ভার্সিটি-পরবর্তী সময়টাতে আমরা বন্ধুরা খুব টেনশন করতাম। কী করব, কোথায় জব হবে, বিসিএস দেব, নাকি অন্য কিছু ট্রাই করব! চিন্তায় রাতে ঘুম হতো না। শুধু আমাদের দুই বন্ধুকে দেখতাম নিশ্চিন্তে ঘুরতে। একজন সিলেটি। তার চিন্তা নাই, কারণ কিছু হলে ভালো, না হলে লন্ডন চলে যাবে। আরেকজনের বাসা মোহাম্মদপুরে। ওরও ব্যাকআপ প্ল্যান আছে। জব না হলে ছিনতাই শুরু করবে। ওর থেকেই জেনেছিলাম, সপ্তাহে দুই রাত ছিনতাই করলেই নাকি যেকোনো বড় চাকরি থেকে বেশি ইনকাম করা সম্ভব। ওর কাজিনরা অনেকেই নাকি এই প্রফেশনে আছে।

মোহাম্মদপুরে আজকাল রিস্কও অনেক কম। মোহাম্মদপুরের লোকজন ছিনতাই করবে, এটা নাকি সবাই মেনেই নিয়েছে। পুলিশ পর্যন্ত নাকি ভয়ে বেশি রাতে বের হয় না। নিরাপদে থানায় অবস্থান করে। 

আমার ওই মোহাম্মদপুরের বন্ধুটার নাম লিমন। আমি একটা চাকরি নিয়ে চট্টগ্রামে চলে যাওয়ার কারণে বহুদিন লিমনের সঙ্গে যোগাযোগ নেই। কিছুদিন আগে শালার বিয়ে উপলক্ষে ঢাকা এসে মোহাম্মদপুর গিয়ে লিমনের সঙ্গে দেখা। একটু একটু ভয় পেলেও এগিয়ে গিয়ে কথা বললাম। হাজার হোক পুরোনো বন্ধু, আমাকে অন্তত কিছু বলবে না। লিমন আমাকে দেখে খুব খুশি হলো। চা খাওয়াতে নিয়ে গেল। চায়ে লম্বা চুমুক দিয়ে বলল, ‘আমার তো চাকরি হয়ে গেছে দোস্ত।’

আমি চেপে রাখা নিশ্বাসটা ছাড়লাম। যাক, লিমনের তাহলে ছিনতাই শুরু করা লাগেনি।

গল্পে গল্পে মোহাম্মদপুরের পরিস্থিতি উঠে এল। বললাম, ‘সেদিন পত্রিকায় দেখলাম, মোহাম্মদপুরের এমপি ববি হাজ্জাজ বলেছে, নিরাপত্তার কারণে সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়েছিল, সেটাও নাকি চুরি হয়ে গেছে।’ 

লিমন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘হ্যাঁ জানি। সিসি ক্যামেরাটা ভালোই ছিল। আমার বাসায় লাগাইছি। ফোন দিয়েও কন্ট্রোল করা যায়। দামি ক্যামেরা।’

আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘তোর বাসায় লাগিয়েছিস মানে? সিসি ক্যামেরাটা তো চুরি হয়ে গেছে।’

আমি জেলখাটা পাবলিক: পরীমনি

লিমন আমার কথার উত্তর না দিয়ে হাসল শুধু। 

বললাম, ‘তুই না জব পেয়েছিস?’

‘জব পেয়েছি কোথায়, তা তো শুনিসনি। আইফোন রফিক ভাইয়ের গ্যাংয়ে। জুনিয়র ছিনতাইকারী হিসেবে। বেতন ৩৫ হাজার। থাকা-খাওয়া আর রাতের গাঞ্জা ফ্রি।’

‘আইফোন রফিক? সেটা আবার কেমন নাম!’

‘ভাই আইফোন ছাড়া ছিনতাই করে না। অ্যান্ড্রয়েড ফোন ভাইয়ের খুবই অপছন্দ। হ্যাং করে, স্লো হয়ে যায়, বিক্রির সময় ভালো দামও পাওয়া যায় না।’ 

এই প্রথম আইফোন না থাকায় নিজেকে ভাগ্যবান মনে হলো। 

আমি চায়ের কাপটা নামিয়ে রাখলাম। কী বলব বুঝতে পারছিলাম না।

বললাম, ‘তোর আব্বা-আম্মা জানে?’

‘পাগল নাকি। আব্বা জানলে আমার খবর ছিল।’

‘স্বাভাবিক, কোন বাপ চাইবে যে ছেলে ছিনতাই করুক।’

লিমন একটা হাসি দিয়ে বলল, ‘আরে সে জন্য না। আব্বার ইচ্ছা ছিল, আমি তার বন্ধু কানকাটা ওসমানের গ্যাংয়ে যোগ দিই। কিন্তু আমার ওই গ্যাং পছন্দ না। খুবই ব্যাকডেটেড। এই জামানায় এসেও কেউ ছিঁচকে চুরি করতে পারে, ওনাদেরকে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না।’ 

‘তোর আব্বাও কি এসবে জড়িত?’

‘নাহ, আব্বা জেল থেকে বের হওয়ার পর ভালো হয়ে গেছে।’ 

হুমায়ূন ভাই বললেন, ‘তোমার গায়ে দেখি অনেক জোর’, রসালাপে ফারুক আহমেদ

আমি আর বেশিক্ষণ বসলাম না। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। মোহাম্মদপুরে সন্ধ্যার পর থাকার মতো সাহস আমার নাই। লিমনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে উঠে পড়লাম। লিমন বলল, ‘সাবধানে যাস। এই এলাকা ভালো না। সব ফকিন্নি চোর-ছ্যাঁচড় এই এলাকায়। তোর মতো ভাঙা অ্যান্ড্রয়েড ফোনও ছাড়ে না।’ 

আমি দ্রুত হেঁটে আসছিলাম। হঠাৎ দেখি এক ছেলে আমার দিকে এগিয়ে আসছে। আমার তো ভয়ে হার্ট দুবার বিট মিস করল। আজ বুঝি রক্ষা নাই। সাধের ফোনটা যাবে। মানিব্যাগেও আড়াই হাজার টাকা আছে। ছেলেটা এগিয়ে এসে হাসিমুখে বলল, ‘আরে সোহাইল ভাই না? আমি আপনার অনেক বড় ফ্যান।’

আমার জানে পানি এল ছেলেটার কথা শুনে। আমি আরও ছিনতাইকারী ভেবেছি। 

আমাকে চুপ থাকতে দেখে ছেলেটা আবার বলল, ‘রস+আলোতে আপনার সব লেখা পড়ি। আপনার ভিডিও দেখি। আপনার হিউমার দুর্দান্ত।’

‘থ্যাংক ইউ।’

‘আপনার সাথে একটা সেলফি তোলা যাবে?’

‘শিওর।’

‘আমার ফোনের ক্যামেরা ভালো না। আপনারটা দিয়ে তোলেন।’

‘আমার ফোন দিয়ে তুললে তুমি ছবি নিবা কীভাবে?’

‘আরে সেটা কোনো ব্যাপার নাকি। তোলেন আপনি।’

বাসায় গণতন্ত্র নেই, মাতৃতন্ত্রও নেই, এখানে চলে শুধু জয়তন্ত্র: অপু বিশ্বাস

আমি সেলফি তুললাম ফোন বের করে। বললাম, তোমার হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বার বা মেইল আইডি দাও ছবি পাঠিয়ে দিচ্ছি। 

ছেলেটা পকেট থেকে একটা ছুরি বের করে বলল, ‘এত ঝামেলার কী আছে। ফোনটা দেন। আমি ছবি নিয়ে নিব। রাতে আপলোড দিব। লাইক করে দিয়েন।’

ফোন রেখে দিয়েছে, তবে ছেলেটা আমাকে সম্মান করে। আমার ফ্যান বলে মানিব্যাগ নেয়নি। আমাকে চা খাইয়েছে। রিকশাও ঠিক করে দিয়েছে। ছিনতাইকারী হলেও ছেলে ভালো। 

রিকশায় ওঠার পরও আমার বুক ধড়ফড় করছিল। ফোন গেছে, কিন্তু সম্মান রক্ষা হয়েছে—এই সান্ত্বনা নিয়েই বাসার দিকে রওনা দিলাম।

হঠাৎ দেখি রাস্তার মোড়ে একটা ব্যানার ঝুলছে—‘মোহাম্মদপুরে আপনাকে স্বাগত’। তার নিচে ছোট করে লেখা—‘নিজ দায়িত্বে মোবাইল, মানিব্যাগ ও দামি জিনিসপত্র রক্ষা করুন।’

আরও নিচে স্পনসরের নাম দেখে আমি প্রায় রিকশা থেকে পড়ে যাচ্ছিলাম।

স্পনসর: আইফোন রফিক, কানকাটা ওসমান ও টাকলা মফিজ। 

তবে খুশির ব্যাপার হলো, ব্যানারটা কেউ খুলে নেয়নি।

কারণ, মোহাম্মদপুরে চোর-ছিনতাইকারীও জানে—নিজের এলাকার মার্কেটিং নষ্ট করতে নেই। আর আজকাল মার্কেটিং ছাড়া কোনো বিজনেসেই উন্নতি করা সম্ভব না।