চট্টগ্রামে ৪ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হচ্ছে শহীদ ওয়াসিম আকরাম উড়াল সেতু। এটি চট্টগ্রামের মেগা প্রকল্পের মধ্যে অন্যতম। যানজট কমাতে ২০১৮ সালে নগরীর লালখান বাজার থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত এই প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু করে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক)। নানা প্রতিবন্ধকতা ও জটিলতায় চার দফায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। একইসঙ্গে বেড়েছে ব্যয়। ফলে ১৫ দশমিক ২ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে উড়াল সেতুর প্রতি মিটার তৈরিতে খরচ দাঁড়িয়েছে ২৮ লাখ ২৭ হাজার ৬৩১ টাকা। অথচ ২০১৭ সালের আগস্টে শুরু হওয়া চার বছর মেয়াদি এই প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩ হাজার ২৫০ কোটি টাকা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, জমি সংক্রান্ত বিভিন্ন মামলা ও সরকারি ছয় সংস্থার অসহযোগিতায় দীর্ঘসূত্রতার কবলে পড়েছে প্রকল্প। ফলে আট বছরেও প্রকল্প শেষ করা যায়নি। এখনও ১০ শতাংশ কাজ বাকি। তবে এ বছরের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষে করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ২০২৫ সালে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের নাম পরিবর্তন করে শহীদ ওয়াসিম আকরামের নামে করা হয়। ওই বছরই আনুষ্ঠানিকভাবে উড়াল সেতুতে যান চলাচল শুরু হয়। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২২ সালে। তবে বাংলাদেশ বেতার, চট্টগ্রাম বন্দর, চট্টগ্রাম ওয়াসা, পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ, বাংলাদেশ রেলওয়ে ও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের অসহযোগিতা ছিল। ফলে চার বছরের প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে সময় লাগছে আট বছর।
এর মধ্যে নগরীর সল্টগোলা এলাকায় পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির ১৩২ কেভিএ উচ্চ ভোল্টেজ সম্পন্ন ওভারহেড ট্রান্সমিশন লাইন স্থানান্তরেই চলে যায় প্রায় সাড়ে চার বছর। এর ফলে উড়াল সেতুর পিয়ার, পিয়ার ক্যাপ, গার্ডার স্থাপন এবং ডেক স্ল্যাব নির্মাণের কাজ আটকে থাকে। তাছাড়া রেলওয়ের জমি অধিগ্রহণ ও অনুমতি জটিলতায় বিলম্ব হয়েছে ৭৪১ দিন। দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ও চুক্তি স্বাক্ষর জটিলতায় দেওয়ানহাট-টাইগারপাস অংশে কাজের বিলম্ব হয়েছে ৬৩৬ দিন এবং আগ্রাবাদ আপওয়ার্ড র্যাম্প অংশে ১০৫ দিন। তবে আগ্রাবাদ অংশের কাজ এখনও শেষ হয়নি। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) বৈদ্যুতিক লাইন ও খুঁটি স্থানান্তরে বছরের পর বছর কাজের বিলম্ব হয়। চউকের পক্ষ থেকে এসব কাজের জন্য অর্থ জমা দিলেও সময়মতো কাজ শেষ করতে পারেনি বিপিডিবি।
এছাড়া নগরীর বারিক বিল্ডিং থেকে সিমেন্ট ক্রসিং পর্যন্ত ৬ হাজার ১২০ মিটার এলাকায় কাজ করার জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষের নকশা চূড়ান্তকরণ ও অনুমোদনে দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষ করতে হয়েছে। এই মূল অংশের পাইলিং কাজ শুরু করতেই লেগে যায় অতিরিক্ত ৭২১ দিন। অন্যদিকে বারিক বিল্ডিং থেকে নিমতলা মোড় পর্যন্ত রাস্তার নিচে থাকা ওয়াসার ৪৫০ মিলিমিটারের পানির পাইপলাইন স্থানান্তরে কাজের বিলম্ব হয় ৪৮৭ দিন। আর র্যাম্প নির্মাণের জন্য বাংলাদেশ বেতারের জমির জটিলতা নিরসন আজও হয়নি। চউকের নির্বাহী প্রকৌশলী ও শহীদ ওয়াসিম আকরাম উড়াল সেতুর প্রকল্প পরিচালক মাহফুজুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, ‘বাংলাদেশ বেতার থেকে একটি জায়গা এখনও নিতে পারিনি। গত দেড় বছর ধরে চেষ্টা করছি। এজন্য আমি নিজে তথ্য প্রতিমন্ত্রী ও মহাপরিচালকের সঙ্গে দেখা করেছি। আমরা চেয়েছিলাম অনুমোদন পরে হলেও যাতে কাজ করার অনুমতি পাই। কিন্তু সেটিও পাচ্ছি না। বাধ্য হয়ে রেলের জায়গায় উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে কাজ করতে হয়েছে।’ তিনি বলেন, কঠোর অডিট ও পর্যবেক্ষণের পর প্রকল্পের অর্থ ছাড় করা হয়। এখন পর্যন্ত ইউটিলিটি শিফটিং, জমি অধিগ্রহণসহ বিভিন্নভাবে প্রায় ৩ হাজার ৯০০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। নির্ধারিত মেয়াদের মধ্যেই প্রকল্পের অবশিষ্ট কাজ শেষ হবে বলে আশা রাখি’।








