হিটেন একধরনের কাঠের তৈরি কেবিন বা ঘর। তবে নরওয়েজিয়ানদের কাছে এটি শুধু একটি ঘর নয়। এটি তাদের জাতীয় সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং আত্মিক প্রশান্তির ঠিকানা। সপ্তাহান্তের ছুটি, ইস্টার বা ক্রিসমাসের মতো উৎসব এলেই শহরের আধুনিক ও ব্যস্ত জীবন ছেড়ে পরিবার নিয়ে এই কাঠের ঘরে ছুটে যাওয়া নরওয়েজিয়ানদের মজ্জাগত স্বভাব। তারা একে এতটাই আপন করে নিয়েছে যে এই কেবিনে সময় কাটানোকে একটি ক্রিয়াপদ বা ভার্ব হিসেবে ব্যবহার করে তারা ‘হিট্যা’ বলে।
মূল বা ঐতিহ্যবাহী হিটেনগুলোর মূল বৈশিষ্ট্য হলো অত্যন্ত সাধারণ এবং প্রায় সুযোগ-সুবিধাহীন জীবনযাপন। এগুলো সাধারণত কাঠ দিয়ে তৈরি হয় এবং বনের গভীরে, পাহাড়ের চূড়ায় বা সমুদ্রের তীরে সম্পূর্ণ জনমানবহীন এলাকায় গড়ে ওঠে। সনাতন এই কেবিনগুলোতে কোনো বিদ্যুৎ বা লাইনের পানির সংযোগ থাকে না। ঘর গরম রাখতে থাকে একটি কাঠের চুলা, আর ঘরের ভেতরে আসবাব বলতে থাকে একটি টেবিল, কয়েকটা চেয়ার এবং একটি সাধারণ বিছানা। এমনকি মূল ঘরের ভেতরে কোনো আধুনিক টয়লেটও থাকে না। এর বদলে ঘরের বাইরে প্রকৃতির মাঝে ছোট একটি কাঠের ঘর থাকে, যাকে বলা হয় উটেডো। তবে বর্তমান প্রজন্মের কাছে এই ধারণার কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। আধুনিক অনেক হিটেন এখন শহরের অ্যাপার্টমেন্টের চেয়ে বেশি বিলাসবহুল, আধুনিক প্রযুক্তি ও বিদ্যুৎ-পানির সুবিধায় সমৃদ্ধ। এমনকি নরওয়ের বিখ্যাত স্থপতিরা এখন উত্তর মেরুর বৈরী আবহাওয়ার উপযোগী আধুনিক নকশার কেবিনও তৈরি করছেন।
নরওয়েজিয়ানরা প্রকৃতিপ্রেমী হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত। তাদের একটি বিশেষ জীবনদর্শন রয়েছে, যাকে বলা হয় ফ্রিলুফ্টসলিভ বা মুক্ত বাতাসের জীবন। এই দর্শনের মূলকথাই হলো প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হওয়া। শহরের কোলাহল ও মানসিক চাপ থেকে দূরে গিয়ে নিজের এবং পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য তারা এই নির্জন কেবিনগুলো বেছে নেয়। কেবিনের দিনগুলোতে বিলাসী খাবারের কোনো আয়োজন থাকে না। সেখানে সাধারণ টিনজাত খাবার বা রুটি-চিজই প্রধান ভরসা। তবে এখানকার আসল আকর্ষণ লুকিয়ে আছে তাদের কোসেলিগ বা আরামদায়ক পারিবারিক আবহে। রাতের বেলা মোমবাতি বা হারিকেনের আলোতে সবাই মিলে তাস খেলা, বোর্ড গেম খেলা, পুরোনো রেডিওতে গান শোনা বা বই পড়ার মাধ্যমে এক চমৎকার আত্মিক বন্ধন তৈরি করে নরওয়েজিয়ানরা। এই কেবিন জীবন এতটাই ব্যক্তিগত ও পবিত্র যে খুব কাছের বন্ধু বা পরিবারের সদস্য ছাড়া এখানে সাধারণত অন্য কাউকে আমন্ত্রণ জানানো হয় না।
হিটেন সংস্কৃতির আরেকটি দারুণ দিক হলো এর স্থায়িত্ব। বেশির ভাগ কেবিনই বাজারে কেনাবেচা হয় না। এগুলো উত্তরাধিকারসূত্রে বাবা-মা থেকে সন্তান এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে হস্তান্তরিত হয়। ফলে প্রতিটি কেবিনের ভেতরের দেয়ালে ঝোলানো তামার পাত্র, পুরোনো ছবির ফ্রেম বা কাঠের স্কির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পরিবারের ইতিহাস ও নিজের শৈশবের নানা স্মৃতি। নরওয়েজিয়ানদের এই কেবিন কালচার প্রমাণ করে, অতি-আধুনিক এবং উচ্চ জীবনযাত্রার মাঝেও মানুষ খুব সাধারণ এবং আদিম জীবনযাপনের মাধ্যমে পরম সুখ ও মানসিক শান্তি খুঁজে পেতে পারে। এটি প্রকৃতির বুকে মাথা উঁচু করে বাঁচার এক অনন্য জীবনবোধ।
সূত্র: লাইফ ইন নরওয়ে, দ্য লোকাল নরওয়ে








