নিউ জার্সির স্টেডিয়ামে তখন ম্যাচের মাত্র চৌদ্দ মিনিট। ব্রাজিল পেনাল্টি পেল। টেলিভিশনের পর্দার সামনে বসে পৃথিবীর কোটি দর্শকের মতো আমারও মনে হয়েছিল, বলটা হয়তো ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের পায়েই যাবে। গেল না। অন্য একজন এগিয়ে এলেন। শট নিলেন। নরওয়ের গোলরক্ষক ঠেকিয়ে দিলেন।
পেনাল্টি মিস ফুটবলে নতুন কিছু নয়। কিংবদন্তিরাও মিস করেছেন। তাই সেই মুহূর্তটিকে আলাদা করে মনে রাখার কারণ অন্য কোথাও।
মনে হচ্ছিল, ব্রাজিলের শরীরী ভাষায় একধরনের নিশ্চিন্ততা আছে। যেন ম্যাচের সময় এখনো অনেক। যেন একটি গোল আজ নয়, একটু পরেই হবে। তারপর আরেকটি। বিশ্বকাপের মঞ্চে এমন অনুভূতি সত্যিই ছিল কি না, তা খেলোয়াড়েরাই জানেন। কিন্তু টেলিভিশনের পর্দা অন্তত সেই গল্পটাই বলছিল।
ফুটবল অবশ্য সময়কে অন্যভাবে মাপে।
সে ঘড়ির কাঁটা দেখে না। সে দেখে মনোযোগ। দেখে ক্ষুধা। দেখে একটি দল শেষ মিনিট পর্যন্ত বিশ্বাস হারায় কি না। নরওয়ে সেই বিশ্বাসটা ধরে রেখেছিল। ব্রাজিল পারেনি। শেষ বাঁশি বাজার পর স্কোরবোর্ডে লেখা ছিল শুধু একটি ফল। কিন্তু তার ভেতরে লুকিয়ে ছিল আরও বড় একটি গল্প।
বিশ্বকাপ এলেই দৃশ্যটা আরও স্পষ্ট হয়। ব্রাজিল–আর্জেন্টিনা বিতর্কে আমরা অনেক সময় বর্তমান ম্যাচের চেয়ে অতীতের ট্রফি বেশি গুনি। পেলে, ম্যারাডোনা, মেসি—তাঁদের কীর্তি নিয়ে তর্ক করি। যেন ইতিহাসের আলোয় দাঁড়ালেই বর্তমানটাও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। ফুটবল অবশ্য ইতিহাসকে সম্মান করে, কিন্তু ইতিহাসের কাছে হার মানে না।
অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের গল্প।
এই গল্প শুধু ফুটবলের নয়।
একজন লেখক যখন ভাবতে শুরু করেন, তাঁর ভাষা আর ভুল করতে পারে না—সেদিন থেকেই তাঁর বাক্য বুড়িয়ে যেতে শুরু করে। একজন গায়ক যখন মনে করেন, পুরোনো করতালিই যথেষ্ট—নতুন গান আর মানুষের ভেতরে পৌঁছায় না। একজন চিত্রশিল্পী যখন নিজের আঁকা ছবির চেয়ে নিজের নামটাকেই বেশি বিশ্বাস করতে শুরু করেন, তখন ক্যানভাস ধীরে ধীরে নীরব হয়ে যায়।
শিল্পের সবচেয়ে বড় শত্রু সমালোচনা নয়। আত্মতুষ্টি।
আমরা বাঙালিরাও এই জায়গায় বারবার ধরা পড়ি। একটু সাফল্য এলেই তাকে অর্জনের চেয়ে পরিচয় বানিয়ে ফেলি। তারপর সেই পরিচয়কে রক্ষা করতেই সবচেয়ে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ি।
বিশ্বকাপ এলেই দৃশ্যটা আরও স্পষ্ট হয়। ব্রাজিল–আর্জেন্টিনা বিতর্কে আমরা অনেক সময় বর্তমান ম্যাচের চেয়ে অতীতের ট্রফি বেশি গুনি। পেলে, ম্যারাডোনা, মেসি—তাঁদের কীর্তি নিয়ে তর্ক করি। যেন ইতিহাসের আলোয় দাঁড়ালেই বর্তমানটাও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
ফুটবল অবশ্য ইতিহাসকে সম্মান করে, কিন্তু ইতিহাসের কাছে হার মানে না।
হয়তো সে কারণেই বিশ্বকাপ প্রতি চার বছর পরপর ফিরে আসে, অথচ তার শিক্ষা কখনো পুরোনো হয় না। জয় মানুষকে আনন্দ দেয়। পরাজয় মানুষকে শিক্ষা দেয়। আর বিনয়—সেটাই মানুষকে দীর্ঘ পথ হাঁটতে শেখায়।
প্রতিটি ম্যাচে সে আবার শুরু করে। শূন্য থেকে।
হয়তো এ কারণেই এই খেলাটি এত নির্মম, আবার এত সুন্দরও।
এখানে পাঁচটি তারকা আঁকা জার্সিও নতুন করে দৌড়ায়। বিশ্ব চ্যাম্পিয়নও নতুন করে পাস দেয়। কিংবদন্তির দেশও নতুন করে ভুল করে। ফুটবল কাউকে অপমান করে না। শুধু মনে করিয়ে দেয়, গতকালের জয় আজকের গোল করে দেয় না।
আমরা প্রায়ই বলি, ফুটবল একটি খেলা। আমার বরং মনে হয়, এটি মানুষের চরিত্র পড়ার সবচেয়ে সহজ উপায়।
কে হারের পর কেমন থাকে, কে এগিয়ে থেকেও সতর্ক থাকে, কে পিছিয়ে পড়েও লড়াই ছাড়ে না, কে নিজের নামের চেয়ে দলের কথা বেশি ভাবে—নব্বই মিনিটে এসবই ধরা পড়ে।
জীবনের মতোই।
হয়তো সে কারণেই বিশ্বকাপ প্রতি চার বছর পরপর ফিরে আসে, অথচ তার শিক্ষা কখনো পুরোনো হয় না।
জয় মানুষকে আনন্দ দেয়। পরাজয় মানুষকে শিক্ষা দেয়। আর বিনয়—সেটাই মানুষকে দীর্ঘ পথ হাঁটতে শেখায়।








