বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে খুব কম খেলোয়াড়ই আছেন, যাদের নাম উচ্চারণ করলেই কোটি মানুষের আবেগ জড়িয়ে যায়। আর্জেন্টিনার মহাতারকা লিওনেল মেসি তাদেরই একজন। মাঠে তার অসাধারণ নৈপুণ্যের মতোই ভক্তদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু তার ব্যক্তিগত জীবনও। বিশেষ করে কোথায় থাকেন, কেমন তার বাড়ি, কীভাবে কাটে পরিবারের সঙ্গে সময়-এসব নিয়ে কৌতূহলের শেষ নেই।
তবে মেসির বাড়ি নিয়ে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে থাকা সব গল্প সত্য নয়। বাস্তব তথ্য বলছে, তার বাড়িগুলো যেমন বিলাসবহুল, তেমনি সেগুলো পরিকল্পিতভাবে তৈরি হয়েছে পরিবারের স্বাচ্ছন্দ্য, নিরাপত্তা এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে।

বার্সেলোনার শান্ত ঠিকানা
দীর্ঘ সময় ধরে স্প্যানিশ ক্লাব বার্সেলোনায় খেলার সুবাদে মেসির প্রধান বাসস্থান ছিল স্পেনের কাস্তেলদেফেলস এলাকার একটি অভিজাত আবাসিক পাড়া। পাহাড় আর ভূমধ্যসাগরের মাঝামাঝি মনোরম পরিবেশে অবস্থিত এই বাড়িটি শহরের কোলাহল থেকে দূরে হলেও বার্সেলোনা শহরের সঙ্গে যোগাযোগ বেশ সহজ।
বাড়িটিতে রয়েছে সবুজ বাগান, বড় সুইমিং পুল, আধুনিক জিম, পরিবারের জন্য খোলা আঙিনা এবং একটি ছোট ফুটবল মাঠ। অবসর সময়ে মেসিকে প্রায়ই সন্তানদের সঙ্গে এই মাঠে খেলতে দেখা গেছে। ফুটবল তাঁর পেশা হলেও পরিবারের সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলোই যেন এই বাড়ির সবচেয়ে মূল্যবান অংশ।

‘নো-ফ্লাই জোন’-গুজব নাকি সত্য?
বহু বছর ধরে একটি দাবি সামাজিক মাধ্যমে ঘুরে বেড়াচ্ছে-মেসির বাড়ির ওপর দিয়ে নাকি কোনো বিমান উড়তে পারে না। বাস্তবে বিষয়টি এতটা নাটকীয় নয়। মেসির বাড়ির আশপাশের এলাকায় পরিবেশগতভাবে সংরক্ষিত অঞ্চল থাকায় বিমান চলাচলের কিছু নির্দিষ্ট রুট রয়েছে। তবে তার ব্যক্তিগত বাড়ির কারণে আলাদা করে কোনো ‘নো-ফ্লাই জোন’ ঘোষণা করা হয়েছে-এমন তথ্যের কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।
ফুটবলের আকৃতির রহস্যময় বাড়ি
ইন্টারনেটে প্রায়ই একটি বাড়ির ছবি ভাইরাল হয়, যা ওপর থেকে দেখলে ফুটবলের মতো এবং বিশাল ‘১০’ সংখ্যার আকৃতি তৈরি করে। অনেকেই সেটিকে মেসির আসল বাড়ি মনে করেন। আসলে সেটি ছিল একজন স্থপতির কনসেপ্ট ডিজাইন বা স্থাপত্য প্রকল্প। এটি কখনোই মেসির বাস্তব বাসভবন ছিল না। সামাজিক মাধ্যমে ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ার ফলে এই বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে।

নতুন অধ্যায়: ফ্লোরিডায় নতুন ঠিকানা
২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ক্লাব ইন্টার মায়ামিতে যোগ দেওয়ার পর মেসি নতুন করে স্থায়ী হন ফ্লোরিডার ফোর্ট লাউডারডেলে। সেখানে তিনি প্রায় ১০.৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে একটি বিলাসবহুল ওয়াটারফ্রন্ট ম্যানশন কেনেন।

বাড়িটিতে রয়েছে ১০টি বেডরুম, প্রশস্ত লিভিং স্পেস, আধুনিক রান্নাঘর, সুইমিং পুল, ফিটনেস সুবিধা এবং পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত খোলা জায়গা। বাড়ির পেছনে রয়েছে প্রায় ১৭০ ফুট দীর্ঘ ওয়াটারফ্রন্ট, সঙ্গে দুটি ব্যক্তিগত বোট ডক। সেখান থেকে সরাসরি নৌকায় করে সমুদ্রে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। এলাকাটি একটি নিরাপত্তাবেষ্টিত গেটেড কমিউনিটি, যেখানে বাসিন্দাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়।
গাড়িসহ লিফটে ওঠার অভিজ্ঞতা
মেসির রিয়েল এস্টেট সংগ্রহের আরেকটি আকর্ষণীয় সম্পদ হলো ফ্লোরিডার বিখ্যাত পোর্শে ডিজাইন টাওয়ারের একটি বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট। এই ভবনের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য হলো বিশেষ কার এলিভেটর প্রযুক্তি। বাসিন্দারা নিজেদের গাড়িসহ লিফটে উঠে সরাসরি নিজ নিজ তলার গ্যারেজে পৌঁছে যেতে পারেন। বিশ্বের অল্প কয়েকটি আবাসিক ভবনেই এমন প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়েছে।
বিলাসিতার চেয়েও বড় যে বিষয়
মেসির বাড়িগুলো দেখলে প্রথমেই চোখে পড়ে বিলাসিতা। কিন্তু আরও গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়, তার আবাসন নির্বাচনের মূল দর্শন ভিন্ন। পরিবারকে নিয়ে নিরিবিলি সময় কাটানো, সন্তানদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং জনসম্মুখের ব্যস্ত জীবন থেকে কিছুটা ব্যক্তিগত পরিসর তৈরি করাই তাঁর বাড়িগুলোর প্রধান বৈশিষ্ট্য। বিশ্বজোড়া খ্যাতি অর্জনের পরও মেসির জীবনযাপনে এই পারিবারিক মূল্যবোধ স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়।

লিওনেল মেসির বাড়ি শুধু দামি স্থাপনা বা বিলাসবহুল নকশার গল্প নয়। এগুলো একজন বিশ্বসেরা ক্রীড়াবিদের জীবনের আরেকটি দিক তুলে ধরে-যেখানে সাফল্যের পাশাপাশি পরিবার, নিরাপত্তা, স্বাচ্ছন্দ্য এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। হয়তো এ কারণেই মেসির বাড়ির গল্প মানুষকে শুধু অবাকই করে না, বরং তার ব্যক্তিত্বের একটি শান্ত, পারিবারিক এবং মানবিক দিকও সামনে নিয়ে আসে।
জেএস/









