চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার চুরির হিড়িক পড়েছে। উপজেলার ১৬টি ইউনিয়ন ও ২টি পৌরসভায় চুরির উপদ্রব এতটাই বেড়েছে যে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই ৫১টি ট্রান্সফরমার চুরি হয়ে গেছে।

তীব্র গরমের মাঝে ট্রান্সফরমার হারিয়ে ভোগান্তির শিকার হচ্ছে মানুষ। একইসঙ্গে চুরির আতঙ্কে দিন কাটছে সাধারণ গ্রাহকদের।

পল্লী বিদ্যুৎ সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত চট্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-৩ এর আওতাধীন মিরসরাই এলাকার বিভিন্ন স্থান থেকে মোট ৫১টি ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছে। এর মধ্যে বারইয়ারহাট জোনের আওতাধীন এলাকা থেকে ৩১টি, মিরসরাই জোন থেকে ১৪টি এবং সীতাকুন্ড সদর দপ্তরের আওতাধীন কমলদহ থেকে নিজামপুর পর্যন্ত এলাকায় ছয়টি ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছে। চুরি হওয়া ট্রান্সফরমারগুলো বেশিরভাগই ৫ কেভিএ থেকে ২৫ কেভিএ ক্ষমতাসম্পন্ন।

এর আগের বছর ২০২৫ সালে বারইয়ারহাট জোনে ১৩টি, মিরসরাই জোনে চারটি এবং সীতাকুন্ড সদর দপ্তরের আওতাধীন নিজামপুর-হাদিফকিরহাট এলাকায় তিনটি ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছিল। এক বছরের ব্যবধানে চুরির এ ঊর্ধ্বগতি স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ট্রান্সফরমারের ভেতরে থাকা মূল্যবান তামার তারই মূলত চোরচক্রের লক্ষ্য। চোরেরা ট্রান্সফরমার খুলে তামার কয়েল ও তার নিয়ে অন্যান্য যন্ত্রাংশ ফেলে রেখে যায়। এসব তামা ফ্যানের কয়েলসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক কাজে ব্যবহার করা হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ট্রান্সফরমার চুরির সবচেয়ে বড় ধাক্কা লাগে সাধারণ গ্রাহকের ওপর। বিদ্যুৎ অফিসের তথ্য অনুযায়ী, একটি পাঁচ কেভিএ ট্রান্সফরমারের মূল্য প্রায় ৫৩ হাজার টাকা, ১০ কেভিএর মূল্য প্রায় ৮৩ হাজার টাকা, ১৫ কেভিএর মূল্য ৯৯ হাজার ৯৯৯ টাকা এবং ২৫ কেভিএর একটি ট্রান্সফরমারের মূল্য প্রায় এক লাখ ৫৯ হাজার টাকা। প্রথমবার কোনো ট্রান্সফরমার চুরি হলে নতুন ট্রান্সফরমার পেতে সংশ্লিষ্ট গ্রাহকদের অর্ধেক মূল্য পরিশোধ করতে হয়। তবে দ্বিতীয়বার চুরি হলে পুরো টাকাই গ্রাহকদের বহন করতে হয়। ফলে চুরির ঘটনায় শুধু বিদ্যুৎ বিভ্রাট নয়, আর্থিক ক্ষতির মুখেও পড়ছেন ভুক্তভোগীরা।

উপজেলার জোরারগঞ্জ ইউনিয়নের গোপিনাথপুর এলাকার বাসিন্দা সুকুমার চন্দ্র নাথ বলেন, ট্রান্সফরমার চুরির পর নতুন ট্রান্সফরমার লাগানোর আগ পর্যন্ত আমাদের অন্ধকারে থাকতে হয়েছে। বিদ্যুৎ অফিসে একাধিকবার ফোন করার পরে নতুন ট্রান্সফরমার লাগানো হয়। চুরির করার সময় তারা বিদ্যুৎ অফিসের লোক পরিচয় দেয়। এরপর তাদের গতিবিধি সন্দেহজনক হলে আটক করে পল্লী বিদ্যু অফিসে ফোন দিলে তারা এসে চোর বলে শনাক্ত করেন।

সোনাপাহাড় এলাকার বাসিন্দা ও স্কুল শিক্ষক আসাদুজ্জামান বলেন, এলাকায় ট্রান্সফরমার চুরির পর একটি মসজিদ, নূরানী মাদরাসা ও পোলট্রি খামারে বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকায় মানুষ চরম ভোগান্তিতে ছিল। পরে বিদ্যুৎ অফিসে ৫০ শতাংশ টাকা জমা দিয়ে নতুন ট্রান্সফরমার স্থাপন করা হয়। চুরি হলে নতুন ট্রান্সফরমার স্থাপনে গ্রাহকদের টাকা দিতে হয় এটা কেমন নিয়ম?

বারইয়ারহাট জোনাল অফিসের ডিজিএম হেদায়েত উল্যাহ বলেন, ‘ট্রান্সফরমার চুরি হলে ওই এলাকার গ্রাহকদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। চুরি যাওয়া ট্রান্সফরমারের আওতায় থাকা গ্রাহকরা অর্ধেক মূল্য পরিশোধ করলে নতুন ট্রান্সফরমার পেয়ে থাকেন। তাই চুরি রোধে গ্রাহকদের আরও বেশি সচেতন হতে হবে। প্রত্যেকটি চুরির ঘটনায় মামলা করেছি এবং বিভিন্ন এলাকায় মাইকিংও করা হয়েছে।’

চট্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-৩ এর জেনারেল ম্যানেজার মো. আবদুল নুর বলেন, ‘ট্রান্সফরমার চুরি রোধে বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং করেছি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে নিয়মিত মতবিনিময় করছি। গ্রাহকদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির ফলে কিছু এলাকায় হাতেনাতে চোরও ধরা পড়েছে। তাদের আইনের আওতায় আনা হয়েছে। তবে এ ধরনের চুরি বন্ধে স্থানীয় জনগণের আরও বেশি সতর্ক ভূমিকা প্রয়োজন।’

জোরারগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল হালিম বলেন, কিছুদিন আগে ট্রান্সফরমার চুরির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে জনগণের সহায়তায় দুই চোরকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বিভিন্ন সময় অভিযোগ পেলে পুলিশ তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে।

এম মাঈন উদ্দিন/এসজেডএইচ/এএসএম