সার্বিক পরিস্থিতি মন্ত্রণালয়েও জানানো হয়েছে।”

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান বলেন, “আজ বুধবার সকাল ৬টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘন্টায় মোট বৃষ্টিপাতের পরিমান ৬৯ মিলিমিটার, যা ভারী বৃষ্টিপাত। আজকেও ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। সাগরে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত বহাল রয়েছে।”